সভার জায়গাটি আগেই করা ছিল। স্টেজের দু দিকে তিনটি করে চেয়ার। দুটি টেবিল। মানে এপাশে তিন ওপাশে তিন, মোট ছটি চেয়ার, দুটি টেবিল। মাঝমধ্যেখানে সামান্য পেছনে আরও একটি টেবিল ও দুটি চেয়ার। তারও পেছনে প্রায় সিংহাসন মার্কা একটা চেয়ার, সামান্য উঁচুতে, একটি ছোট টেবিল। মাইক-ম্যান চার টেবিলে চারটি মাইক লাগিয়ে দিয়েছে।
সাতটা বাজার আগেই পাড়াপড়শিরা মণ্ডপে জুটতে শুরু করল। কালী-কমিটির ছেলেরা কয়েকটা তুবড়ি জ্বালিয়ে দিল, পটকা ফাটাল, হাউই উড়িয়ে দিল আকাশে। অর্থাৎ সভা শুরু হতে চলেছে, আয় তোরা সবে ছুটিয়া। পাড়ার বুড়োবুড়ি থেকে মধ্যবয়স্ক ভদ্রজন, বউ, বাচ্চা সবাই এসে ভিড় করে ফেলল প্যান্ডেলের তলায়।
এমন সময় মালপানি স্টেজের মধ্যে দাঁড়িয়ে পেটা ঘণ্টায় সাতটা ঘন্টা বাজিয়ে দিলেন।
ইউ জি— মানে উদয়গোপাল একেবারে বাঙালি বয়স্ক ভদ্রলোকের মতন পোশাক আশাক পরে স্টেজের মাঝখানে এসে হাত জোড় করে বললেন, “নমস্কার, নমস্কার। সুধীজন ও ভাইবোনেরা, সবাইকে নমস্কার। আমি উদয়গোপাল ঘোষ। আপনাদেরই লোক। পেটের দায়ে বিভুঁয়ে পড়ে আছি। কিন্তু তবু আমি আজ এসেছি— আপনাদের স্নেহভালবাসার টানে।…আজ এখানে কী অনুষ্ঠান হবে তা সামান্য পরেই দেখতে পাবেন। তার আগে বলি, রঘুপুর কালীপুজোর এটি পঞ্চাশ বছর। সকলেই সেকথা জানেন। আমাদের পুজোর এই গোল্ডেন জুবিলিতে এখানকার, মানে এই পাড়ার বাসিন্দদের মধ্যে যাঁদের বয়েস ষাট পেরিয়ে গিয়েছে, যাঁরা সজ্জন মণ্ডলের সদস্য— তাঁরা একটি অনুষ্ঠান করতে চলেছেন। আমরা এর নাম দিয়েছি ‘বৃদ্ধস্য মিলনোৎসব’।…আমি প্রথমে আমাদের সভাপতির নাম ঘোষণা করছি। প্রস্তাবও করছি। শ্রী জয়গোপাল মিত্র মহাশয়।”
সারখেল ডাক্তার কাছেই ছিলেন, সমর্থন করলেন।
জয়গোপালকে এনে সিংহাসন মার্কা চেয়ারে বসানো হল। জয়গোপাল ধুতি চাদর লাঠি সমেত নিজের জায়গায় বসলেন।
সভা থেকে হাততালির শব্দ হল।
তারপর পাড়ার বিগতজনের জন্যে দু মিনিট শোকজ্ঞাপন।
উদয় ঘোষ বললেন, “এর পর যা তা পরে জানাচ্ছি। তার আগে আমাদের উদ্বোধনী সংগীত হবে। গাইবেন বৃদ্ধরা। আমাদের শম্ভুদা গানটির পরিচালক। তিনিই দলবল নিয়ে গাইবেন। আসুন শম্ভুদা।”
শম্ভু হালদার জনা সাতেককে নিয়ে মঞ্চে উঠলেন। সঙ্গে হারমোনিয়াম ডুগিতবলা, মৃদঙ্গ, খঞ্জনি।
বাজনা গুছোতে খানিকটা সময় গেল। দলে জনা সাতেক থাকলেও গায়ক তিন চার জন। বাকিরা মুখ নাড়বেন, নয়ত মাঝে মাঝে গলা চড়াবেন।
গান শুরু হল।
শম্ভু হালদার গান গাইতে পারতেন এককালে। এখন গলায় জোর পান না।
তিনিই শুরু করলেন, “আমরা সবাই বুড়ো আমাদের এই বুডোর রাজত্বে, বুড়িগুলোর দয়ায় আছি বেঁচে বরতে। আমরা যা খুশি তাই করি, তবু তাঁর খুশিতেই চরি…”
