“দাঁড়াতে পারব না বাপু!’
“না না, বসে বসেই বলুন।”
অখিল জল শেষ করে ফেলেছেন। আর একবার মুখ মুছলেন। মণ্ডপে তাঁর স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে— মায় নাতনি বুলবুলি পর্যন্ত আজ। আজ একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। পেটটাও মুচড়ে উঠেছে। সুশীলা বউঠাকরুনকে বিলক্ষণ চেনেন তিনি। কথায় কম যান না। জয় বাবা মহাদেব।
সুশীলার স্বামী মণ্ডপের সামনেই বসে আছেন। ছেলেপুলে বউ নাতিরা বসে আছে। তারা মজা দেখছে।
সুশীলা কথা বলতে গিয়ে যেন আটকে গেলেন। কী বলবেন? মাথায় ছাই কিছুই যে আসছে না।
সকলেই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।
শোভনা হেসে বললেন, “বলুন সুশীলাদি, লজ্জা কিসের?”
সুশীলার থমকে যাওয়ার ভাবটা কেটে গেল। তিনি অখিলবাবুর দিকে তাকালেন। দু চারটে পুরনো অপ্রিয় কথা মনে পড়ল। পাশাপাশি বাড়ি না হলেও একবার বাড়ির ময়লা বাইরে ফেলা নিয়ে অখিল-গিন্নি মমতার সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয়েছিল ; আর-একবার মমতার বাড়ির কাজের লোককে তিনি বেশি টাকা দিয়ে ভাগিয়ে নিয়েছিলেন বলে মমতা তাঁকে আড়ালে ‘ঝি-ভাঙানি’ বলেছিল। আর ওই মাস্টার তো এইট ক্লাসে সুশীলার ছোট ছেলেকে অঙ্কে ফেল করিয়ে ক্লাস-ওঠা বন্ধ করে দিয়েছিল আর কি! এবার একবার নেবেন নাকি অঙ্কের মাস্টারকে! …না, না। এসব ব্যাপার অনেক পুরনো। পাশাপাশি ঘটিবাটি থাকলেও ঠোকাঠুকি হয়। সেসব তুচ্ছ ব্যাপার কবেই তাঁরা ভুলে গেছেন। পড়শি হিসেবে মমতার সঙ্গে তাঁর বেশ সদ্ভাব এখন। তা ছাড়া তাঁর সেই ছোট ছেলে এখন জোয়ান, সে হারামজাদা মাস্টারের মেজো মেয়ের সঙ্গে কচু দেবযানী করল গত কালই। সুশীলা কি কচি খুকি? অসভ্য অভব্যও নয়।
সুশীলা হঠাৎ বললেন, অখিলবাবুর দিকে তাকিয়েই, “কত হল আপনাদের মাস্টারমশাই?”
অখিল ঠিক বুঝতে পারলেন না। বললেন, “ছেষট্টি শেষ হল।”
“আপনার বয়েসের কথা বলছি না, সংসারধর্মের কথা বলছি।”
“ও! তা—তা—বছর চল্লিশ।”
“আমার চেয়ে চার বছর কম।…তা চল্লিশ বছরে কেমন লাগল?”
“কেমন।…ইয়ে, যেমন লাগে।”
“ও কী একটা জবাব হল! বলুন, ভাল না মন্দ?”
অঙ্কের মাস্টার অখিল এবার সাহস পেয়ে গেলেন। বললেন, “দিদি, চৌবাচ্চার অঙ্ক জানেন? একদিক থেকে জল ঢুকছে জলে, ওপরের নল দিয়ে ; নীচের নল দিয়ে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। কম বেশি। সংসারধর্মটা হল সেই রকম, সুখ আনন্দও জোটে, আবার সেগুলো বেরিয়ে গেলে দুঃখকষ্টও জোটে। এইভাবে চলে!”
“ও তা হলে আপনি বলছেন, বিয়ে-থা করে বউ ছেলেপুলে নিয়ে সংসারধর্ম করাটা চৌবাচ্চার অঙ্ক!”
