এবার কনক মুখোপাধ্যায়— মানে কনকবউদি ভার্সেস মাধবচন্দ্র মজুমদার।
শোভনা নাম ঘোষণা করলেন, কনকবউদি আর মাধবচন্দ্রের।
মাইকের ছোকরা দু তরফের টেবিলের মাইক সরিয়ে জায়গা মতন করে দিল।
উদয়গোপাল বললেন, “এবার যাঁরা মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা দু জনেই এই পাড়ার একেবারে পুরনো বাসিন্দে না হলেও কিছুদিন পরে এসেছেন—তবু পঁচিশ তিরিশ বছর হয়ে গেল। আসুন তাঁদের কথা শুনি।”
শোভনা কনকবউদির দিকে তাকালেন। হাসলেন। “নিন, শুরু করুন।”
মাধবচন্দ্র অখিলবাবুর মতন ডিসপেপটিক রোগী নন। তেষট্টি বছরেও ঘোরাফেরা, সাইকেল স্কুটার চড়া, হাটবাজার— সবই করেন। বাড়ির সারাই-টারাই নিজেই দেখেন শোনেন। কর্মক্ষম মানুষ। খাওয়া-দাওয়ায় রুচি আছে। পানেও। মাধবচন্দ্রের মুখটি গোল, সামান্য ভোঁতা নাক, জ্বলজ্বল করছে চোখ। মাথায় আধ সাদা চুল অল্প হলেও মাঝখানে সিঁথি রেখে ব্যাক্ ব্রাশ করা। গায়ের রংটি কালো।
মাধবচন্দ্র এমনভাবে মাইকের সামনে ঝুঁকে বসলেন, যেন তিনি কিছু কেয়ার করেন না। মিসেস মুখার্জিকে তো নয়ই।
কনকের বাপের বাড়ি ছিল কলকাতায়। ব্রাহ্মসমাজের বাড়ির কাছাকাছি থাকতেন। পড়েছেন বেথুন কলেজে। বাপের বাড়িতে বেশ একটা সমাজ পরিবেশ ছিল। শ্বশুরবাড়িতে অবশ্য পট-পুতুলের হাট। স্বামী দেখতে ভাল, বড় কাজকর্ম করতেন বলে হিন্দুবাড়ির ছেলেকেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল মা বাবার। তা বলতে নেই মুখার্জিমশাই যখন কাজ থেকে অবসর নিলেন— তখন তিনি কাউবয় অ্যান্ড মিল্টন কোম্পানির জোনাল চিফ, ডেপুটি ডিরেক্টর।
কনক একটু গলা পরিষ্কার করে নিয়ে মাধবচন্দ্রের দিকে তাকালেন।
কনক বললেন, “আমি শুরু করছি। আপনি তৈরি?”
মাধব বললেন, “সব সময় তৈরি।”
“আপনি তো পুলিশে কাজ করতেন?”
“সরি ম্যাডাম, আমি পুলিশে কাজ করতাম না। আয়রন ওয়ার্কসের সিকিউরিটি অফিসার ছিলাম। চিফ অফিসার।”
“ওই একই হল। ইউনিফর্ম পরে অফিসে যেতেন দেখতাম…”
“ইউনিফর্ম পরা অফিসিয়াল অর্ডার ছিল। অফিসের পোশাক যদি পরিচয় হয়— তবে তো ডাবের খোল আর নারকোল একই জিনিস।”
মণ্ডপে হালকা হাসি শোনা গেল।
কনক ঘাবড়ালেন না। ঘাবড়াবেন কেন? মাধবের স্কুটার একবার তাঁদের গাড়ির হেড লাইট ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। গাড়িতে কনক ছিলেন, স্বামীও ছিলেন। মাধবকে দিয়ে তিনি ক্ষমা চাইয়েছিলেন। স্বামী অবশ্য অত্যন্ত অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাসিডেন্ট। তা বলে পাড়ার পরিচিত লোককে কেউ ওভাবে ধমকায়।
কনক ধমকের মেজাজেই বললেন, “আপনি কি নারকোল?”
