উমাশশী অবাক। “ওমা, এসব ছেলেমেয়েরা করত। কী সর্বনেশে ছেলেমেয়ে। তাই দেখতাম, ওরা চোর-চোর ভাব করে থাকত। তুমি নেই—তাতেও ওদের মন খারাপ দেখতাম না।”
সারদা বললেন, “এটা ওদের ফাদারের সঙ্গে উইথ অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়েছিল।…আরে, তপুই তো আমায় একেবারে ভোরবেলায় সাইকেলে সুটকেস ঝুলিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গেল।”
উমাশশী চুপ। খানিকটা পরে বললেন, “ছিছি, ছিছি, ছেলেমেয়েকেও একেবারে বাপের মতন তৈরি করেছ। বুঝবে ওরা মজা। সবাই তোমার উমা হবে না বুঝলে।” বলেই কি খেয়াল হল উমাশশীর, বললেন, “ছেলেমেয়েদেরও বলেছ নাকি, সেদিন তুমি আমার কাছে কী খেতে চেয়েছিলে?”
সারদা জোরে হেসে ফেললেন। বললেন, “ধ্যুত, আমি কি সত্যিই ছাগল নাকি। ওয়াইফ হাজব্যান্ডের ব্যাপার, ওদের কি বলতে আছে।”
মিলনোৎসব
দেওয়াল ঘড়িতে সাতটা বাজল। শব্দ করেই। উনিশ শো একের ইংলিশ ‘রয়েল’ ওয়াল ক্লক ; এখন রয়েলের গলা প্রায় বুজে এসেছে। কেদারহরি বলেন, ওটা রয়েল নয় ‘বয়েল’। তবু ওটা বাজল। সাতটা বাজতেই জয়গোপাল মিত্তির হাত তুলে বললেন, “আর নয়, গল্পগুজব অনেক হয়েছে, এবার কাজের কথা। হাতে সময় নেই। আজ বারোই কার্তিক। চোদ্দোই পুজো।”
বারিদ ভট্টাচায্যি বললেন, “আজ ভূত চতুর্দশী!”
শম্ভ হালদার বললেন, “প্রেতলোকের চোদ্দোটি প্রেতকে আজ ক্যান্ডেল দান করতে হয়, ভট্টাচায্যিমশাই! কেননি?”
বারিদ কিছু বলার আগেই জয়গোপাল লাঠি ঠুকে বললেন, “স্টপ। বলেছি কাজের কথা ছাড়া এখন আর কিছু হবে না। আটটায় আমরা উঠব।”
প্রিয়গোপাল চড়েচড়ে বসলেন, “তা হলে আর দেরি কেন মিত্তিরদা, শুরু হয়ে যাক। কথায় কথা বাড়ে। আটটার জায়গায় ন’টা হয়ে যাবে দেখবেন!”
জয়গোপাল মাথা নাড়লেন। তা তিনি হতে দেবেন না।
জয়গোপাল সম্পর্কে কয়েকটা কথা এখানে বলতে হয়। তাঁর বয়েস বাহাত্তর ছাড়িয়ে গিয়েছে। শরীরে দশ আনা হাড়, চার আনা মেদ মজ্জা, দু আনা পোশাক-আশাক। মাথাটি পুরোপুরি টাকে ভরা, ঘাড় আর কানের দিকে দু-চার গাছা সাদা ধবধবে চুল। তবে মুখটিতে এখনও ব্যক্তিত্ব রয়েছে। লম্বা নাক, বসা গাল, সরু থুতনি। গায়ের রং ফরসা। চোখের দৃষ্টি সতর্ক। জয়গোপাল একসময় জজ-ম্যাজিস্ট্রেটকেও নাকানিচোবানি খাইয়েছেন, পয়লা নম্বর উকিল ছিলেন এই অঞ্চলের। ব্যক্তিত্ব হল ছাই চাপা আগুন। তাঁর সেই ব্যক্তিত্ব যাবে কোথায়! এখনও আছে।
