জয়গোপাল আবার লাঠি ঠুকলেন। “আঃ, থামো। বুড়ো হলেই বকবক। যত্ত বাজে অভ্যেস। কাজের কথা হোক।…আমরা কী করব, তাই বলো?”
বারিদ ভট্টাচায্যি বললেন, “সে সব তো মোটামুটি ঠিক করা আছে, মিত্তিরদা। কাল পুজো, বিসর্জন। তরশু প্যান্ডেলে ছেলেছোকরারা আর কালী-কমিটি জলসা করবে। নরশু আমাদের সজ্জন মণ্ডলের অনুষ্ঠান।”
“সব বলা-কওয়া আছে?”
“হ্যাঁ। শরদিন্দু, সেনাপতি, অভয়-কমিটির সবাইকে বলে দিয়েছি। ছেলেগুলোকেও।”
জয়গোপাল খুশি হলেন। বললেন, “কাল সকালে বেড়াতে যাবার সময় আমি শরদিন্দুর সঙ্গে একবার কথা বলে যাব।…এবার পুজোর ব্যবস্থা কেমন? সেদিন চোখে পড়ছিল। কাজ চলছে। ভাল বলেই তো মনে হল।”
শম্ভু হালদার বললেন, “খারাপ কেন হবে, দাদা? ট্রাডিশন বলে একটা কথা আছে। রঘুপুরে কোনওদিন খেলো কুচ্ছিত কালীপুজো হয়েছে? পঞ্চাশ বছর আগে যেভাবে ভাবভক্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই ভাবেই আছে। প্রত্যেকটি মরাল কোড মেনে।”
ফণিপ্রসাদ মজা করে বললেন, “রঘুবংশ তো ফেলনা নয়!…তবে সেই পঞ্চাশ বছরের পুরনো পাড়া তো আর নেই। তখন এই পাড়া ছিল ধাপধাড়া, শহরছুট ; বুনো কুল, টোকো আমড়া আর আঝোপে ভরা। রেল লাইনের দিকে মারশি—পেঁকো জমি। হাতে গোনা বাড়ি। তখন আমরা হ্যাফ প্যান্ট পরি, মাঝে মাঝেই লেটার বক্স খুলে যায়…”
সকলেই জোরে হেসে উঠলেন।
হাসি থামলে জয়গোপাল বললেন, “তা ঠিক। তবে তোমাদের চেয়ে আমার দেখাশোনা খানিকটা বেশি হে! আমি সিনিয়ার মোস্ট।”
কেদারহরি আধবোজা চোখে মাথা নেড়ে বললেন, “মিথ্যে বলিস না মিত্তির। আজ ভূতচতুর্দশী, মাথার ওপর মঘা আছে। তুই ভাই আমার চেয়ে বারো দিনের ছোট। …এক আঁতুড়ে জন্মাইনি বলে তুই সিনিয়ার মোস্ট হয়ে যাবি!”
“তোর পাঁজিতে ভুল আছে। ভুল ছক। নতুন ক্যালকুলেশানে পিছিয়ে যাবি।…যাক, বাজে কথা থাক, ফণী কী বলছিল!”
ফণিপ্রসাদ বললেন, “বলছিলাম ট্রাডিশানের কথা। আপনার ইয়াং এজে যেমনটি দেখেছেন, আমরা ছেলেবেলায় যেমন দেখেছি— সব তেমনই আছে। হ্যাঁ, তখন পাড়া ছোট বলে পুজোর চেহারাটা ছিল খানিকটা টিমটিমে ; এখন পাড়া বড়, লোকজন অনেক ; কাজেই ব্রাইটনেস বেড়েছে। তবে মিত্তিরদা, পুরনো কোড ভাঙা হয়নি। চাঁদা যে যেমন দেয়, প্রতিমা সেই আগের মডেলেই, মায়ের হাতে খাঁড়া আছে তবে গলায় মুণ্ডমালা নেই, পায়ের তলায় শিব আছে, মা কিন্তু ঊর্ধবনেত্র। গায়ের অলঙ্কার মাকে ঢেকে রেখেছে। ভেরি বিউটিফুল।”
শম্ভু হালদার বললেন, “ফণী আসল কথাটাই বলল না। আসল কথা হল, পুজো আমাদের ভালই হয় মিত্তিরদা, আপনিও জানেন। যা হয় না, কোনো কালে এখানে হয়নি, তা হল—ওয়াগান ব্রেকার, গুণ্ডা ক্লাস, ট্রান্সপোর্ট বিজনেসের লোক, চাল চিনি সিমেন্টের ইয়েদের কাছ থেকে কোনো সেলামি নেওয়া হয় না।”
জয়গোপাল বললেন, “তা হলে আমাদের জন্যে যে দিনটা ঠিক করা হল— সেদিন আমরা বুড়োরা কী করব! কিছু ভেবেছ?”
