হাসি আর থামছিল না।
“অতসীদিকে একবার কাঁকড়া বিছে কামড়েছিল। জ্বালায় যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিলেন। আপনি তখন তাস খেলায় মত্ত ছিলেন। কিস্যু করেননি।”
“হ্যাঁ তা ঠিকই। তবে আমি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম, ভাবছ কেন! আমার মতন বৃশ্চিক নিয়ে তোমার জীবন কাটছে, ওই বেটা পুঁটি কাঁকড়া তোমার কী করবে!”
এবারে হাসির তোড়ে মণ্ডপের চেয়ারগুলো হেলে গেল
কনক রণে ভঙ্গ দিলেন। বললেন, “না, আপনাকে নিয়ে পারা যায় না। ভীষণ অসভ্য আপনি।”
মাধব বিজয়ী হয়েও হাত জোড় করে হাসতে হাসতে কনককে বললেন, “কনকদি, কিছু মনে করবেন না। এ হল মজার খেলা। অপরাধ করে থাকলে মাফ চাইছি।”
“যান! আর ন্যাকামি করবেন না— এই বয়েসে।”
মণ্ডপ থেকে মধু মধু ধ্বনি উঠল। হাততালি। আবার যেন কে দুটো তুবড়ি জ্বালিয়ে দিল।
ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন মালপানি।
শোভনা, উদয়—সবাই তখনও হাসছিলেন।
বাকি থাকলেন সতী সেন আর গুঞ্জন দত্ত।
তাঁদের পালা শুরু হল এবার। শোভনা নাম ডাকলেন। মাইকের ছোকরা মাইক সাজিয়ে দিল।
সতী সেনকে বয়েসের তুলনায় যেন আরও বয়স্কা দেখায়। স্বভাবে সামান্য গম্ভীর, কিঞ্চিৎ উগ্র। চাকরি জীবনে পুরুষদের মাথায় চড়তে দেননি অফিসে। বাড়িতেও তিনি স্বামীর মাথার ওপর। ওঁদের কোনও সন্তানাদি নেই।
গুঞ্জন কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন। অ্যাকাউন্টস অফিসার। সবে রিটায়ার করেছেন। এই অঞ্চলের ছেলে। তবে এই পাড়ার বাড়ি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। বাবা করেছিলেন পরে।
সতী সেনও এদিককার মেয়ে। তাঁর বাড়ি মাত্র বছর দশেকের। উনি খানিকটা বয়েসে বিয়ে করেছেন। স্বামী ব্যবসা করেন।
সতী গুঞ্জনের দিকে অনেকক্ষণ থেকেই আড়চোখে লক্ষ করছিলেন। পাতিহাঁসের মতন চেহারা হয়েছে গুঞ্জনের এখন। তিনি আর গুঞ্জন আজই শুধু এক পাড়ারই বাসিন্দে নয় এককালে তাঁরা এই শহরের এখানকারই পাশাপাশি দু মহল্লায় থাকতেন দুজনে। মহল্লা আলাদা হলেও চেনাচিনি ছিল। পরিচয়ও ছিল ভাল। তারপর সতী যখন বাইরে পড়তে গেলেন, মেয়ে হোস্টেলে থাকতেন— তখন কলকাতার রাস্তায় গুঞ্জনকে দেখতে পাওয়া যেত। গুঞ্জনও পড়তে এসেছেন। দুজনে প্রায় সমবয়স্ক।
সে-সময় গুঞ্জন মাঝে মাঝে সতীর হোস্টেলে দেখা করতে আসতেন। দুজনে ফুটপাথে পায়চারি করেছেন, চা খেয়েছেন নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে।
গুঞ্জন দু-চারটে চিঠিও লিখেছিলেন হোস্টেলের ঠিকানায়। সতী জবাবও দিয়েছিলেন। মামুলি চিঠি, তবু তার মধ্যে অল্পস্বল্প ভাবোচ্ছ্বাস থাকত। চিঠির তলায় গুঞ্জন লিখতেন, ‘ইতি তোমার গুনুদা।’ সতী লিখতেন, ‘ইতি স’।
