পরিমল এবং রেবা কিছুক্ষণ সন্তর্পণে নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া চাওয়ি করছিল। যেন কিছু বলার আছে বলতে পারছে না। এমন সময় এঞ্জিনের হুইসল বাজিয়ে দূর দিয়ে একটা মালগাড়ি গোছের কিছু চলে গেল। পরিমল হুইসলের শব্দে রীতিমত ঘাবড়ে গেল, তাকাল স্ত্রীর দিকে। রেবা চোখে চোখে ইশারা করল কিছু।
পরিমল সারদা গুপ্তের দিকে তাকাল। ইতস্তত করল খানিকটা। তারপর বলল, “সারদাদা একটা—মানে একটা ব্যাপার হয়ে গেছে।”
“ব্যাপার?” সারদা বেশ আলসেমির চোখে ইউক্যালিপটাস গাছের নাচন দেখছিলেন। শীত আসি-আসি ভাব। বাতাস রয়েছে এলোমেলো। আকাশে আলো নেই। ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসবে একটু পরেই। ভায়রার দিকে চোখ ফেরালেন সারদা। “ব্যাপার! কী ব্যাপার হে?”
পরিমল গলা ঝাড়ল, সোঁ সোঁ করে বার দুই নিঃশ্বাস টানল, তারপর অপরাধীর মতন করে বলল, “আজ সন্ধের ট্রেনে ইয়ে আসতে পারেন।”
“ইয়ে! ইয়েটা আবার কে?”
পরিমল তার গলার কাছটা চুলকোতে লাগল। জড়ানো গলায় বলল, “দিদি।”
“দিদি? কোন দিদি?”
“বড়দিদি—মানে উমাদিদি!”
সারদা গুপ্তকে যেন বিছেয় কামড়াল। লাফ মারলেন না, কিন্তু তাঁর চোখমুখ নীলচে হয়ে গেল। একেবারে স্তম্ভিত। গলায় ঘড়ঘড় শব্দ হ’ল একটু। তারপর বললেন, “আমায় ভয় দেখাচ্ছ! তোমার বড়দিদি এখানে আসবে? কেমন করে আসবে?”
পরিমল একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করে নিল যেন, বলল “আসারই তো কথা। আমরা সন্ধের ট্রেনে দিদিকে এক্সপেক্ট করছি।”
বিশ্বাস করলেন না সারদা। মাথা নাড়লেন জোরে জোরে। “ধ্যুত, অসম্ভব। তোমার দিদি আমার ঠিকানা পাবে কোথায়! আমি তো এখন বিন্ধ্যটিন্ধ পেরিয়ে কোথায় চলে গেছি। হিমালয়ে। গঙ্গোত্রীর পথ ধরেছি। এক একটা ডোজ যা দিচ্ছি তোমার দিদিকে—উমারাণীর মাথায় চক্কর মারছে। মহিলাকে ম্যাপ খুলে বসে ট্রেস করতে হচ্ছে আমি কোথায়, হৃষিকেশে না কোনো হিমবাহতে। কিস্যু বুঝতে পারছে না। আমি বাজি ফেলতে পারি।”
পরিমল বলল, “কিন্তু একটা ব্যাপার যে হয়ে গেছে।”
“আবার ব্যাপার? কত ব্যাপার হবে তোমার?”
“কাল আমি একটা টেলিগ্রাম করেছি তপুকে। আজ সকালে নিশ্চয় পেয়েছে। আশা করছি বিকেলের ট্রেনে দিদিকে নিয়ে তপু এসে পড়বে।”
সারদা যেন চেয়ার ভেঙে মাটিতে পড়ে গেলেন এই রকম ভাব করলেন, অবাক, বিহ্বল, নির্বাক। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন ভায়রার মুখের দিকে। “তুমি টেলিগ্রাম করলে?”
