“তুমি?”
“ডাক্তার…। ডাইরেক্টারও।”
“বা বা, বেশ। তা তোমায় খুঁজে বার করল কেমন করে মালপানি?”
“মালপানির এক শালী আমাদের ওদিকের একটা টেকনিক্যাল স্কুলের লাইব্রেরিয়ান। সে একবার অ্যাকসিডেন্টালি আমাদের কাছে এসেছিল। তখনই..!”
“বুঝেছি। ভেরি ওয়েল। তোমায় আমরা ওয়েলকাম করছি—!”
জয়গোপাল বললেন, “না, তা কেমন করে হয়! উদয় এসেছে এ খুবই সুখের খবর। উই আর অল হ্যাপি। কিন্তু আমাদের মধ্যে ওকে জায়গা দেব কেমন করে! ওর বয়েস কত? ষাট না হলে তো এনট্রি পাবে না।”
সারখেল বললেন, “মিত্তিরদা, ইউ. জি. সবে একষট্টি। আমি চেক আপ করে নিয়েছি আগেই। ওর মাথায় কিছু নেই, নি-কেশ। তাই টুপি লাগিয়েছে। দাঁত ফলস— মানে বাঁধানো। বি. পি, তলায় এক শো ওপরে দেড় শো। হার্ট…!”
মালপানি বললেন, “ইউ. জি.-কে গ্রেস দিয়ে পাস করাতে হবে না, দাদা। ও এমনিতেই বেড়া টপকে গিয়েছে।”
জয়গোপাল তিনবার লাঠি ঠুকে বললেন, “উদয়, তুমি আমাদের মণ্ডলিতে প্রবেশাধিকার পেলে! খুশি হলাম।… যাক, আমাদের এখানে কী কথা হচ্ছিল— তোমার জানা দরকার। সারখেল আর মালপানিও শুনুন।… বলো হে তোমরা যা ভেবেছ বলো। আমি একটু আসছি…!”
কেদারহরি বললেন, “তুই কি ওঁ জলং তৎসৎ করতে যাচ্ছিস! তা হলে আমিও যাব!”
“আয়।”
খানিকটা পরে জয়হরিরা— মানে জয়গোপাল আর কেদারহরি ফিরে এসে দেখলেন, উদয় অন্যদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, “এই কী একটা মেনু! মানে সজ্জন মণ্ডলের গোল্ডেন জুবিলির অনুষ্ঠানের প্রোগ্রাম! সেই থোড় বড়ি খাড়া! খাড়া বড়ি থোড়! গান, শ্যামাসঙ্গীত, সভাপতির বক্তৃতা! ও কেউ শুনবে না। লোক উঠে যাবে। প্যাণ্ডেল ফাঁকা।”
“তা হলে?” জয়গোপাল বললেন।
“আমি একটা ভেবে এসেছি। আসবার সময় ট্রেনে বসে ভাবছিলাম। লং জার্নি! যদি অভয় দেন, বলি।”
“বলো!”
“একেবারে নতুন ধরনের হবে! ইন্টারেস্টিং! লেগে যাবে।”
“আগে তোমার প্ল্যানটা শুনি।”
উদয়গোপাল একবার সারখেল আর মালপানির দিকে তাকালেন। চোখে চোখে কথা হল। মানে উদয় আগে থেকেই বন্ধুদের মতলবটা শুনিয়ে রেখেছেন। সারখেল চোখ টিপলেন, গো অন…!
উদয় বললেন, “দাদারা, এটা তো এখানকার কালী পুজোর পঞ্চাশ বছর— গোল্ডেন জুবিলি, আপনাদের বয়েসের তো নয়,সে জুবিলি সবাই পেরিয়ে এসেছেন! আজ যাঁদের বয়েস ষাট, পঁয়ষট্টি, সত্তর ছাড়িয়ে গেল— তাঁরা—মানে তাঁদের কাছ থেকে লোকে দু’পাঁচটা মজার কথা, জীবনবাণী, কী বলে গার্হস্থ্য উপদেশ, সহজ সত্যকথা শুনতে চায়। কাজেই আমি একটি ভাবনাচিন্তা করেছি।”
“বলে ফেলো। অকারণ বাকবিস্তার করো না। আটটা সোয়া আটটার মধ্যে মিটিং শেষ করে কচুরিবিলাসে বসতে হবে,” বারিদ বললেন। বলেই নাক টানলেন। এই ঘরের কাছাকাছি এক ঘেরা-বারান্দায় জয়গোপালের নিজস্ব বাবুর্চিখানা। সেখানে, কুকিং বুথে, মিত্তিরমশাইয়ের হুকুমমতন বন্ধুবান্ধবের জন্যে চা ও এটা-ওটা খাবার তৈরি হয়। বলরাম হল কুক। হাত ভাল। মিত্তিরমশাইদের বৃহৎ সংসারের সঙ্গে এই রান্নাঘর বা চা পর্বের কোনো সম্পর্ক নেই।
উদয় বললেন, “কচুরিবিলাসটা কী?”
