গুঞ্জন প্রায় চমকে উঠলেন! ও ধরনের হিজিবিজি মানে! সতী কি অন্য কিছু মনে করিয়ে দিল! উনি একটু ঘাবড়ে গেলেন। “বাজে কথা! কবেকার হিজিবিজি— মিনিংলেস, কেউ রাখে নাকি! তুমি পাগল!”
সতী ঠোঁট কামড়ে হাসলেন। গুনুদাকে বেশ ঘাবড়ে দেওয়া গিয়েছে। মজা লাগল। “আমি পাগল! একদিন তা হলে ঘেঁটেঘুঁটে বার করতে হয় হিজিবিজিগুলো?”
গুঞ্জন আঁতকে উঠলেন। বললেন, “এ আবার কী রে, ভাই! হিজিবিজি কি মানুষের হাতে লেখা। আত্মা এসে ভর করে লেখায়। লেখাগুলো থাকে না, মুছে আসে। শেষে ভ্যানিশ! তুমি পাবে কেমন করে?” মণ্ডপের লোকরা হেসে উঠল।
সতী দমবার পাত্রী নন। হেসে বললেন, “দেখি পাই কিনা! ষাট সত্তর আশি বছর আগের করা সব ছক-কোষ্ঠীর বাসি কাগজ যদি থাকতে পারে, ভূতের লেখা থাকবে না!”
“কী মুশকিল! থাকে না বলেই এখন আমেরিকায় ইউরোপে একরকম টাইপ মেশিন চালু হয়ে গিয়েছে। তার ট্রেড নাম ‘প্ল্যানচেটো’। স্পিরিটরা এসে মেশিন চালিয়ে যায়।”
“কোন স্পিরিট! লোকাল না ফরেন?”
জোর হাসি উঠল মণ্ডপে।
সতী সেন আজ গম্ভীর মেজাজ, রুক্ষ চোখ মোলায়েম করে ফেলেছেন। এ তো তাঁর পুরনো অফিস নয় যে, পুরুষদের জব্দ করার জেদ থাকবে। তা ছাড়া তিনি এখন ভক্তিভরে লীলাপ্রসঙ্গ পড়ছেন, মাঝে মাঝে বসুমতী সংস্করণ পুরনো বিদ্যাপতি গ্রন্থাবলির পাতা উল্টে মনে মনে গানও গেয়ে ফেলেন দু-এক কলি। স্বভাবতই মেজাজে কিঞ্চিৎ আর্দ্রতা এসেছে।…আজকের অনুষ্ঠানও মজার। অকারণে খোঁচাখুঁচি টিপ্পনি কেন?
সতী একটু ভেবে বললেন, “গুনুদা, ভূত থাক। অন্য কথা। তুমি রোজ সকালে দুধ আনতে কৈলাসের খাটালে যাও না?”
“যাই। এক ঢিলে দুই পাটি মারা হয়। মর্নিং ওয়াক হয়ে যায় আর দুধটা খাঁটিও পাই।”
“দুই পাখি কেন? বলো তিন পাখি?”
“মানে!”
সতী চোখ টেরা করে হেসে বললেন, “রসময় মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেও তো বেঞ্চির ওপর বসে থাকো।”
“হ্যাঁ। এক পেয়ালা চা খাই বসে বসে। মর্নিং টি!”
“তা খাও। কিন্তু ছোট প্লেটে আলাদা করে কী খাও? রসগোল্লা! তাই না!”
গুঞ্জন এবার বিপদে পড়ে গেলেন। থতমত খেয়ে বললেন, “রোজ খাই না, মাঝে মাঝে খাই। রসময় আগের দিন রাত্তিরে যে টাটকা রসগোলা বানায়— দিশি চিনির— মানে গুড়ের ব্যাপার থাকে, সেটা খেতে খুব ভাল! খেয়েছ? ওটা ভাটপাড়া ব্র্যান্ড।”
নীচে মণ্ডপের সামনে থেকে সারখেল ডাক্তার চেঁচিয়ে উঠলেন। “আরে, দত্তর যে দুশো সত্তর ব্লাড সুগার। ফটাফট সুগার বাড়ছে। মাই গড, রোজ সাত সকালে রসগোল্লা খায়?”
গুঞ্জনের ছোট মেয়ে তার মাকে না ঠেলে বলল, দেখেছ মা!