গানের শুরুতেই হাসির দমকা বয়ে গেল মণ্ডপে। গায়করা যে যার খুশি মতন চেঁচাচ্ছেন, শেখানো বানানো গানে ভুলটুল যা পারেন বলে যাচ্ছেন, প্রবলভাবে মৃদঙ্গ আর খঞ্জনি বাজছে। হারমোনিয়ামের রিড আটকে গেছে, তবলা বুঝি ফেঁসে গেল।
হাসির হররা ছুটছে তখন মণ্ডপে। হাততালি। কেউ কেউ সাধু সাধু বলে চেঁচিয়ে উঠল।
উদয় ঘোয চিৎকার করে মাইকে বললেন, “সাধু সাধু নয়, মধু মধু বলুন। এনকোর থেকে বাংলায় মধু বলা যায়। মধু ঋতয়তে বাতাঃ— বাতাসে এখন শুধু মধু। আপনারা আমাদের ধন্য করলেন।”
গান শেষ হল। মণ্ডপে তখনও হাসির ঝড় থামেনি।
কে একটা ছেলে মণ্ডপের বাইরে ডবল তুবড়ি জ্বালিয়ে দিল।
সামান্য চুপচাপ থাকার পর উদয় ঘোষ বললেন, “এবার একটু শান্ত হন। আমাদের পরের অনুষ্ঠান শুরু হবে।” বলে উদয় মালপানির দিকে তাকালেন। মালপানি ঘণ্টা বাজালেন।
উদয় ঘোষ বললেন, “মহাশয় মহাশয়ারা এবার আমরা যা করব, সেটা আপনারা অন্য কোথাও দেখেছেন বলে মনে হয় না। আমরা তিনজন বৃদ্ধকে ওপরে ডাকব। তিনজন বৃদ্ধাকে। দাদা বউদিরা এসে আমাদের কাছে এই মঞ্চে বসবেন। দাদারা রাইট সাইডের চেয়ারে, বউদিরা বাঁ দিকের চেয়ারে। না না, একেবারেই ভাববেন না যে এসব আগে থেকে আমরা ঠিক করে রেখেছি। লটারি করে নাম ঠিক করা হয়েছে দাদা বউদিদের। অবশ্য একটা কথা আগেই বলা উচিত। এই দাদা এবং বউদিরা কেউ কারুর হিজ হিজ হুজ হুজ নয়—মানে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। সেটা থাকলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেওয়ার মতন হত। তাই না।…সারখেল, তুমি দাদাদের বউদিদের নাম ডেকে দাও।”
সারখেল ডাক্তার নীচে থেকেই কাগজে টুকে রাখা নাম ডাকতে লাগলেন। অখিলবন্ধু চক্রবর্তী, মাধবচন্দ্র মজুমদার, গুঞ্জন দত্ত।
“অখিলদা, মাধবদা, গুঞ্জন— আপনারা দয়া করে ওপরে আসুন।”
অখিলরা একে একে ওপরে এলেন। বারিদ আগে থেকেই নোটিশ ঝেড়ে রেখেছিলেন।
এরপর মেয়েরা। সুশীলাবউদি (সুশীলা সরকার), কনকবউদি (কনক মুখখাপাধ্যায়), সতীদি (সতী সেন)।
সুশীলার হাঁটুতে বাত, প্রস্থ অত্যাধিক, বছর খানেক আগে চোখের ছানি কাটিয়েছেন। বয়েস সাতষট্টি আটষট্টি। মাথার কাপড়, পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি, সিথিতে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুর। গায়ে আবার সেন্টও ঢেলেছেন।
সুশীলা কষ্টেসৃষ্টে দু পা এগুতেই দুটো ছেলে ছুটে এসে হাত ধরল। “আসুন, জেঠাইমা।”
উনি মঞ্চে উঠলেন। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন, দেখলেন— বসার জায়গার প্রস্থ কম। তাঁর সাহস হচ্ছিল না।
