রেবা হেসে ফেলেছিল। বলল, “বাঘকে আমরা সামলাব।”
“ও তোমাদের কর্ম নয়। বত্রিশ বছরে আমিই পারলাম না—তোমরা সামলাবে!…তা হ্যাঁ হে পরিমল, কী লিখেছ টেলিগ্রামে?”
“লিখেছি, সারদাদা সিরিয়াসলি ইল। কাম ইমিডিয়েটলি উইথ দিদি।”
“আমি ইল? অসুস্থ? সিরিয়াসলি অসুস্থ?…এসব কেন লিখলে? আমার চেহারাটা কি ইলের মতন দেখাচ্ছে? সর্বনাশ করলে তুমি হে! একেই তো মাত্র পনেরো মাইল দূরে পালিয়ে এসে বসে আছি; বসে বসে ব্লাফ ঝাড়ছি—হিমালয় টিমালয় পর্যন্ত চালিয়েছি চিঠিতে। তার ঠেলা সামলাতেই বাবার নাম ভুলে যাব। তার ওপর মুরগির আণ্ডা ওড়ানো, ঘি দুধ সেবন করা এই চেহারাকে ইল বলে চালানো কী সোজা কথা! তোমার দিদি কচি খুকি? ঝিনুকে দুধ খায়!…ওরে বাব্বা, এ কী সর্বনাশ করলে তোমরা! ডবল ব্লাফ! আমার মাথার চুল উপড়ে ফেলবে তোমার দিদি। পরিমল, আমায় বরং এখানে সমাধি দিয়ে দাও।”
রেবা জোরে হেসে ফেলল। পরিমলও।
পরিমল বলল, “বাঃ অসুখ হতে পারে না। আপনার অসুখ হয়েছে।”
“কী অসুখ?”
কী অসুখ? পরিমল ঝঞ্চাটে পড়ে গেল। কোন অসুখ করবে সারদাদার?
কোন অসুখ? পাঁচ সাতটা অসুখের নাম যেন এর ওর গায়ে জড়িয়ে ফাঁদে লেগে গেল। ঝট করে একটা নামও পড়ে পড়ল না। তারপর ঝপ করে নিওমোনিয়া-র নামটাই মাথায় এল। পরিমল বলল, “নিওমোনিয়া।”
“নিওমোনিয়া!…তুমি মুখে বললে আর নিওমোনিয়া হয়ে গেল। অত সহজ ব্যাপার! হাই টেম্পারেচার, বুকে কনজেসান, দু’চারটে বুক ফাটানো কাশি—এসব পাব কোথায়!” সারদা বললেন।
পরিমল ফাঁপরে পড়ল। কানের ডগা চুলকে বলল, “জণ্ডিস হতে পারে না?”
সারদা নিজের চোখ দেখালে। “আমার চোখ কি হলুদ? গা ফ্যাকাশে? ন্যাবা আরও ডিফিকাল্ট।”
পরিমল স্ত্রীর দিকে তাকাল। রেবা দুচারটে অসুখের নাম করল, ছোটখাটো অসুখ, ডায়েরিয়া ডিসেন্ট্রি গোছের। তাতে সারদা খুশি হলেন না। লিখেছ ‘সিরিয়াসলি ইল’, এখন বলছ ডায়েরিয়া। রসিকর্তা নাকি?
সারদা বললেন, “একটা আজেবাজে ছুতো করে ডেকে পাঠালে তোমাদের দিদি কী ভাববে, বুঝতেই তো পারছ। ভাববে কলকাঠিটা আমিই নেড়েছি। আমার ইজ্জত তো যাবেই, তোমাদেরও রক্ষে রাখবে না।”
রেবা বলল, “আমাদের ওপর বড়দি এমনিতেই রেগে আগুন হয়ে গিয়েছে। আপনি এত দিন ধরে রয়েছেন এখানে। আমরা কেন কিছু জানাইনি।”
“তোমাদের ওপর রাগবে কেন—” সারদা বললেন, “তোমরা বলবে, জামাইবাবু বাড়িতে রেগুলার চিঠি লেখেন, আমরা কেমন করে বুঝব, তিনি কিছু লুকিয়ে রাখছেন।”
রেবা বলল, “দিদিকে অত সহজে বোঝানো যায়! ঠিকই বুঝে নেবে—সবই ষড়যন্ত্র।”
পরিমল বার বার ঘড়ি দেখছিল। ঝাপসা অন্ধকারে চাঁদ উঠেছে। বলল, “আমি আর দেরি করব না। স্টেশনের দিকে এগোই।”
সারদা বললেন, “তা তো এগুবে। কিন্তু আমার কী হবে?”
