এখনও ছেলেমেয়েদের কোনো জ্ঞান হল না, হুঁশ হল না, হবে, ঠিকই হবে—যখন আর এ-জগতে বাপ-মা বলে মানুষ দুটো থাকবে না—তখন হবে। যত সব অকর্মা, হারামজাদার দল।
নিজের ঘরে ফিরে আসতে আসতে উমাশশীর মনে হল, তিনি একটা মস্ত ভুল করেছেন। এই তো মাস দুই তিন আগে আশার একটা সম্বন্ধ এসেছিল বিয়ের। সতু ঠাকুরপো কলকাতা থেকে চিঠি লিখেছিলেন। ছেলের অন্য গুণ সবই ছিল, দোষের মধ্যে সে চেহারায় বেঁটে, রংটা কালো, একটু বাউণ্ডুলে গোছের, উমাশশী এক কথায় না বলে দিলেন। বেঁটে, কালোকেষ্ট জামাই তিনি করবেন না। সারদা গুপ্ত নিমরাজি ছিলেন। উমাশশীর চোখে তখন নিজের কর্তার চেহারাটা লেগে আছে। ফরসা রং, লম্বা চওড়া চেহারা। যৌবনকালে ওই চেহারা যে কী ছিল, তা উমাশশীই জানেন। স্বামীর গা ধুয়ে জল খেলেও যেন তৃপ্তি লাগত। নিজের স্বামীর মতন যে জামাইও জুটবে, উমাশশী তেমন আশা করতেন না। তবু নিজে যেমন পেয়েছিলেন মেয়েকে তার অর্ধেক যদি না দেন তবে মেয়ে কি মনে করবে! বড় মেয়েকে তো ভালই দিয়েছেন। ছোট মেয়ের বেলায় অন্য নজর হলে চলবে কেন?
উমাশশীর এখন মনে হচ্ছিল, তিনি ভুল করেছেন। আশার বিয়ে দিয়ে দেওয়াই উচিত ছিল। যার বাবা এমন দায়িত্বহীন, নির্বোধ ; যে-মানুষ ছেলেমেয়েকে সৎ শিক্ষার বদলে অসৎ শিক্ষাই দেয়—তার বাড়িতে আইবুড়ো মেয়ে রাখা উচিত নয়। ওই মেয়ে রাখা উচিত নয়। ওই মেয়ে এখন গলার কাঁটা হয়ে আটকে থাকবে। বিয়েটা দিয়ে দিতে পারলে উমাশশী ঝাড়া হাত-পা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি কেমন করে বুঝবেন, মেয়ের বাপ, বুড়ো-মদ্দ, তার ভেতরে ভেতরে এত ফন্দি ছিল। ঘর ছেড়ে সে পালাবে।
কামিনী জল এনে দিল। পান!
উমাশশী জল খেলেন। পান জরদা মুখে দিলেন।
শীত পড়ছে ধীরে ধীরে। খোলা জানলা দিয়ে টকটকে রোদ দেখা যায়। কাক চড়ুই ডাকছে। লাল করবী ফুলের গাছটা মাথা তুলে দিব্যি রোদ পোয়াচ্ছে। পাশেই এক কাঠচাঁপা। কর্তা শীতের দিন কাঠচাঁপা গাছের তলায় চেয়ার পেতে বসে বই পড়তেন। গাছতলাটা ফাঁকা। বিছানায় বসলেন উমাশশী। চিঠিটা বালিশের তলায় চাপা দেওয়া।
দুপুরে চিঠিটা আরও একবার পড়বেন উমাশশী। এখন আর পড়ে কাজ নেই।
পুরুষ মানুষ এই রকমই হয়। এমন কিছু বয়েসে পাকা গিন্নি হয়ে স্বামীর সংসারে তিনি আসেননি। তবু যখন থেকে এসেছেন তখন থেকেই হাল ধরেছেন সংসারের; বলতে নেই—নিজের আঁচলের আড়ালে রেখে যেন কর্তাকে এতটা পথ বয়ে এনেছেন। কোনো কিছু বুঝতে দেননি। সেই কর্তা আজ তাঁকে বলেছেন, কাঠবাদামের শক্ত খোসা, বলেছেন তিনি নাকি পাতক হয়ে ছিলেন এতকাল! একেই বলে নেমকহারাম। তোমায় কোন খ-বাবু আরশি দেখাল, আর তুমি দেখলে—তোমার সাতপাকের বউ বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে পান চিবোচ্ছে! বলিহারি তোমার খ-বাবুকে! যেমন নাপিত সে, তেমনি তার আরশি। এসো একবার, নিজের চোখে দেখে যাও না গুপ্তবাবু, তোমার যে পরম শত্রু, যার পাল্লায় পড়ে তোমার সব গিয়েছে—সেই উমাদাসী কোন আরামে শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছে! খাঁড়া নিয়ে তোমায় তাড়া করতে কোনোদিনই যাইনি বাপু, তেমন শিক্ষা আমার মা-বাবা দেয়নি। তুমিই বরং আমার গা গতরের ছাল ছিঁড়ে ছিঁড়ে ডুগডুগি বানিয়ে বাজিয়েছ এতকাল!