“নতুন টাটকা কড়াইশুঁটির কচুরি। হিং সমেত।”
উদয় সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন, “বাঃ, বাঃ! দারুণ! তা হলে আমি থাকতে থাকতে একদিন কালিয়াদমনও হয়ে যাক।”
বারিদ বললেন, “সেটা আবার কী হে!”
“তেমন কিছু নয় দাদা, ভাল পাকা মাছের কালিয়া। তাকেই বলি কালিয়াদমন।”
সবাই হেসে উঠল।
শম্ভু হালদার বললেন, “ইউ. জি. তুমি সাউথে থাক বলছ! বাংলাটা এখনও জিব দিয়ে ভালই খসছে তো!”
“আজ্ঞে, আমি অবসর সময়ে বাংলা নভেল লেখার চর্চা করি, আর পুরনো বাংলা বইপত্র যা জোটাতে পেরেছি তাই পড়ি। কথাটা আমার নয়, কেদার বাঁড়জ্যের। বই খুলে দেখতে পারেন।”
জয়গোপাল হাত তুলে বললেন, “স্টপ। তোমরা থামো। ওই দেখো সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছে। সাতটা চল্লিশ। উদয়, তুমি কাজের কথা বলো। সময় নষ্ট কোরো না।”
কচুরিবিলাসের জন্যে সবাই তখন ব্যস্ত। অকারণ বিলম্ব কারও পছন্দ নয়।
উদয় বার দুই গলা পরিষ্কার করে নিয়ে নিজের প্ল্যান বাতলাতে লাগলেন।
যথারীতি আপত্তি উঠল, অসুবিধের কথা তোলা হল, এমন কি সন্দেহ প্রকাশও করা হল উদয়ের অনুষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু সারখেল, মালপানি, প্রিয়গোপাল উদয়ের প্রস্তাবকে সরবে সমর্থন করলেন।
জয়গোপাল আর ভোট নিলেন না, তাঁরও পছন্দ হয়েছিল ব্যাপারটা। তিনি বললেন, “তবে তাই হোক। বেশ নতুনই হবে। শম্ভু, তুমি আর সারখেল পাড়ার মধ্যে ব্যাপারটা বলে দাও। ছেলেদেরও জানিয়ে দিও ; মাইকে বলে দেয় যেন আমাদের কথা। তবে ডিটেল না বলে। বুঝলে?”
দুই
কালীপুজো, দেওয়ালি উৎসব, বিসর্জন, ছেলেদের আর কালী-কমিটির জলসা শেষ হয়ে যথা দিনে সজ্জন মণ্ডলের উৎসব বা অনুষ্ঠান শুরু হল।
কার্তিক মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। সামান্য ঠাণ্ডাও পড়ছিল আজকাল। বাজি পটকার চোটে সেই ঠাণ্ডা ভাবটাও আচমকা কমে গিয়েছিল মাঝের ক’দিন। আজ আবার ঈষৎ ঠাণ্ডা দেখা দিয়েছে, কুয়াশাও জমছে চারপাশে, আকাশের কালো পটে তারা বেশ উজ্জ্বল।
রঘুপুরের কালীবাড়ির মাঠে মাঝারি ধরনের প্যান্ডেল। শ চার পাঁচ লোক অনায়াসেই বসতে পারে চেয়ারে বেঞ্চিতে। আলোটালোর ব্যবস্থাও ভাল। সভা মণ্ডপটিতে কোনো জমকালো ব্যাপার নেই। সাধারণভাবে সাজানো। তবে ওই যে পঞ্চাশটি বড় বড় প্রদীপ প্রায় গোল করে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, আর আশেপাশে চার পাঁচ জোড়া ছোটবড় হরিনাম-লেখা চাদর পেছন দিকে পতাকার মতন উড়ছে— এটি বেশ দেখাচ্ছিল। কিছু ফুলও অবশ্য আছে।
