উমাশশী ভেবেচিন্তে দেখলেন, বড় মেয়েকে আর একটা চিঠি লেখা দরকার। সরাসরি না হলেও মেয়েকে জানানো দরকার যে তাদের বাবার মাথায় হিমালয় টিমালয় বেড়াতে যাবার শখ চেপেছিল। কর্তা এখন বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। খবরটা জানিয়ে না রাখলে পরে কোন ফাঁক দিয়ে কী বেরিয়ে পড়বে বলা যায় না।
তা ছাড়া উমাশশীর আরও একটা ভয় হচ্ছিল। গুপ্তবাবুর জ্ঞানগম্যি নেই। এই বাড়িতে যেমন ছেলেমেয়েদের চিঠি লিখছেন, তেমনি হুট করে বড় মেয়েকেও তো চিঠি লিখতে পারেন। সেখানেও হয়ত জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি গৃহত্যাগ করেছেন। কিছু বলা যায় না। যদি তাই দিয়ে থাকেন তবে বড় মেয়ে এতদিনে সবই জানতে পেরেছে। জামাইও জেনেছে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই, গুপ্তবাবু গৃহত্যাগের কারণ হিসেবে যে-লোকটিকে যোলো আনা দায়ী করেছেন সে-মানুষ তো উমাশশী।
যাই হোক বড় মেয়ের কাছ থেকে আর কোনো চিঠি আসেনি। উমাশশীও বুঝতে পারছেন না, মেয়ে তার বাপের কীর্তির কতটুকু জেনেছে বা জানেনি।
বেশ গুছিয়ে গাছিয়ে, চাপাচাপি দিয়ে একটা চিঠি লিখলেন উমাশশী বড় মেয়েকে। চিঠি লিখে জবাবের আশায় বসে থাকলেন।
এমন সময় একটা চিঠি এল সরাসরি উমাশশীর নামে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। উমাশশী আশাও করেননি, তাঁর নামে কর্তার চিঠি আসবে! যে-মানুষ গৃহত্যাগের সময় স্পষ্ট করে জানিয়ে গেছে, ইহকাল আর পরকাল—কোনো কালেই যেন স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ না হয়, সেই মানুষ লিখবে চিঠি!
ছেলেই চিঠি এনে মা’র হাতে দিল।
উমাশশী চিঠিটা হাতে নিয়ে প্রথমটায় বুঝতে পারেননি। পরে বুঝলেন। খামের ওপর উমাশশীর নাম লেখা। এতকাল ছেলেমেয়েদের নাম থাকত, এই প্রথম উমাশশীর নাম।
চা খাচ্ছিলেন উমাশশী। চিঠিটা উলটে পালটে দেখলেন। খামের মুখ বন্ধ। একটু ভারী ভারী লাগল।
উমাশশীর মুখে এতদিন পরে এই প্রথম চাপা হাসি ফুটল। কর্তার তেজ তা হলে ফুরিয়েছে। দিন দশ পনেরোর মধ্যেই তেজ ফুরোবার কথা, সে-জায়গায় প্রায় মাস পুরতে চলল, একটু বেশি তেজ দেখালেন এই যা!…তা হয়েছেটা কী? অর্শ চাগালো, না চাল কলা খেতে খেতে মাথা ঘুরে পড়েছেন কোথাও? নাকি হাত-পা ভেঙে পড়ে আছেন কোনো ডেরাভাণ্ডায়।
উমাশশী উঠলেন। পান মুখে দিয়ে সোজা ঠাকুরঘরে। নারায়ণকে একবার প্রণাম সেরে, চিঠিটা ঠাকুরের পায়ে ছুঁইয়ে ফিরে এলেন নিজের ঘরে। যে-মানুষ ঘর সংসার, স্ত্রী-পুত্র ফেলে পালায় তার খানিকটা শিক্ষা হওয়া উচিত। ভগবান যেন শিক্ষাটা ওকে দেন। উমাশশীকে আজ কতদিন নাকের জলে চোখের জলে করেছেন গুপ্তবাবু, সারারাত একরকম জাগিয়ে রেখেছেন—তার শাস্তি তাঁর পাওয়া দরকার। অবশ্য উমাশশী চান না, তার শাস্তিটা খুব ভারী কিছু হোক, অসখু-বিসুখ করে পড়ে থাকেন বেজায়গায়। ভগবানের কাছে সে-প্রার্থনাও তিনি জানিয়েছেন।
নিজেই চশমা নিয়ে চোখে দিলেন উমাশশী। তারপর খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বার করলেন।
না, কোনো ঠিকানা নেই, নিজের পাত্তা দেননি।
উমাশশী চিঠিটা পড়তে লাগলেন। কর্তা হরিদ্বার হৃষিকেশের দিকে চলে গেছেন।
হরিদ্বার, লছমনঝোলা উমাশশীর দেখা। একবার ছেলেবেলায় গিয়েছিলেন মা বাবার সঙ্গে। দ্বিতীয়বার যান স্বামীর সঙ্গে। চাকরি থেকে রিটায়ারের আগে স্বামী সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। বড় ভাল লেগেছিল। কর্তা বলেছিলেন, মেয়েদের বিয়ে থা হয়ে গেলে ঝাড়া হাত-পা হয়ে দুই বুড়ো বুড়ি মিলে এখানে এসে ডেরা বাঁধব, কি বল উমা?
