এখানকার লোকে যোগিনীকে রাধামাঈ বলে। বয়েস তো বেশি নয় চল্লিশও হইবে না। কিন্তু দেবীর মতন চেহারা। রংটি তপঃপ্রভাবে উজ্জ্বল তামাটে, মাথার চুল পায়ে আসিয়া নামিয়াছে, নাক চোখ প্রতিমার মতন। গেরুয়া শাড়ি পরনে। গলায় রুদ্রাক্ষ মালা।
রাধামাঈ সর্বজ্ঞ। তিনি মানুষ দেখিলেই তাহার ভূত ভবিষ্যৎ জানিতে পারেন। আমি গতকাল সন্ধ্যার দিকে তাঁহাকে দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। সন্ধ্যার দিকেই যাইবার নির্দেশ ছিল।
রাধামাঈয়ের বাহির কক্ষে একটি শতরঞ্জি বিছানো ছিল। সামনে বাঘছালের আসন। সম্ভবত কর্পূর ও ধূপ পড়িতেছিল। সামান্য ধোঁয়ার সহিত ক্ষুদ্র কক্ষটিতে ধূপের গন্ধ ছড়াইয়া রহিয়াছে। আমি একা বসিয়াছিলাম। এমন সময় যোগিনী আসিলেন। আহা, কী রূপ। কী অসামান্য লাবণ্য। কক্ষটি যেন হঠাৎ গন্ধে ভরিয়া গেল। তিনি দাঁড়াইয়া রহিলেন। আমায় একদৃষ্টে দেখিতে ছিলেন। দেখিতে দেখিতে অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলিলেন।
শুনিলে অবাক হইবে, তিনি আসনে বসিলে আমি ভক্তিভরে করজোড়ে তাহাকে নমস্কার জানাইয়া পরে প্রণাম করিতে গেলেই তিনি আসন ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। একটি কুপির আলো জ্বলিতেছিল। আমি অবাক, অপ্রস্তুত। কখন যেন আমিও তাঁহার মুখোমুখি দাঁড়াইয়া পড়িলাম। তিনি নিষ্পলকে আমায় দেখিতে লাগিলেন। সেই দৃষ্টিতে কী ছিল আমি জানি না। আমার ভয় হইতে লাগিল, ঘন ঘন কম্পন লাগিল, কপালে গায়ে দরদর করিয়া ঘাম ছুটিল। তিনি নিশ্চল। আমার যেন সম্বিৎ লোপ পাইল। বঙ্কিমবাবুর সেই কপলাকুণ্ডলাকে যেন সাক্ষাৎ দেখিলাম।
শুনিলাম তিনি বলিতেছেন, ইয়ে কোন্ হ্যায়?
যোগিনী চলিয়া গেলেন। আমি বেহুঁশ হইয়া মাটিতে বসিয়া পড়িলাম।
ফিরিবার সময় রাধামাঈয়ের অনুচর আমায় বলিল, মাতাজি আমায় আগামী পূর্ণিমার দিন যাইতে বলিয়াছেন। তিনি আমার প্রণাম গ্রহণ করিতে পারেন না, মাতাজি ডাকটিও তাঁহাকে বিচলিত করিয়াছে। কেন যে তাহা অনুচরটি জানে না। এরকম ঘটনা কখনো ঘটে নাই।
পরদিন দুপুরে রাধামাঈয়ের অনুচরটি আবার আসিল। আসিয়া জানাইল, মাতাজি বলিয়াছেন—আমার এই জন্মের সংসার জীবনে এক মায়াবিনী দূর স্থানে বসিয়া আমায় নাকাল করিবার ফন্দি আঁটিতেছে। তাহার ঘরে আমার ছবি, খাট বিছানা, জামাকাপড় সবই পড়িয়া আছে। এই সংসারের সামগ্রীগুলি লইয়া সে তুকর্তাক করিতেছে। যে-যাবৎ সে সমস্ত কিছু বাহিরে ফেলিয়া না দেয়—আমার যথার্থ পরিচয় প্রকাশ হইবার উপায় নাই। তুমি যে এখনও পিছন হইতে এমন করিয়া আঁকসি দিয়া টানিতেছ তাহা আমি কল্পনা করিতে পারি না। অনেক জ্বালা সহিয়াছি, আর কেন জ্বালা দাও? তোমার পায়ে ধরি, আমায় মুক্তি দাও।
জানি না, আগামী পূর্ণিমায় আমার কোন অভিজ্ঞতা হইবে।”
উমাশশী চিঠিটা রেখে দিলেন। মনের মধ্যে হু হু করতে লাগল। কে সেই যোগিনী? কেন তার অমন রূপ? কর্তা বলেছেন দেবীর মতন রূপ। কর্তা যতই দেবী দেবী করুন উমাশশী মোটেই দেবীতে ভুলবেন না। যোগিনী কেন প্রণাম নিল না কর্তার। সে নাকি জাতিস্মর, পূর্বজন্মের কথা জানে। এখানেই উমাশশীর বড় খটকা। যে যোগিনী শয়ে শয়ে লোকের প্রণাম নেয়, সে কেন তার প্রণাম নেবে না। তবে কি কার্তার প্রণাম নেবার অধিকার তার নেই। কেন? কোন দরকারে আবার পূর্ণিমার দিন যেতে বলেছে কর্তাকে?