জয়গোপাল মিত্তিরের আরও অনেক কিছু আছে। যেমন এই তেতলা বাড়িটি। পৈতৃক বাড়ি। তিন ভাই থাকেন। সদ্ভাবে এবং সহর্ষে। নীচের তলায় এই ঘরটি জয়গোপালের বৈঠকখানা। এককালে এখানে বসে মক্কেলদের মামলা শুনতেন। এখন এটিকে তিনি নিজস্ব বৈঠকখানা করে নিয়েছেন। সাজসজ্জা সেই পুরনো আমলের। তবে এরই মধ্যে ফরাস তাকিয়ার সঙ্গে দু-এক জোড়া সোফাসেটিও ঢুকে পড়েছে। জয়গোপাল বসেন আর্মচেয়ারে।
জীবনটাকে এখন মোটামুটি ছকে সাজিয়ে ফেলেছেন জয়গোপাল। সকালে এক ঘন্টা ধোপি মাঠে প্রাতর্ভ্রমণ, বেলায় চা আর পরিজ, সংবাদপত্র পাঠ ; বেশি বেলায় কিঞ্চিৎ নুন মেশানো ঈষদুষ্ণ জলে স্নান, স্বল্প আহার, দুপুরে বিশ্রাম, বিকেলে চা ও একটি ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কিট, রামদাস মালিকে নিয়ে বাগান পরিচর্যা। সন্ধেবেলায়’ পাড়ার বুড়োদের সঙ্গে বৈঠকখানায় বসে গল্প। রাত্রে পারিবারিক আসর। শোবার সময় বিগতা স্ত্রীর ছবিতে একটি স্নেহচুম্বন। অবশেষে নিদ্রা।
জয়গোপাল নিজে যদিও নামকরণ করেননি—তবু তাঁর সভাসদরা এই বৈঠকের নাম দিয়েছেন, ‘সজ্জন মণ্ডল’। এই সভার সদস্য হতে হলে বয়েস কম করেও ষাট হতে হবে, ওপরের দিকে কোনো বয়েস-বাধা নেই। তবে আপাতত বয়োজ্যেষ্ঠ বলতে আছেন জয়গোপাল, আর কেদারহরি। দু জনেই বাহাত্তর। আর এক জন ছিলেন, হরেন ঘটক, সত্তর বাহাত্তর টপকে চুয়াত্তরে আসতেই গত বছর নিউমোনিয়াতে চলে গিয়েছেন।
আপাতত গল্পে আসা যাক।
জয়গোপাল ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা কজন আছ?” প্রিয়গোপাল মাথা গুনে বলল, “ন’জন মিত্তিরদা।”
“ওতেই হবে। সারখেল আর মালপানি আসেনি?”
“আসার কথা। সারখেলের চেম্বার বন্ধ হয় সাতটায়। এসে পড়বে।”
বারিদ বললেন, “গর্জন বন্ধ না হলে আসবে কেমন করে?”
“কিসের গর্জন?”
“ওই প্র্যাকটিস আর কী, মিত্তিরদা! সারখেল ডাক্তার এখনও গর্জনশীল—মানে বোরিং প্র্যাকটিস নিয়ে থাকে তো?”
সভ্যরা হেসে ফেললেন।
কেদারহরি পানের পাতায় কিমামের মতন একটু করে আফিং লাগিয়ে গালে রাখেন। বলেন, কাবলি কিমাম। তাঁর গলা এবং চোখ দুইই ঝিমিয়ে আসে সন্ধে বাড়লেই। কেদারহরি বললেন, “মালপানি! সে কোথায়! তারই তো উদ্যুগ বেশি ছিল!”
শম্ভু হালদার মাথা নাড়লেন। “তার একার কেন হবে, আমাদেরও ছিল। আমরাও বলেছিলাম, এবারের কালী পুজোর গোল্ডেন জুবিলিতে—আমরা বুড়োরাও একটা কিছু করব!…মিত্তিরদা, আজ আমরা বুড়োহাবড়া, কিন্তু আপনি বলুন—চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে যখন জোয়ান ছিলাম—তখন কারা বেল দ্য ক্যাট করত।”
ফণিপ্রসাদ বললেন, “আঃ-হা! মা কালী আবার ক্যাট হল কবে! শম্ভু, তুমি যে কী বলো! কালী হলেন, উজ্জ্বল জ্যোতিষাদগ্ধ স্তেষান্ত পরমাং গতিম।’’
শম্ভু হালদার ভুরু কুঁচকে বললেন, “সংস্কৃত শেখাচ্ছ আমাকে।”