উমাশশীর বুকে এতই কষ্ট হচ্ছিল যে তিনি গায়ের আঁচল নামিয়ে দিলেন, জামার বোতাম খুলে আলগা করে দিলেন সব, তারপর বুকের ওপর ডান হাতটা জোরে জোরে বোলাতে লাগলেন।
মনে পড়ল, গুপ্তবাবু বাড়ি ছেড়ে পালাবার আগের দিন সাত সকালে এই বুড়ি মাগির কাছে এসে নেচে নেচে খাটো গলায় কত গান ধরেছিলেন। আবার বলেন কিনা গীতগোবিন্দের গান, উমাশশী সারা জীবন ধরে কর্তার অনেক গোবিন্দগীত শুনেছেন, বেহায়াপনা তাঁর জানা আছে। কম বয়সে সবই মানায়, ভালও লাগে, কিন্তু এই বুড়ো বয়সে কোন বেহায়া বুড়ি বউয়ের কাপড়ছাড়া দেখতে দেখতে গান গাইতে পারে—‘ঘটয়তি সুঘনে কুচ-যুগ-গগনে…!’
উমাশশী বুকের ব্যথা সামলাতে সামলাতে আড় চোখে নিজের বুক দেখলেন। কর্তা নেই, সারা বুক টনটন করে উঠল। কে জানত, গুপ্তবাবু এমন করে বুকে শেল মারবেন। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে উমাশশী যেন গুপ্তবাবুকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, এক মাঘে শীত পালায় না কর্তা, তোমার জন্যেও শীত পড়ে থাকল।
উমাশশী এবার বড় মেয়েকে নিজেই একটা চিঠি লিখলেন। তাঁর সাংসারিক জ্ঞান প্রখর। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কখনও বাপের বাড়ির কেচ্ছা কেলেঙ্কারি জানাতে নেই। মেয়ের গলা কাটা যাবে লজ্জায়, হেনস্থার শেষ থাকবে না। যে যাই বলুক, মেয়েদের বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি হল তেল আর জলের মতন, কোনোদিন এই দুইয়ে মিশ খায় না।
বড় মেয়েকে চিঠি লেখার আগে উমাশশী অনেক ভেবেছিলেন। বড় মেয়ে খানিকটা মায়ের ধাতের; যদিও বাপ বলতে বরাবর অজ্ঞান ছিল—তবু অন্য দুজনের চেয়ে মায়ের দুঃখকষ্ট সে বুঝত খানিকটা। বিয়ের পর মেয়েরা আরও যেন মা-দরদি হয়। উমাশশী বড় মেয়েকে বিয়ের পর দেখেশুনে সেটা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন।
বড় মেয়েকে আগেও চিঠি লেখা হয়েছে। লিখেছে তার ভাইবোনেরা। উমাশশী নিজে সে-চিঠি দেখেছেন। তাঁরই কথা মতন লেখা। গুপ্তবাবুর গৃহত্যাগের কোনো সংবাদ হয়নি, শুধু লেখা হয়েছিল, তিনি ক’দিনের জন্যে বাইরে গিয়েছেন। কোথায় গিয়েছেন তার কোনো হদিশ দেওয়া হয়নি। মেয়ের জবাবও দেখেছেন উমাশশী। আর পাঁচটা খবরের সঙ্গে জানতে চেয়েছে, তার বাবা ফিরে এসেছে কিনা! এরপর আর কোনো চিঠি এ বাড়ি থেকে যায়নি।
