“নেভার। তোমায় লাথি মারার মতন পায়ের জোর আমার নেই।…”
“বোলো না, বোলো না। ও-কথাটি বোলো না। আমায় তো মারছই, আমার বাবাকেও ছাড়ছ না! গুরুজন মানুষ, কবে স্বর্গে গেছেন; তাঁকেও তুমি রেহাই দিলে না। ছেলেমেয়ের কাছে ওইসব কুচ্ছিত কথা লিখেছ। লেখে কেউ? আমায় তুমি যা খুশি বলল, সারা জীবনই শুনছি, তা বলে আমার বাবাকেও গালাগাল দেবে!”
সারদা বুঝলেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে বোধহয়। বললেন, “তোমার বাবা আমার ঠিক টার্গেট নয়, তোমাকেই…”।
“জানি। কিন্তু কোন দোষটা আমার হয়েছে, কর্তা?”
সারদা চুপ।
উমাশী বললেন, “সেদিন তোমার দুধে মাছিও পড়েনি, টিকটিকিও পড়েনি। জ্বাল একটু কম হয়েছিল। তা আমার এই হাতির গতর নিয়ে রান্নাঘরে বসে দুধ জ্বাল দিতে আর পারি না। এই তো আমার দোষ!”
“দুধের কথা কেউ বলছে না।”
“তবে কি সন্ধেবেলার কথা বলছ? সন্ধেবেলায় মাথা গরম কে করেছে, আমি না তুমি? কোথায় তোমার দাঁতের পাটি, চশমা—সে কি আমি জানব, না আঁচলে বেঁধে রাখব।”
সারদা গম্ভীর। কথা বলছেন না।
উমাশশী বললেন, “রাগের কারণ থাকবে তো? কথায় কথায় মেজাজ, হম্বিতম্বি, গালমন্দ। কোন খানটায় তোমার ত্রুটি হয়? রং গোপালঠাকুরের মতন করে রাখি।”
সারদা বললেন, “গোপাল না গোবৎস?”
“মানে?”
“সেদিন তোমায় কতবার বললুম,” বলতে গিয়ে থেমে গেলেন সারদা।
“কী বললে?”
সারদার গলায় আর কথা ফোটে না। বার দুই ঢোঁক গিলে বললেন, “সেদিন সকালে তুমি যখন পুজো সেরে এসে কাপড়চোপড় ছাড়ছিলে—মাথাটাথা ঘষেছ চুলটুল এলোমেলো, কপালে চন্দনের টিপ, সেমিজ টেমিজ ইয়ে হয়নি—আমি তোমায় কী বলেছিলাম।”
“কী বলেছিলে? বলার মধ্যে তো দেখলাম, রস রসিকর্তা করে ওই হতকুচ্ছিত তোমার গীতগোবিন্দ গাইছিলে।”
“গাইছিলাম। কিন্তু হতকুচ্ছিত কোন জিনিসটা গেয়েছি?”
“গেয়েছ! আমি যেন কচি খুকি, তোমার ওই সব বাজে বাজে বিগলিত বসনং টসনং আমি বুঝি। যত সব অসভ্যতা।”
“তুমি কিছু বোঝ না।” সারদা রোয়াব করে বললেন যেন।
“বুঝি না। আমার বাবা আমায় মুখ্যু করে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিল নাকি? তোমার ওই আধিখ্যেতার নিতম্ব, ঘটকুচ, তালফল সবই বুঝি কর্তা। কার সঙ্গে বত্রিশ বছর ঘর করলাম, তা আর জানি না।”
সারদা বললেন, “বোঝ তো সেদিন কেন বুঝলে না—যখন বললাম, দেহি মুখ-কমল-মধু পানম্…”
“বুঝব না কেন, খুব বুঝেছি। কিন্তু তখন চচ্চড়ে আলোয় ঘরের মধ্যে তোমার মধুপানের বহরটাই বা হয় কেন? ঢংয়ের বয়েস তোমার ফুরোয়নি?
