অনেকক্ষণ থেকেই সারদা একবার ছেলেকে ডাকার ছুতো খুঁজছিলেন। পেরে উঠছিলেন না উমাশশীর ভয়ে। সুযোগ পেলেন আরও খানিকটা পরে। পরিমল মাঝে মাঝে তদারকি করতে আসছিল। অবশ্য ঠিক তদারকি নয়, উমাশশী আর রেবার মধ্যে যে সব কথা হচ্ছে, আড়ালে তার সমাচার জানাতে আসছিল। সারদা ভায়রাকে বললেন, “একবার তপুকে ডেকে দিতে পারো! বি ভেরি কেয়ারফুল।”
তপু একসময় চোরের মতন এসে ঘরে ঢুকল।
সারদা বললেন, “কিরে, পজিসন কী?”
তপু বলল, “তুমি খুব টাইমলি রিট্রিট করেছ। নয়ত কামানের গোলা খেতে। আমরা আর পজিসন ধরে রাখতে পারছিলাম না।”
সারদা বললেন, “আমার আরও একটা দুটো ফাইন্যাল অ্যাসাল্টের ইচ্ছে ছিল। তোদের মেসো মাসিই ডোবাল।”
তপু ফিসফিস করে বলল, “না না, আরও অ্যাসাল্ট হলে আমরা সরে যেতাম।” বলে তপু আর দাঁড়াল না। পালিয়ে গেল।
সারদার ভাল লাগছিল। তিনিই তো শেষ পর্যন্ত জিতেছেন। কিন্তু ভাল লাগাটা স্থায়ী হচ্ছিল না; ভয়ও হচ্ছিল। ভরসা পাচ্ছিলেন না। উমাশশীর সঙ্গে নিভৃত সাক্ষাতে তাঁর যে কী অবস্থা হবে, সে শুধু ভগবানই জানেন।
আসামাত্র স্বামীর সমস্ত কর্তৃত্ব উমাশশী নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন। কাজেই রাত্রে সারদার চনচনে খিদে হওয়া সত্ত্বেও এক কাপ দুধ আর দুটো মামুলি বিস্কিট ছাড়া কিছু জুটল না। হার্টের অসুখে পেট হালকা রাখতে হয়, নয়ত গ্যাস উঠে বুকে ঠেলা মারবে। উমাশশীর বাবা হার্টের রোগেই মারা গিয়েছিলেন, তা ছাড়া কতই না শুনছেন তিনি।
রাত হল। সারদার খাটটা ছোট। উমাশশী নিজের শোবার জন্যে মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে একটা বিছানা পেতে নিলেন। রেবা পরিমল অনেক আপত্তি করেছিল, উমাশশী শোনেননি। স্বামীর অসুখ, তাঁকে তো সারা রাত বসে বসেই কাটাতে হবে, নজর রাখতে হবে রোগীর ওপর, ওই একটা কম্বল মাটিতে পাতা থাকা—ওতেই হবে।
খাওয়াদাওয়ার পাট চুকে গেলে উমাশশী সারদার ঘরে এসে দরজায় ছিটকিনি তুলে নিলেন। পাশের ঘরটা রেবাদের। তার পাশে ছোট মতন বসার ঘর, তপুর বিছানা হয়েছে সেখানে।
ঘরে এসে উমাশশী আরও একটু জরদা মুখে দিলেন। বোধহয় আগেরটুকু কম হয়েছিল। বাতিটা কমিয়ে দিলেন। জানলা দুটো দেখলেন। ঠাণ্ডা আসছে সামান্য। মাথার দিকে জানালাটা ভেজিয়ে দিলেন। পাশের দিকেরটা খোলা থাকল। ঘরে চাঁদের আলো আসছে না, কিন্তু গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারদার পেটে খিদে, অনেকক্ষণ সিগারেটও খেতে পারেননি, বেশ অস্বস্তি লাগছিল। তার ওপর উমাশশী ঘরে এসে ছিটকিনি তুলে দেবার পর থেকেই সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
উমাশশী হঠাৎ পা দিয়ে নিজের বিছানা গুটিয়ে দিলেন। দিয়ে সারদার বিছানার কাছে এসে বললেন, “মটকা মেরে অনেকক্ষণ পড়ে আছ। দেখাচ্ছি তোমায়। ওঠো।”
সারদা চোখ বুজে ছিলেন। আরও চেপে চোখ বুজলেন। কানে যেন শুনতে পাননি। ঘুমিয়ে রয়েছেন।
ঠেলা মারলেন উমাশশী। “ন্যাকামি হচ্ছে! বুড়ো ঘুঘু!”