বারিদ ভট্টাচায্যি বললেন, “আমি ভেবেছি।”
“কী?”
“প্রথমে উদ্বোধনী সংগীত, পরে খানিকটা গান-বাজনা—বুড়োদের, শ্যামাসঙ্গীত কালীকেত্তন, শেষে সজ্জন মণ্ডলের সভাপতি মিত্তিরদার অভিভাষণ…”
বারিদের কথা শেষ হয়নি তখনও, দরজায় তিন মূর্তিকে দেখা গেল।
সারখেল ডাক্তার একপাশে, অন্যপাশে মালপানি ; মাঝখানে এক ভদ্রলোক। সারখেল ডাক্তার আর মালপানি মাঝের ভদ্রলোকের দু পাশের দুই হাত এমন করে চেপে ধরে আছেন, যেন দুই সৈনিক দু পাশ থেকে কোনো শত্রুপক্ষের গুপ্তচরকে ধরে রাজ্যসভায় পেশ করছে। নাটকীয় ব্যাপারের মতন দেখাচ্ছিল দৃশ্যটি।
ঘরের সবাই হাঁ করে সারখেলদের দিকে তাকিয়ে।
সারখেল ডাক্তারই কথা বললেন প্রথমে জয়গোপাল মিত্তিরের দিকে তাকিয়ে। “দেখুন মিত্তিরদা, কাকে ধরে এনেছি।”
বৈঠকখানার কেউই বুঝতে পারছিলেন না—কাকে ধরে আনা হয়েছে। মাথায় কালো মাদ্রাজি টুপি, গায়ে গলাবন্ধ কোট, পরনে প্যান্ট।
জয়গোপাল বললেন, “কে ও?”
“আমাদের ইউ. জি. ঘোষ। উদয়গোপাল। ইউ. জি.-কে আমরা আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ঘোষ বলতাম, মনে পড়ছে না?”
প্রিয়গোপাল যেন লাফিয়ে উঠলেন, “আরে আরে, ইউ. জি. !… এ জুয়েলকে তুমি কোথথেকে পেলে সারখেল?”
মালপানি বললেন, “ধরতে হয়েছে। ইফ দেয়ার ইজ এ উইল দেয়ার ইজ এ ওয়ে…।”
জয়গোপাল ধাতস্থ হয়ে এসেছিলেন। বললেন, “সত্যিই উদয় নাকি?”
উদয়গোপাল হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সকলকে নমস্কার জানালেন। বললেন, “আমি উদয়গোপাল ঘোষ। ইউ. জি.। আমাকে এখানে ইনভাইট করা হয়েছিল। মালপানি লিখেছিল, আমরা কালী পুজোতে গোল্ডেন জুবিলি করছি, তুমি অবশ্যই এসো।আমি এসেছি।”
শম্ভু হালদার বললেন, “সেই যে তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে, কত বছর হল যেন, পঁচিশ ত্রিশ বছর—তারপর এই তোমার উদয়!”
ইউ. জি.—মানে উদয়গোপাল বলল, “তিরিশের বেশি, শম্ভুদা। আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম সিক্সটি টুয়ে…সঙ্গে ললিতা ছিল। ললিতা এখনও আছে। তাকে আনতে পারলাম না। অনেক কাজ…।”
“তুমি এখন আছ কোথায়?” বারিদ জিজ্ঞেস করলেন।
“সাউথে। পাট্টা ডাকালে…!”
“সেখানে কী কর?”
“আমাদের ক্লিনিক আছে। ন্যাচারাল এলিমেন্ট অ্যান্ড হারবাল মেডিসিন দিয়ে নানা রকম অসুখের চিকিৎসা করা হয়। ললিতা সেখানকার সুপারিনটেনডেন্ট।”