উমাশশীর ভয় হচ্ছিল। যোগিনীরা অনেক কিছু পারে। তাদের অসাধ্য কিছু নেই। বুড়ো কর্তাকে তারা ছাগল ভেড়াও করে দিতে পারে। নিকুচি করেছে তোর কপালকুণ্ডলার।
কি যে করবেন উমাশশী কিছু বুঝতে পারলেন না। উঠলেন। পান খেলেন। বাতিটা নিবিয়ে দিলেন। বাইরে বেশ চাঁদের আলো। কাছেই পূর্ণিমা। হায় হায়, পূর্ণিমার দিন তাঁর কী সর্বনাশ হবে কে জানে।
উমাশশী হঠাৎ গলায় আঁচল জড়িয়ে ঠাকুর দেবতার পায়ে মাথা কুটতে কুটতে মানত করলেন, হে ঠাকুর তুমি কর্তাকে যেতে দিও না। কিছু একটা করে দাও ওঁর, যাতে বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারে। হাত পা মচকে দাও, কোমরে ফিক ব্যথা ধরিয়ে দাও, না হয় কাবু করে দাও অর্শে। আমায় বাঁচাও।
নাটকে যেমন পট পরিবর্তন, সিনেমায় কলকাতা থেকে কার্শিয়াঙে গমন—সেই রকম এই কাহিনীর স্থান কাল পাত্রের কিছু পরিবর্তন ঘটল।
স্থানটি নিরিবিলি। কাছকাছি শালের পাতলা জঙ্গল। ছোট মতন এক বাংলো বাড়ি, সামনে দিয়ে কাঁচা রাস্তা চলে গেছে পশ্চিমে। দু’ চারটে ইউক্যালিপটাস গাছও চোখে পড়ে বাংলোর কাছে। সময়টি শেষ বিকেল। এই মাত্র সূর্য ডুবল।
বাংলোর ঢাকা বারান্দায় তিন চারটি বেতের চেয়ার পাতা। একটি গোল বেতের টেবিল। চা খাওয়া শেষ হয়েছে, টেবিলের ওপর চায়ের পট, শুন্য কাপ, দুধ চিনি পাত্র, বিস্কিটের প্লেট পড়ে আছে। এক মহিলা এবং দুই ভদ্রলোক বসে আছেন চেয়ারে। দুই ভদ্রলোকের একজন সারদা গুপ্ত—উমাশশীর স্বামী। অন্যজন সারদা গুপ্তের ভায়রাভাই। নিজের নয়, সামান্য দূর সম্পর্কের। নাম পরিমল। মহিলা অবশ্যই সারদা গুপ্তের শ্যালিকা। নাম রেবা। উমাশশীর এক মাসির মেয়ে, কাজেই মাসতুতো বোন।
সারদা গুপ্ত চায়ের পর সিগারেট খাচ্ছিলেন, হাতে-পাকানো সিগারেট। চেহারাটি মন্দ নয়। এই বয়সেও শক্ত সমর্থ, গায়ের রং পরিষ্কার। মুখটি হাসিখুশি। মাথার চুল প্রায় সাদা হয়ে গেছে। পরিমল বয়েসে বেশ কিছু ছোট, বছর আটচল্লিশ হতে পারে। ছিপছিপে গড়ন। সরল চেহারা। রেবার বয়েস চল্লিশ-টল্লিশ হবে, সুশ্রী মুখ, নরম ধাতের ছাঁদ। নাকটি মোটা চোখ দুটি ডাগর।
