রেবা চায়ের পাত্র গুছিয়ে নিতে লাগল।
সারদা সামনের দিকে তাকিয়ে খুব পরিষ্কার চাঁদের আলো দেখতে পেলেন। এতক্ষণ ঠিক লক্ষ করেননি। বললেন, “আজই কি পূর্ণিমা?”
রেবা চাঁদের দিকে তাকাল। বলল, “বোধ হয়। গতকালও চাঁদটা এই রকম ছিল।”
সারদা বললেন, “পৃর্ণিমায় আমার যে যোগিনী রাধামাঈয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল।” বলে বেশ বড় করে নিঃশ্বাস ফেললেন সারদা।
“সে আবার কে?” রেবা জিজ্ঞাসা করল।
সারদা বললেন, “সে হল সাক্ষাৎ মোহিনী, যোগিনী, জাতিস্মর। অপরূপ-লাবণ্যময়ী কামিনী। বয়স চল্লিশের স্লাইট এপারে। আমার জন্মজন্মান্তরের গাঁটছড়া। তোমার দিদিকে ওটা লেটেস্ট দিয়েছিলুম। ওতেই উমারাণী কাত হয়ে পড়তেন। হচ্ছিলেনও একটু একটু, তোমরাই সব গণ্ডগোল করে দিলে।”
রেবা মুচকি হাসল। চায়ের পাত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠতে উঠতে বলল, “আপনার ঘরে বিছানাপত্তর ঠিক করে দিচ্ছি। খানিকটা পরে গিয়ে শুয়ে পড়বেন। আপনি কিন্তু হার্টের রোগী।” বলে হেসে উঠল!
সারদা বিছানায় শুয়েই ছিলেন। বড় বড় দুটো জানলার একটিমাত্র খোলা। ঘরে আসবাবপত্র বেশি নেই। সারদার খাটটিও ছোট, একার মতন। ঘরের কোণের দিকে কেরোসিনের টেবিল বাতি জ্বলছে। এখানে ইলেকট্রিক নেই। গায়ে একটা মোটা কম্বল চাপিয়েছেন সারদা। রেবা চাপিয়ে দিয়ে গেছে। কম্বল না চাপালে নাকি অসুখ-অসুখ দেখায় না। সারদা এই সন্ধেবেলা কম্বলচাপা হয়ে ঘামছিলেন। ঘামটা তাঁর ভাল লাগছিল না। কিন্তু হার্টের রোগী হিসেবে এটা সহ্য করছিলেন। মুখটা তাঁর এতই পরিষ্কার যে কিঞ্চিৎ মলিন না করলে চলছিল না বলে সারদা সামান্য পাউডারের সঙ্গে কাগজ-পোড়া ছাই মিলিয়ে মুখে মেখে নিয়েছেন পাতলা করে। উপায় নেই। শুয়ে শুয়ে বোধ হয় তিনি ভগবানের নাম জপছিলেন।
এমন সময় গাড়ির শব্দ। সারদার বুক কেঁপে উঠল। উমা কি এসেছে? না আসেনি?
সামান্য পরেই গলার আওয়াজেই বোঝা গেল, উমাশশী ছেলেকে নিয়ে হাজির হয়েছেন। সারদার বুক ধকধক করতে লাগল, গলা কাষ্ঠবৎ, গলগল করে ঘামতে লাগলেন। ছেলেবেলায় বলির পাঁঠা সম্পর্কে তাঁর যত মমতা ছিল নিজের ওপর তার চেয়েও বেশি মমতা হচ্ছিল। বলির পাঁঠা হতভাগ্য জীব, কিন্তু মানুষ আরও হতভাগ্য, পাঁঠার স্ত্রী থাকে না, মানুষের থাকে। অন্তত সারদার রয়েছে।
দরজায় পায়ের শব্দ। সারদা চোখের পাতা বুজে ফেললেন। জিব গলার দিকে টানতে লাগল। বুক আওয়াজ মারছে, নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছিলেন সারদা।
চোখ বন্ধ করেই সারদা বুঝলেন ঘরে উমাশশী, রেবা, পরিমল আর তপু এসে দাঁড়িয়েছে। আস্তে গলায় কথা বলছিল রেবা। “ডাক্তার বলেছেন, একেবারে চুপচাপ শুয়ে থাকতে। সাড়াশব্দ যেন না হয়। যত ঘুম হয় ততই ভাল। জামাইবাবু প্রথম দিকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন। কাল রাত থেকে ভাল। আজ সকালে দু’ একবার বিছানায় উঠে বসেছিলেন। বিকেলে চা খেয়েছেন। এখন বোধ হয় ঘুমোচ্ছেন। ডাকব!