সারদা আরও ঘাবড়ে গেলেন। বুঝতে পারলেন না, তাঁর হার্টের রোগটাকে আঁকড়ে থাকবেন, না বিসর্জন দেবেন। চোখ খুলে জড়ানো গলায় বললেন, “আঃ, কে? বুকের বাঁ দিকটায়…” বলে বাঁহাতে বুক চেপে ধরলেন।
উমাশশী খানিকটা ধাক্কা মেরেই স্বামীকে খাটের একপাশে সরিয়ে দিয়ে পাশে বসলেন। মাথায় কাপড় নেই, গায়ের আঁচলটাও বুকের তলায় নেমেছে।
সারদা বুঝতে পারলেন, আত্মরক্ষা না করলে অবধারিত পতন।
উমাশশী স্বামীর বুকে জোর একটা খোঁচা মারলেন, “এখনও ঢং করে চোখ পিটপিট করছ? তাকাও ভাল করে, নয়ত চোখ গেলে দেব।”
সারদা তাকালেন। বললেন, “আমার বুকে ব্যথা, খোঁচা মেরো না, মরে যাব।”
“তোমার বুকে আমি কিল মারব,” বলে উমাশশী সত্যিই মুঠো পাকালেন।
ভয়ে সারদা ধড়মড় করে উঠে বসলেন। হাত নয় তো হামানদিস্তে উমাশশীর, বার দুই বুকে পড়লে পাঁজরা ভেঙে যাবে। সারদা বললেন, “হচ্ছেটা কী? তুমি কি আমায় মারধোর করতে এসেছ?”
“কী করতে এসেছি, বোঝাচ্ছি তোমায়।…আগে বলো, নগদ চারশো টাকা কোথায়?”
সারদার সম্মানে লাগল। বললেন, “তোমার কাছে টাকার হিসেব দিতে হবে?”
“হবে।”
“আমার টাকা। আমি যা খুশি করব।”
“চেঁচামেচি কোরো না। আস্তে কথা বলল। ঘরে তোমার ডাকাত পড়েনি। বেহায়া মদ্দ!…আমার আলমারি ভেঙে সংসারের টাকা নিয়ে পালিয়ে এসেছ, চোর কোথাকার। আবার বলছ, তোমার টাকা!”
সারদা অশান্তি বাড়াতে চাইলেন না। বললেন, “টাকা ফেরত পাবে। গোটা পঞ্চাশ খরচ হয়েছে।”
“আংটিটা কোথায়?”
“আছে।”
“জামা, প্যান্ট, শাল সব আছে? না হারিয়েছ?”
“সব আছে। এদিক ওদিক পড়ে আছে। খুঁজে নাও গে যাও।”
উমাশশী কানই করলেন না, মুখটা বেঁকালেন। বললেন, “বুড়ো বয়েসে এই ঢং করবার কী দরকার ছিল?”
সারদা জবাব দিলেন না। রাগ, দুঃখ অভিমান, অপমান—সব যেন মনটাকে তেতো বিমর্ষ করে দিচ্ছিল। মুখ গুম করে থাকলেন।
উমাশশী বললেন, “কথা বলছ না যে বড়। বোবা হয়ে গেলে?”
সারদা আরও খানিকটা চুপ করে থেকে বললেন, “কী হবে বলে! তুমি আমাকে কুকুর বেড়ালের মতো মনে কর, সেইরকম ব্যবহার কর।”
উমাশশী যেন থ’। গালে হাত দিলেন। “কুকুর বেড়ালের মতন করে আমি তোমায় দেখি। এত বড় কথাটা তুমি বলতে পারলে। বত্রিশ বছর বিয়ে হয়েছে, আমিই বরং তোমার লাথিঝাঁটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।”