কর্তা সেই হরিদ্বারের দিকেই গেছেন। অবশ্য সেখানেই থাকেননি, চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে হৃষিকেশ ছাড়িয়ে কোনো চটি টটিতে গিয়ে থেমেছেন।
কিন্তু কর্তার চিঠির সুরটাই যে বেখাপ্পা। এ-সব তিনি কি লিখেছেন:
“তোমায় পত্ৰ দিবার প্রয়োজন আমার ছিল না। বাধ্য হইয়া দিতেছি। সাংসারিক নিয়মে এবং আইনসঙ্গত ভাবে আমি তোমার স্বামী। যে-যাবৎ জীবিত থাকিব, স্বামী বলিয়াই গণ্য হইব। কিন্তু ধর্মত বলিতেছি, আমার স্বামীত্বে সাধ নাই, গৃহ সংসারেও বিন্দুমাত্র রুচি নাই। আমি এই অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে যেন ক্রমে ক্রমে চিনিতেছি। একটি বিরাট কুয়াশার জাল ছিন্ন হইয়া আমার সেই জন্মজন্মান্তরের রূপটি দেখা দিতেছে। এই রূপ হইবার কথা নয়। ঈশ্বর আমায় কেন জানি এই মহারহস্যের সম্মুখে দাঁড় করাইয়া দিয়াছেন। ভগবানের মতি, আমি সামান্য মানুষ, কী বুঝিব। তবু বুঝিতে পারিতেছি—ওই যে যোগিনী, উহার সহিত কিসের এক নিগূঢ় সম্বন্ধে যেন আমি বাঁধা পড়িতে যাইতেছি। উনি কে, আমি কে? আর তুমি, যে-তুমি আমায় তিরিশ বৎসর অধিকার করিয়া রাখিয়াছিলে—তুমিই বা কে? আমার এইরূপ সন্দেহ জন্মিতেছে, তুমি ঠিকানা ভুল করিয়াছ। তোমার পিতামহাশয় ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না, হিন্দুধর্মের মর্মটুকু তাঁহার মগজে প্রবেশ করে নাই। তিনি যদি ঠিকুজি কোষ্ঠী, গণনা ইত্যাদি মান্য করিতেন তবে, তোমার বা আমার ঠিকানা ভুল করিয়া একই স্থানে হাজির হইবার কথা নয়। তোমার যে কী মারাত্মক ভুল হইয়াছে তাহা তুমি জান না। আমিও জানিতাম না। সম্প্রতি জানিলাম। যোগিনী আমায় জানাইয়া দিলেন।
“এই যে যোগিনীর কথা লিখিতেছি ইনি নিজে একটি দুটির বেশি কথা বলেন না। লোকমুখে শুনিলাম, যোগিনী বিরাট বংশের মেয়ে, উচ্চশিক্ষিতা, অল্প বয়সেই ইঁহার মতিগতি অন্যপ্রকার হইয়া যায়। মাঝে মাঝে মূর্ছা যাইতেন। মূর্ছা ভাঙিলে কিছুক্ষণ ভাসা ভাসা এমন সব কথা বলিতেন যাহার অর্থ কেহ বুঝিতে পারিত না। বৎসর কয় পরে ইনি বলিতে লাগিলেন যে, তাঁহার পূর্বজন্মের কথা মনে পড়িতেছে। কেহ বিশ্বাস করিত না। শেষে দুই চারিটি প্রমাণ দিবার পর বাড়ির লোকজন বিশ্বাস করিল উনি জাতিস্মর। …যুবতী বয়সেই তিনি গৃহত্যাগ করিলেন। শুনিলাম উনি মানস সরোবরের দিকে কোথাও গিয়া দুই তিন বৎসর ছিলেন। একেবারে একা। সেখানেই যোগসাধনা করিতেন। হালে পাহাড় হইতে নামিয়া আসিয়া এখানে একটি কাঠের ঘর নির্মাণ করিয়া আছেন। তাঁহার একজন অনুচর আছে। সে নদী হইতে জল আনে, ফলমূল চাল ডাল যাহা পায় জোগাড় করে, চুল্লি ধরায়। যোগিনী নিজে নিত্য আহার করেন না। কোনো কোনোদিন দু’ গণ্ডুষ জলই তাঁহার আহার।
