উদয় বললেন, “বসুন বউদি, এগুলো বাড়ি থেকে আনাননা, ডেকোরেটারের চেয়ার নয়।”
সুশীলা বসলেন, সাবধানে।
তারপর নাম ডাকা হল কনকবউদির। কনকের বয়েস বাষট্টি তেষট্টি। উনি ব্রাহ্মবাড়ির মেয়ে ছিলেন একসময়। তারপর হিন্দুবাড়ির বউ এবং গৃহিণী। একরঙা দক্ষিণী শাড়ি পরেছেন। হালকা রং, ঘি রঙের। পাড় মেরুন ধরনের। মাথায় সামান্য কাপড়। কাঁধের কাছে হাড়ের ব্রোচ। হাতে চুড়ি আর ঘড়ি।
কনকবউদিকে ধরতে হল না, নিজেই মঞ্চে উঠে এলেন। বসলেন সুশীলার পাশের চেয়ারে। বসেই একবার আড়চোখে মাধবচন্দ্রকে দেখে নিলেন।
শেষে ডাক পড়ল সতী সেনের। সতী এঁদের মধ্যে কনিষ্ঠা। সবে ষাট।বেশ রোগাটে চেহারা। মাথার সামনের সব চুল পাকা। গাল সরু। সতী সেন চাকরি করতেন কো-অপারেটিভ ব্যাংকে। বেশ কড়া ছিলেন। সাজসজ্জায় ফিটফাট। তিনিই যা হালকা রঙের ছাপা শাড়ি পরেছেন, গায়ে সিল্কের পাতলা স্কার্ফ।
সতীদি বসতেই উদয় ঘোষ বললেন, “এবার আমি আমাদের সকলের মাননীয়া, এবং পপুলার—শোভাদিকে অনুরোধ করব ওপরে আমাদের মধ্যে আসতে। শোভাদি আমাদের এখানকার মেয়ে কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে মাত্র চার মাস আগে রিটায়ার করেছেন। তিনি এই পাড়ার জন্যে অনেক কিছু করেছেন, মহিলা সমিতি, গরিব বাচ্চাকাচ্চাদের পড়াবার জন্য ছোট্ট স্কুল, চ্যারিটেবল হোমিও সেন্টার। শোভাদির গুণের শেষ নেই। শোভাদি—মানে শোভনাদি এখানে থাকবেন মহিলাদের পক্ষ থেকে নয়, তিনি থাকবেন আমাদের পক্ষ থেকে। সভার পরিচালনা তিনিই করবেন, আমি তাঁকে শুধু সাহায্য করব। আসুন শোভাদি।”
শোভনা উঠে এলেন সামনে থেকে। চেহারাটি গোল, মাথায় খাটো, গায়ের রং ফরসা, মাথার কোঁকড়ানো চুল কাঁচা পাকায় মেশানো। ঘাড় পর্যন্ত চুল। চোখে চশমা, পরনে গরদ শাড়ি। ছোট পাড়। পায়ে হিল তোলা জুতো।
শোভনা আসতেই উদয় বসার চেয়ারটি তাঁকে এগিয়ে দিয়ে, পাশে সরে দাঁড়ালেন।
শোভনা এসেই প্রথমে সভাপতি জয়গোপাল মিত্রকে হাত জোড় করে নমস্কার করলেন, তারপর মঞ্চের সকলকে এবং শেষে মণ্ডপের দর্শকদের।
শোভনা নিজের চেয়ারে বসলেন।
উদয় ঘোষ গলা পরিষ্কার করে বললে, “প্রথমেই একটা কথা বলে রাখি। আমাদের মঞ্চে মাইকের ব্যবস্থা কম। সব কথা হয়ত সকলের কানে যাবে না ভাল করে, ত্রুটি মার্জনা করে নেবেন।… আজকের এই অনুষ্ঠান— যার আমরা নাম দিয়েছি, ‘বৃদ্ধস্য মিলোনৎসব’— সেখানে একটি নতুন ধরনের খেলা হবে। বলতে পারেন ‘বুড়োদের খেলা’ বা ‘বুড়োবুড়িদের মেলা’।…খেলার নিয়মটা আমি বলে দি। আমাদের মধ্যে যে। তিনজন বউদি দিদি উপস্থিত আছেন— তাঁরা ওই তিন বৃদ্ধজন— মানে আমাদের দাদাদের কয়েকটি করে প্রশ্ন করবেন। প্রশ্নগুলি ব্যক্তিগত হতে পারে, সাধারণও হতে পারে। তবে কোনো প্রশ্নই অভব্য, ইয়ে— মানে ইনডিসেন্ট যেন না হয়। মজার মজার প্রশ্ন হবে, মজা এবং রঙ্গটাই আসল। একটু আধটু খোঁচা নিশ্চয় থাকবে, তবে মন্দ প্র্রশ্ন করবেন না। করলে সেটা কাটান যাবে। বাদ যাবে আর কী। আপনারা মনে রাখবেন, দিস ইজ গেইম, এ গেইম অফ লাইফ অ্যান্ড লাফটার।