পরিমল উঠতে উঠতে বলল, “আমি স্টেশন থেকে দিদিকে ম্যানেজ করতে করতে আসব। বলব, হঠাৎ খুব বাড়াবাড়ি হয়েছিল, আমরা ভয় পেয়ে টেলিগ্রাম করেছিলাম। সারদাদা এখন ভাল। কোনো ভাবনা নেই আর!”
সারদা যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমার মতন হাঁদা আমি আর জীবনে দেখিনি। তোমার দিদিকে না হয় বললে বাড়াবাড়ি হয়েছিল, কিন্তু কিসের বাড়াবাড়ি, তা বলতে হবে না? বাড়াবাড়িটা কিসের? কোন রোগের?”
পরিমল বলল, “ম্যালেরিয়া। এই বনজঙ্গল জায়গা। এখানে মশাটশা খুব। হঠাৎ ম্যালিগনান্ট টাইপের ম্যালেরিয়া হয়ে গিয়েছিল, একশো তিন চার জ্বর। ভীষণ কাঁপুনি। বিকার।…সে আমি ম্যানেজ করে বলে দেব।”
“ও-রকম বিকট ম্যালেরিয়াটা গেল কোথায়?” সারা জিজ্ঞেস করলেন।
“জ্বরটা ছেড়ে গেছে। কাল রাত্রে, কিংবা আজ সকালে।…ম্যালেরিয়ার জ্বর যখন তখন ছাড়তে পারে। কারও কিছু বলার নেই।”
“কী মুশকিল!” সারদা বললেন, “আমার চেহারাটাকে তো ম্যালেরিয়া রোগীর মতন করতে হবে। চকচক করছে চেহারা, কামানো মুখ, মাথায় জবাকুসুমের গন্ধ…। এখানে ম্যালেরিয়াকে আমদানি করবে কেমন করে! তুমি কনসিকুয়েন্সটা একেবারে বুঝতে পারছ না, পরিমল। তোমার দিদি পুলিশের মেয়ে, ওদের রক্তের মধ্যে সন্দেহ। অত সস্তায় শ্রীমতী উমাশশী গুপ্তকে ভোলানো যাবে না।”
পরিমল সমস্যায় পড়ল। সময় হয়ে আসছে। তাকে স্টেশনে যেতেই হবে। কম করেও মিনিট পনেরোর পথ। জিপ গাড়িটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে, নয়ত গাড়ি নিয়ে চলে যেত।
পরিমল বলল, “কিন্তু আমায় তো যেতে হবে। ট্রেনের টাইম হয়ে আসছে।”
রেবা কিছু ভাবছিল চুপচাপ। হঠাৎ মুখ তুলে বলল, তুমি যাও, আর দেরি কোরো না। আসার সময় একটা কিছু যোগাড় করে নিও। দিদিকে হাঁটিয়ে এনো না। হাঁটতে পারবে না ও।”
সারদা বললেন, “গড়িয়ে এনো।”
রেবা হেসে ফেলল। পরিমলকে বলল, “অসুখের কথা—মানে কী হয়েছিল তোমায় বলতে হবে না। বোলো, শরীরটা জামাইবাবুর খুব খারাপ হয়েছিল। এখানে ভাল ডাক্তার নেই। যাকে ডেকে দেখানো হয়েছিল, তিনি বলেছেন—হার্টের অসুখ।”
পরিমল একবার সারদার দিকে তাকাল।
সারদা যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বললেন, “তাই বোলো। হার্ট তো দেখা যায় না, ওটাই যা ভরসা।”
পরিমল ঘরের দিকে চলে গেল। হয়ত জামা পালটাতে, জুতো জোড়া পরে নিতে।
সারদা সিগারেটা আবার ধরিয়ে নিলেন।
একটু পরেই পরিমল বেরিয়ে এল। বলল, “আমি তা হলে আসছি।” বলে সে গেটের দিকে চলে গেল।