গুঞ্জন মাথা নাড়তে লাগলেন। “মিথ্যে কথা। দু শো সত্তর আমার বাবার ব্লাড সুগার ছিল। আমার এক শো সত্তর। বাবাকে আমার ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।…আর রোজ খাই না! বিশ্বাস করুন!…সতী আমায় নিয়ে মজা করছে!’
সভায় হাস্যরোল উঠল।
সতী হেসে বললেন, “বাঃ, মজা করব কেন! যা দেখেছি তাই বলছি।”
“ইমপসিবল! কেমন করে দেখবে তুমি? দূরবিন কষে!”
“রসময়ের কাছে শুনেছি গুনুদা! তুমি রসগোল্লা খাও, গরম জিলিপি খাও, গজাও খাও…! মিথ্যে কথা বলছ কেন! বুড়ো বয়েসেও মিথ্যে কথা বলবে! খনা বলেছে, যদি ঠকাও পঞ্চাশে, বাঁধা পড়বে নাগপাশে…”
“ড্যাম ইওর খনা!” গুঞ্জন বললেন।
“ওমা, ওকি কথা! বউদির নাম যে খনা!”
প্রবল হাসি শোনা গেল মণ্ডপে। গুঞ্জনের খেয়াল ছিল না তাঁর গিন্নির নাম খনা। বড় অপ্রস্তুতে পড়লেন গুঞ্জন।
সতী এবার বললেন, “আচ্ছা, আর বেশি তোমায় জ্বালাব না। এবার সোজা সোজা প্রশ্ন। …সেই পদ্যটা তোমার মনে আছে? বিয়ের সময় যেটা ছাপা হয়েছিল তোমার?”
“না। বিয়ের পদ্য কে মনে রাখে! বড়দি লিখেছিল। বিয়ের পদ্য আর বিয়ের ছাতা কেউ রাখতে পারে কোনোদিন!”
“বড়দির নাম করে নিজে তুমি লিখলে, আমার মামার প্রেসে ছাপালে ; অলি গুঞ্জন, হৃদি মহুন— কত কী লিখলে আর এখন সব ভুলে গেলে!”
“আমার মনে নেই। শুধু মাথার ওপর প্রজাপতিটা মনে আছে। শুঁয়োপোকার মতন দেখাচ্ছিল সেটা। যেমন ছাপা, তেমন প্রজাপতি।”
“তা হলে বলছ, প্রজাপতির বদলে শুঁয়োপোকা নিয়ে জীবনটা শুরু হয়েছিল?”
জোর হাসি উঠল মণ্ডপে, হাততালি পড়ল।
সতী বললেন, “শুঁয়োপোকাই প্রজাপতি হয় গুনুদা। যাক আর মাত্র দুটো প্রশ্ন!” “বলো?”
“বউদির সঙ্গে তোমার কত বছর ঘরসংসার হল?”
“বত্রিশ।”
“কেমন মনে হয় এখন—?”
গুঞ্জন একটু ভেবে রসিকতার গলায় বললেন, “ভেরি ইনটারেস্টিং, এ যেন ভাই, বত্রিশটি দন্ত উৎপাটনের কেরামতি দেখা…!”
হো হো হাসাহাসি। হাততালি। মণ্ডপ অট্টরোলে ভরে উঠল।
সতী সেন এবার বললেন, “আর আমার কোনও কথা নেই।…গুনুদা, কিছু মনে করো না। এক পাড়ায় থাকলেও গল্পগুজব তত বেশি হয় না। তোমার সঙ্গে অনেকদিন পরে একটু ঠাট্টা তামাশা করলাম।…আমাদের বয়েসটা এই ভাবেই এক একদিন হারিয়ে যায়। আজও গেল।”
মালপানি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। মানে সতী-গুঞ্জন পর্বও শেষ হল।
শোভনা উদয় ঘোষের দিকে তাকালেন।
উদয় দু হাত তুলে মণ্ডপকে শান্ত হতে বললেন। মণ্ডপ শান্ত হল।
উদয় বললেন, “আমাদের দাদা, বউদি, দিদি, ও ছেলেমেয়েরা। এবার আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হবার মুখে। এখন একটি সমাপ্তি সঙ্গীত গেয়ে শোনাবেন শম্ভুদা ও তাঁর দলবল। আপনারা সামান্য অপেক্ষা করুন।”