“আর আমার বলার কিছু নেই। এবার শোভাদির এজলাসে মামলা তুলে দিলাম। নিন শোভাদি।” বলে উদয় ঘোষ মাইকটা শোভনার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ওদিকে তিন বৃদ্ধের মধ্যে অখিলবাবুর গলা শুকিয়ে এসেছে। তিনি বরাবরই ডিসপেপটিক এবং আমাশা আর অম্বলের রোগী। নার্ভাস টেনশানে থাকেন। অথচ রেলওয়ের স্কুলে যখন সিনিয়ার অঙ্ক টিচার ছিলেন— দেদার মার দিয়েছেন ছাত্রদের। জ্যামিতিতে তিনি বাঘ ছিলেন। ছাত্ররা আড়ালে নাম দিয়েছিল, জিয়ো-টাইগার। তাঁর লেখা অঙ্কের বই কলকাতার বইপাড়ায় ছাপা হয়েছে, বিক্রিও হয়েছে দেদার। অখিল তাঁর মাথামোটা ছাত্রদের ঘরে বন্ধ করে বিনি পয়সায় অঙ্কও শেখাতেন এককালে।
সেই অখিল আজ অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। “উদয় এক গ্লাস জল।”
মালপানি ঘণ্টা বাজাতে যাচ্ছিল, ঘন্টা না বাজিয়ে দুটো ছেলেকে জল দিতে বলল টেবিলে টেবিলে।
ফটাফট ছ’ গ্লাস জল চলে এল কাচের গ্লাসে। টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
সুশীলাবউদির সামনে জল রাখতেই তিনি হাত নেড়ে বললেন, “জল কী হবে, ওই বুড়োদের দে। আমাদের জল লাগবে না। বরং পরে একবার পান-জরদা এনে দিস।”
এবার মালপানির ঘণ্টা বাজল। মানে খেলা শুরু। মণ্ডপ থেকে আওয়াজ উঠল, শুরু হয়ে যাক আরম্ভ করে দিন।
শুরু হল।
শোভনা বললেন, “প্রশ্ন মেয়েরাই করবেন। উত্তর দেবেন পুরুষরা। তাঁরা কোনও সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবেন না। প্রশ্ন হবে পাঁচটি থেকে বড় জোর দশটি। তার বেশি নয়। পনেরো মিনিট পর্যন্ত এক একজন সময় পাবেন। মনে থাকবে তো? সুশীলাদি আপনি কী বলেন?”
“আমি আর কী বলব! যেমন তোমাদের ইচ্ছে।”
“তা হলে আপনাকে দিয়েই শুরু করি। আপনি এখানে মহিলাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা। আপনি প্রশ্ন করবেন— অখিলদাদাকে। দাদা, এখানে— মঞ্চে আপনি বয়েসে সবার বড়। আমি শুরু করলাম।”
মাইকের দুই ছোকরা ছুঁচোর মতন ছুটে গিয়ে সুশীলা আর অখিলবাবু— যার যার দিকের টেবিলে মাইক ঠেলে দিয়ে অ্যাডজাস্ট করে দিল।
মণ্ডপ থেকে একটা হালকা আওয়াজ শোনা গেল হাসির।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ।
তারপর শোভনা বললেন, “নিন, সুশীলাদি শুরু করুন।”