“বলতে পারেন। আমার মধ্যে জল এবং শাঁস দুইই আছে।”
কনক একটু থমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলেন। “আপনি—আপনি মিসেস মজুমদারকে টর্চার করেন।”
“শুনুন কনকদেবী, আমি খাস মতি মজুমদারের নাতির ছেলে। কলকাতার বনেদি বংশ। আমাদের বাড়িতে কেউ মিসেস নয়, সকলেই শ্ৰীমতী। আমার শ্রীমতী মানে স্ত্রীকে আমি টর্চার করি, আপনি দেখেছেন?’
“হ্যাঁ, দেখেছি।”
“বলুন?”
“দুটো বাঘা কুকুর, বারো চোদ্দটা বেড়াল, একটা কাকাতুয়া— সব তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। তার সঙ্গে আবার যিশু-বিশু। যমজ। অবশ্য যিশুরা ভেরি ব্রাইট। তবে প্রচণ্ড দুরন্ত। একে আপনি কী বলবেন!”
মাধবচন্দ্রের স্ত্রী অতসী মণ্ডপে বসে বসে হাসছিলেন। যিশু-বিশু দুই ভাই শিস দিয়ে উঠল। দু জনেই সবে পায়ে দাঁড়িয়েছে, একজন ইনজিনিয়ারিং পাস করেছে সবে, অন্যজন সি এ চালাচ্ছে।
মাধব বললেন, “দেখুন কনকদি, কিংবা লেডিদি, আমি জানি কাজ করলে শরীর ভাল থাকে। কুকুর স্বর্গের জীব। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে একমাত্র কুকুরই ওই হাইটে পৌঁছতে পেরেছিল। আমার স্ত্রীকে ওই আলটিমেট জায়গায় গাইড করে নিয়ে যাবার জন্যে এক জোড়া হেল্পার দিয়েছি। অন্যায় করেছি?”
হো হো হাসি উঠল মণ্ডপ থেকে। জোর হাততালি। মধু মধু রব। কে যেন দুটো পটকা ফাটিয়ে দিল।
মাধব হাত তুলে নিরস্ত্র হতে বললেন মণ্ডপের শ্রোতাদের। তারপর কনকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি বেড়ালের কথা বললেন। ওগুলো হল মাতৃহারা সন্তান। নানা জায়গা থেকে জুটিয়ে আনা। নালা, নর্দমা, ডাস্টবিন, রেললাইন, রাস্তা, ধোপি বস্তি থেকে। ওরা একসঙ্গে লালিত পালিত হচ্ছে মানে ওই যাকে বলে— ওদের মধ্যে একটা ইউনিটি ডেভলাপ করার চেষ্টা হচ্ছে এ-দেশীয় প্রথায়।…আর কাকাতুয়াটা আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে পেয়েছি। ওর বয়েস ছাপান্ন। আমায় ‘জামাইবাবু’ বলে ডাকে, বিশ্বাস করুন।”
এবার যেন মণ্ডপ হাসির তোড়ে ভেঙে পড়ল। কী প্রচণ্ড হাস্যরোল। সেই সঙ্গে হাততালি।
মাধব বললেন, “তবে কনকদি, আমি নিশ্চয় কনফেস করব, আমার বেশি বয়েসের দুই ছেলে একেবারে সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি।”
আবার হাসি। যিশু-বিশু জোরে চেঁচিয়ে উঠল, “বাপি, বহুত মাজা আয়া। থ্যাংক ইউ।”
কনক একেবারে বিপর্যস্ত। ওই বুড়োটা—এমন বাক্যবাগীশ জানা ছিল না। তাঁকে একেবারে অপদস্থ করে দিল।
কনক একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, “মজুমদারবাবু, আপনি তো নিজেকে খুব রসিক প্রমাণ করলেন। এবার কটা কথা বলি?”
“বলুন?”
“অতসীদি— মানে আপনার স্ত্রী, মাথায় আপনার চেয়ে এক ইঞ্চি মতন লম্বা কেন?”
“জেনেশুনেই সেটা হয়েছে দিদি। আমি রমণীজাতিকে শ্রদ্ধা করি। সেই জন্যে একটু বাড়তে দিয়েছি।”