“থাক, তোকে ডাকতে হবে না, আমি দেখছি…” বলে উমাশশী বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
সারদা চোখ বুজেই থাকলেন। কম্বলের তলায় হাত পা কাঁপছিল।
“আলোটা একবার আন তো,” উমাশশী বললেন, বলে বিছানায় বসতে গেলেন, কুলোতে পারলেন না, কোনোরকমে বসলেন। কপালে হাত দিলেন সারদার, বুকে হাত রাখলেন।
পরিমল আলো হাতে এসে দাঁড়াল। বোধ হয় আসার সময় পলতেটা আরও কমিয়ে দিয়েছিল। তার হাতও কাঁপছে।
উমাশশী স্বামীর মুখের ওপর আরও ঝুঁকে পড়ে কী দেখলেন। নিবিষ্ট চোখে। তারপর বললেন, “বড্ড ঘেমেছে। কম্বলটা চাপিয়ে দিয়েছিস কেন? জানলা খুলে দে।” নিজের হাতেই কম্বল সরিয়ে দিলেন উমাশশী। রেবা জানলা খুলে দিল।
উমাশশী বললেন, “তোয়ালে-টোয়ালে দে একটা, ঘামটা মুছিয়ে দি। এত ঘাম গায়ে জমলে সর্দিকাশি হবে।” বলেই কি খেয়াল হল, আবার বললেন, “আচ্ছা থাক, আমি হাত পায়ে জল দিয়ে কাপড় চোপড় ছেড়ে এসে বসছি, তারপর যা করতে হয় করব।”
রেবা বলল, “সেই ভাল। চলল, তুমি কাপড় ছেড়ে একটু চা খেয়ে নাও। জামাইবাবুর ঘুমটা ভাঙুক।”
উমাশশীরা চলে গেলেন। পরিমল শুধু দাঁড়িয়ে থাকল।
সারদা খুব সাবধানে চোখে খুললেন। তারপর পরিমলকে বললেন, “কী বলল হে?”
“কিছু না।”
“সেকি! স্টেশন থেকে এতটা পথ এল, কিছু বলল না?”
“অসুখের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন।”
“তুমি হার্ট ট্রাবল বলেছ তো?”
“বলেছি।”
“কেমন মনে হচ্ছে? ভয় পেয়েছে বুঝলে? ওয়ারিড?”
“তাই তো মনে হল।”
“…কোনো ফায়ারিং করল না?”
“কই! করল না!”
“খুবই আশ্চর্যের কথা।…দেখ কী হয়।…যাও, তুমি বাতি রেখে পালাও।”
পরিমল চলে গেল।
সারদা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যৎ-চিন্তা করতে লাগলেন। গিন্নির মতিগতি খানিকটা অন্যরকম মনে হচ্ছে। গলার স্বরটাও যেন নরম লাগল। কপালে বুকে হাত দেবার সময় হাতের চাপটি ভালই লেগেছিল। তা হলে কি শ্রীমতী উমাশশী একটু কাবু হয়ে পড়েছেন? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
গা ধুয়ে কাপড় ছেড়ে উমাশশী একবার স্বামীর বিছানায় এসে বসেছিলেন। সারদার গায়ের ঘাম তখন অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। শাড়ির আঁচলে বুক মুছিয়ে দিলেন কর্তার। মুখটা। সারদা ঘুমের ভান করে চোখ বুজেই থাকলেন। কর্তার মুখ মুছিয়ে আঁচলটা কাঁধে ওঠাতেই কিসের গন্ধ মতন লাগল। গন্ধটা নাকের কাছে এনে শুঁকে নিলেন। সারদা বার দুই উঃ আঃ—করলেন ঘুমের ভানের মধ্যেই। উমাশশী কিছুই বললেন না। খানিকটা পরে উঠে বোনের কাছে চলে গেলেন।