“আপনার শালী বলল।”
সারদা রেবার দিকে তাকালে। খুবই পছন্দ করেন শালীটিকে। যত্ন করেন।
রেবা বলল, “সবটাই আমি বলিনি জামাইবাবু, আপনার ভায়রাও বলেছে।”
“কেন?” সারদা শালীর দিকেই তাকিয়ে থাকলেন।
রেবা বলল, “আপনি রাগ করবেন না জামাইবাবু, আমি অন্যায় কিছু করিনি। আজ ক’দিন আপনার শরীর মোটেই ভাল যাচ্ছে না।”
“কে বলল ভাল যাচ্ছে না। খাচ্ছি, দাচ্ছি বেড়াচ্ছি। তোমাদের সঙ্গে গল্প করছি। হাতের কাছে বই পেলে পড়ছি। এর চেয়ে আর কী ভাল যাবে।”
মাথা নাড়ল রেবা। বলল, “না জামাইবাবু, আপনি প্রথম প্রথম এসে দিন সাতেক বেশ ফুর্তিতে ছিলেন। খাওয়া দাওয়া করেছেন। রাত্রে ঘুমোতেন। কিন্তু আস্তে আস্তে আপনার খাওয়া দাওয়া কমেছে। মুখে অরুচি এসেছে। রাত্রে ঘুমোতে পারেন না ভাল। আমরা তো পাশের ঘরে থাকি—রাত্রে আপনি চার পাঁচবার করে ওঠেন। বাথরুমে যান। ঘরের মধ্যে খুটখাট করেন। সকালের দিকে আপনাকে দেখলে বোঝা যায়, যেটুকু ঘুমিয়েছেন, তাও শান্তিতে নয়।”
“এ সবই ছুতো,” সারদা বললেন, “আমি ঠিকই ছিলাম, ঠিকই আছি। তোমরা আমার সঙ্গে শত্রুতা করলে; সেরেফ বেইমানি। যদি এই তোমাদের মনে ছিল, তা হলে আমি যখন লিখেছিলাম—কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে চাই, জায়গা হবে?—তখন তো বাপু বলে দিলেই পারতে সোজা কথাটা।”
পরিমল ভীষণ অপরাধীর মতন মুখ করে বসে থাকল! রেবা বোঝাতে লাগল সারদাকে। বলল, “ছি জামাইবাবু, কি যে বলছেন আপনি! আমরা তো এখানে বদলি হয়ে মাত্র দু’তিন মাস এসেছি। আপনাকে ছাড়া বড় কাউকে খবর দেওয়াও হয়নি। আপনার ভায়রা তো জঙ্গলে সারভে আর নকশার কাগজপত্র নিয়ে দিন কাটায়। আপনি আসবেন শুনে পর্যন্ত আমরা নাচতাম।”
“নাচতে বইকি! আমায় ভুলিয়ে ভালিয়ে এনে আমায় নাচাবার জন্যে নাচতে—” সারদা বললেন। মুখ গম্ভীর। যেন নাচানো পার্টির ফাঁদে পড়ে এখন তাঁর অনুশোচনা হচ্ছে।
পরিমল অপ্রস্তুত। স্ত্রীর দিকে তাকাল একবার। তারপর দুহাত জোড় করে মিনতি ভঙ্গিতে বলল, “দাদা, আপনার সঙ্গে আমাদের কি সেই সম্পর্ক! আপনার শালী আপনাকে কত খাতির করে, ভালবাসে, সে তো আপনি জানেন।”
“জানি হে, জানি। শালীর ভালবাসাও জানি, শালীর দিদির ভালবাসার ঘটাও জানি। এক জাতের মুরগি।”
রেবার হাসি পাচ্ছিল। হাসল না। সারদার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “মুরগির জাত যেমনই হোক জামাইবাবু, আপনি যদি আমায় অবিশ্বাস করেন, আমি আর কথাটি বলব না।” বলে একটু থেমে অভিমানের গলায় রেবা আবার বলল, “আপনি আসবেন শুনে আমরা কী আনন্দ পেয়েছি! এসে পর্যন্ত, বলুন, আমাদের কত আনন্দেই দিন কেটেছে।”
সারদা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন রেবাকে। নিজেরই কেমন মনে হল। একটু কড়া কথা বলে ফেলেছেন। সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, “যা করেছ, বেশ করেছ! কিন্তু ওই বাঘের মুখে এই অধমকে ঠেলে দিলে। এটা কেমন হল জানো, ছাগলের গলায় দড়ি বেঁধে বাঘকে নেমন্তন্ন করা। এখন আমি করব কী?”