প্রবল একটা হাসির ঢেউ উঠল মণ্ডপে। হাততালির শব্দ। মধু মধু ধ্বনি। বুড়োবুড়ির দল হেসে এ ওর গায়ে পড়লেন।
সুশীলা এবার একেবারে ফ্রি। কোনও সঙ্কোচ নেই আর। গলা বেশ ভালই উঠছে। বললেন, “তা বেশ দাদা, অঙ্কই হল। এবার বলুন তো— বিয়ের সময় মমতার মুখটি কেমন দেখতে ছিল? হাসিহাসি, না, কান্না কান্না?”
অখিলবাবু ইতস্তত করে বললেন, “অত পুরনো কথা কী মনে থাকে!…তবে একটা কথা মনে আছে দিদি। আমি দেখতে বড় রোগা ছিলুম। বিয়ের সময় আমার দাদাশ্বশুর আমাকে কানে কানে বলেছিলেন, ক্ষীণদেহং মীনসম সরোবরে শোভিত হে, পুচ্ছং উচ্চং তুলি ক্রীড়া করে শালা রে—! মানে, তোমার এই রোগা শরীর ওই পুকুরের জলে শোভা পাচ্ছে, তুমি দাদু শালা লেজ তুলে খেলা করে যাও?”
এবার একেবারে চারপাশ অট্টহাস্যে ভরে উঠল। দারুণ জেঠু, মধু মধু…, অতি মধু।
সুশীলা যেন মার খেয়ে গেলেন। অঙ্কের মাস্টার সংস্কৃত বলে। এ বাবা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। সুশীলা নিজেও হেসে ফেলেছিলেন। শাড়ির আঁচলে হাসি মুছে নেবার চেষ্টা করলেন।
হাসি থামলে সুশীলা বললেন, “দাদা, আপনি আর মমতা— কে কতবার ঝগড়া করেছে এই চল্লিশ বছরে?”
“এই তো মুশকিলে ফেললেন দিদি। চল্লিশ বছর মানে, ফরটি ইনটু থ্রি হানড্রেড সিক্সটি ফাইভ।…রাফলি সাড়ে চোদ্দ হাজার দিন। বাপের বাড়ির জন্যে একশো দিন বাদ দিয়েছি। না, আমি বলতে পারব না, দিদি। তবে আপনি ওর দিকে সিক্সটি পার্সেন্ট আমার দিকে ফরটি পার্সেন্ট রাখতে পারেন। দোষ হয়তো আমার।”
“আপনি বরাবর রগচটা।”
“সে আমার ধাত। বাকিটা ছাত্রদের জন্যে।”
“আচ্ছা, এবার বক আর যুধিষ্ঠিরের মতন প্রশ্ন করি?”
“করুন! আপনি কি বক?”
আবার হাসির হররা উঠল।
সুশীলা বললেন, “বক তো ধর্ম।”
“তা ঠিক।”
“জগতে কোন স্বামী সবচেয়ে বেশি সুখী?”
“যে স্বামী স্ত্রীর চরণাশ্রিত।”
আবার হাসি। জোর হট্টরোল।
সুশীলা বললেন, “কোন স্ত্রী বেশি সুখী?”
“যার আঁচলে যত ভারি চাবির গোছা থাকে।”
পুনরায় হট্টরোল।
“গেরস্থ জীবনে কে জেগে ঘুমোয়?”
“স্বামী, মানে পুরুষরা।”
“চতুর কত রকমের হয়?”
“এ কোন মহাভারত দিদি?”
“উদ্ভট মহাভারত। চতুর কত রকমের হয়?”
“বলতে পারব না।”
“জীবনটা কেমন?”
“গায়ের বস্ত্রের মতন। গায়ে বস্ত্র দিলে তা ময়লা হয়। ছেঁড়ে ফাটে। তা বলে কি আমরা বস্ত্র ফেলে দিই দিদি! কেচেকুচে সেলাই করে আবার পরি। এই জীবন সেই রকম। ইট ইজ নট ডার্টি, ইট শুড নট বি ডার্টি। যদিও আমাদের জীবনে— আমরা ডার্টকে ঠেকাতে পারি না।”
জোর হাততালি পড়ল মণ্ডপে। রব উঠল মধু মধু।
মালপানি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। মানে সুশীলা-অখিল প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ।
ধন্য ধন্য রব নয়, তবে জোর করতালি ধ্বনি উঠল মণ্ডপ থেকে। কেদারহরি চেয়ারে বসে বসে ঝিমোননা গলায় বললেন, “আহা, কী স্বর্গ। মাস্টার লড়েছে ভাল।”