“এক একটা সময়ের এক একরকম মুড। তখন একটা মুড এসেছিল। এখন ও-সব কথা বলা মিনিংলেস।”
উমাশশী কয়েক মুহূর্ত স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর গায়ের আঁচল আরও আলগা করে, জামার বোতাম খুলে খাটে শুয়ে পড়লেন। সারদা বিছানায় বসে।
উমাশশী বললেন, “মেঝে থেকে বালিশটা এনে শুয়ে পড়। বাতিটা নিবিয়ে দিও। কেরাসিনের গন্ধ আমি সইতে পারি না।”
খাটটা ছোট। উমাশশীর ওই শরীরের স্থান কুলিয়ে সারদার দেহটি ধরবে কিনা—বুঝতে পারলেন না সারদা। টেনেটুনে একটু জায়গা হতে পারে।
সারদা বললেন, “তোমার কষ্ট হবে।”
উমাশশী জবাব দিলেন, “আমার কষ্ট তোমায় আর ভাবতে হবে না। এই বত্রিশ বছর অনেক ভেবেছ।” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “এই কুড়ি পঁচিশটা দিন ঘরে একলা খাটে শুয়ে থেকেছি আর বুক আমার হু হু করেছে।”
উমাশশীর মুখে ‘হুহু’ শুনে সারদা লাফ মেরে মাটিতে নামলেন এবং অত্যন্ত ত্বরিত গতিতে বাতি নিবিয়ে মাটি থেকে বালিশ তুলে এনে স্ত্রীর পাশে শুয়ে পড়লেন।
স্বামীর দিকে পাশ ফিরেই শুলেন উমাশশী। মুখ থেকে পান আর জরদার গন্ধ আসছিল।
সারদা স্ত্রীর মোটাসোটা হাতটি বুকে টেনে নিয়ে বার কয়েক নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “তুমি শুধু ‘দেহি মুখ-কমল-মধু পানম্’ পর্যন্তই দেখলে উমারানী, তার ক’ লাইন পরেই রয়েছে—‘তুমসি মম ভূষণং তুমসি মম জীবনং তুমসি মম ভব-জলধি-রত্নম। তুমি আমার ভূষণ, তুমিই আমার জীবন…”
উমাশশী রঙ্গ করে বললেন, “থাক থাক, অত ভূষণ-টুসন করো না, তোমার তো বুকে ব্যথা, হাতটা ছাড়, বুকে লাগলে ব্যথা করবে।”
সারদা বললেন, “বুক জুড়িয়ে যাচ্ছে! তোমার হাতটা এখনও কেমন নরম।…কিগো আঙুলের গাঁটটাট ফুলেছে নাকি? এখন তো পূর্ণিমা। বাতে কষ্ট হচ্ছে?”
উমাশশী মাথা নেড়ে বললেন, “বাতের কথা বাদ দাও। ও তো তোমারই দোসর।”
সারদা খুব খুশি হলেন। স্ত্রীর অঙ্গে প্রত্যঙ্গে বাত হয়ে থাকার বাসনাই তো তাঁর ছিল। বললেন, “বোস্টমদের সেই গান জান না? সেই রকম। তোমার গায়ে বাত হয়ে জড়িয়ে থাকাও যে কত শান্তির। আহা!”
উমাশশী এবারে এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। স্বামীর গালে তবলার বোল তোলার মতন করে একটা চুমু খেতে গেলেন, পারলেন না—এই বয়েসে তা কি সম্ভব! ছপ করে শব্দ হল কেমন, পান আর জরদার ছোপ আর গন্ধ লেগে গেল সারদার গালে।
সারদা চোখ বুজে বললেন, “এটা সেদিনের। আজকের আর একটা দাও। অন্য গালটা ফিরিয়ে দিচ্ছি। লাইক এ কৃশ্চান।”
দুজনে যখন পরম আনন্দে চোখ বুজে আছেন, উমাশশী বললেন, “হ্যাঁগো, তা তুমি তো এখানে বসে বসে চিঠিগুলি লিখতে। খামের ওপর ছাপ পড়ত ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া। কেমন করে পড়ত?”
সারদা বললেন, “সে তোমার ছেলে জানে। আমি তো আলগা স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিতাম খামে। তোমার ছেলে চিঠি পেয়ে সেগুলো তুলে পুরনো ধ্যাবড়া ডাক টিকিট লাগিয়ে দিত।”