দিনগুলো পালটে গেল। সতীকে ফিরে আসতে হল, পরীক্ষা দিয়ে চাকরি নিতে হল। আর গুঞ্জন পড়া শেষ করে বাপের চেষ্টায় গোকুলপুর কোলিয়ারিতে চাকরি পেল। অর্থাৎ যেটুকু উচ্ছ্বাস ফেনিয়ে উঠেছিল— তা মিলিয়ে গেল। এসব অনেক পুরনো কথা।
সতী চুপ করে আছেন দেখে শোভা বললেন, “সতীদি আপনি শুরু করুন।”
গুঞ্জন চুপ করে বসে। তাঁর চেয়ারের বসার জায়গায় ছারপোকা আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। উসখুস করছিলেন। এমনিতেই গুঞ্জনকে একটু ব্যস্ত দেখায়।
সতী সেন প্রায় না তাকিয়েই বললেন, “আমরা তো এখানকারই লোক, এক সময় শহরের লাহাপাড়ার দিকে থাকতাম। এই জায়গাটা তখন নতুন, গড়ে উঠছে সবে। সেই চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই গুনুদাকে আমি চিনি। তারপর কত জল গড়াল, পাড়া বদলাল, গুনুদা কোলিয়ারিতে, আমি এখানে অফিসে। আবার একদিন এই পাড়ায় দুজনেই থাকতে এলাম। গুনুদাদের বাড়ি পুরনো হয়ে গেল। ওর বাবা করেছিলেন। আমারটা ছোট কুঁড়ে। এই তো সবে হল। ..আমি আর কী জিজ্ঞেস করব গুনুদাকে! চেনা-জানা মানুষকে কী আর জিজ্ঞেস করা যায়?”
গুঞ্জন বার কয়েক চোখ পিটপিট করলেন। চোখ দুটি গোল। ছোট। ভুরুতে কয়েকটা পাকা চুল।
শোভনা হেসে বললেন, “এখানে এই পাড়ার লোকরা সবাই তো চেনাশোনা সতীদি। তবু, আপনি কিছু প্রশ্ন করুন। নয়ত ঠিক মানাবে না আজকের এই ব্যাপারটার সঙ্গে।…করুন না, যা মনে আসে তেমন প্রশ্ন! ভালই লাগবে শুনতে।”।
সতী এবার গুঞ্জনের দিকে তাকালেন। কাশলেন মুখ চাপা দিয়ে। তারপর বললেন, “করি তা হলে?…আচ্ছা বেশ, আমার প্রথম প্রশ্ন হল, গুনুদা আগে— সেই লাহা গলিতে থাকার সময় আমাদের দু-তিনজনকে নিয়ে ঘর অন্ধকার করে প্ল্যানচেট করতে বসত। আমার হাতে পেনসিল গুঁজে দিত। ভূতটুত আসত কিনা জানি না, ভয় হত, গা ছমছম করত, কাঁটা দিত। সেই অভ্যেসটা কি আছে?”
গুঞ্জন বুঝতে পারলেন। সেই কিশোর বয়েসে গায়ে গা লাগলে কাঁটা লাগবেই। লাগারই কথা। সতী বেশ খোঁচাটা মারল।
গুঞ্জন বললেন, “না, না। ওসব আর করি না।” বলে ঢোঁক গিললেন।
“কেন? ভূত নেই, না, আর আসে না?”
“সে তখন ছেলেমানুষি করতাম। ও-রকম অনেকেই করে। বড় বড় লোকরাও করেছেন। ফেমাস লোকরা। শখ! ওসব বোগাস!”
“কোনটা বোগাস! ভূত, না, ভূতের হিজিবিজি?”
“ভূত-ভূত করছ কেন! আত্মা! স্পিরিট। আমি ওসবে আর বিশ্বাস করি না।” বলে গুঞ্জন একবার মণ্ডপের দিকে তাকালেন। গিন্নি, দুই মেয়ে, নতুন জামাই বড় মেয়ের, বসে আছে। সতী অন্ধকার ঘরে প্ল্যানচেটের কথাটা না তুললেই পারত!
সতী মুখ টিপে হাসলেন। বললেন, “আমার কাছে ওরকম— ওই ধরনের হিজিবিজি দু একটা আছে!”
