“আমায় যে কোন বৈরাগ্য দেবতা অলক্ষ্য হইতে হাতছানি দিতেছেন তাহা আমি জানি না, তপু। আমি শুধু আমার ঝোলাঝুলিটা কাঁধে লইয়া তাঁহার ডাকে চলিতেছি। আমায় দেখিলে তোমাদের অবাক হইবার কথা। গালে দাড়ি, হাতে লাঠি, পায়ে কেড্স জুতা, কাঁধে একটা বোঁচকা। আমার কোথাও বিরাম নেই, চলিতেছি আর চলিতেছি। কখনও রেলে, কখনও বাস গাড়িতে, কখনও পদব্রজে। আমার সহিত একদল তীর্থযাত্রীর পরিচয় ঘটিয়াছিল। এই দলটি কম নয়, জনা পনেরো হইবে। নারী পুরুষ উভয়েই আছে। তবে নারীর সংখ্যা কম দুই তিনজন মাত্র। পথে ইহাদের সঙ্গে দেখা ও পরিচয়। শুনিলাম তাঁহারা উত্তর হইতে নামিয়া আসিতেছেন, এখন দক্ষিণে যাইবেন। তাঁহাদের নিকট জানিলাম, সাধুসঙ্গের প্রকৃষ্ট স্থান হিমালয়, পথে পথে কত সাধুসজ্জন। তাঁহাদের নিকট বরফানিবাবা নামের এক মহাপুরুষের নাম শুনিলাম। ইনি বরফের মধ্যে সমাধিস্থ হইয়া বসিয়া থাকেন বলিয়া লোকে ইহাকে বরফানিবাবা বলে। তাঁহার যে কত বয়েস তাহাও জানা যায় না। একশো সোয়াশে বছরও হইতে পারে। যাহা হউক, আমি এখন উত্তরের পথে পাড়ি জমাইয়াছি, হরিদ্বার হইয়া হিমালয়ের দিকে যাত্রা করিব। হিমালয় আমায় টানিতেছে।
একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা তোমায় জানাই। রেলগাড়িতে এক ভদ্রলোকের সহিত ঘটনাচক্রে আমার আলাপ হইয়া যায়। তাঁহার পরিচয়, তিনি একসময় সিমলায় গভর্নমেন্টের হোমরা চোমরা অফিসার ছিলেন।
ভদ্রলোক জীবনে অনেক দুঃখশোক পাইয়া এখন সংসারধর্ম ত্যাগ করিয়াছেন, উচ্চশ্রেণীর তন্ত্রসাধনা করেন। তাঁহার কিছু ক্ষমতা জন্মিয়াছে। খগেনবাবু আমায় বলিলেন, আমার আত্মার ওপর একটা মোটা আবরণ ছিল, যেমন কাঠবাদামের ওপর শক্ত পুরু খোসা থাকে। এই খোসাটি আমার চৈতন্যকে এমনভাবে ঢাকিয়া রাখিয়াছিল যে আমার নাকি চৌরাশি জন্মের লক্ষণ ছিল। জীব হইয়া আমাকে নাকি চৌরাশি বার ভ্রমণ করিতে হইত। পরমেশ্বরের কৃপায় আমার সে দুভার্গ্য ঘুচিয়া গিয়াছে, আমি মুক্তি পাইয়াছি। এখন আমার চৈতন্য কাহারও কবজায় নাই, আমার কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত। খগেনবাবু বলিয়াছেন, অচিরেই আমি কোনো উন্নত সাধকের সাক্ষাৎ পাইব। কর্মবিপাকে আমি পাতক ছিলাম, এবার সাধক হইব।
খ-বাবু আমায় আরও একটি অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখাইলেন। তিনি একটি আরশি বাহির করিয়া দিলেন, ছোট আরশি, আঙুল চারেক তাহার মাপ। আরশির ওপর কালচে রঙের কিছু মাখানো। আমার কপালে তাঁহার বুড়া আঙুল কয়েক মুহূর্ত ছোঁয়াইয়া রাখিলেন, তাহার পর আঙুল সরাইয়া আরশিটি দেখিতে বলিলেন। প্রথমটায় কিছু দেখিতে পাইলাম না। পরে দেখিলাম, কী আশ্চর্য, আরশির মধ্যে তোমাদের মাতাঠাকুরাণী। সাইজটা ছোট। দেখিলাম, তোমাদের গর্ভধারিণী বিছানার ওপর শুইয়া আছেন, বালিশের পাশে পানের ডিবা, জরদার কৌটা। তিনি হঠাৎ উঠিলেন, এবং কোথা হইতে একটা খাঁড়া যোগাড় করিয়া আমার দিকে ছুটিয়া আসিলেন। ভয়ে আমি আরশি ফেলিয়া দিলাম। খ-বাবু বলিলেন, গৃহী হইবার বিন্দুমাত্র বাসনাও যদি অন্তরে থাকে, ত্যাগ করুন। গৃহে ফিরিলে আপনি অবশ্যই অনুশোচনা করিবেন।
বাবা তপু আমি মন্ত্র তন্ত্র বিশ্বাস করিতাম না। কিন্তু খ-বাবুর আরশিতে তোমার মা-জননীর যে মূর্তি দেখিলাম, তাহাতে আমার হৃদকম্প হইল। এ-মূর্তি ভুলিবার নয়। পূর্বেও কত দেখিয়াছি, তবে যথার্থ খড়গধারিণী রূপে দেখি নাই, এই প্রথম, দেখিলাম। দেখিয়া বন্ধুবাবুর সেই গীতটি মনে পড়িল :‘নাচিছে তুরঙ্গ মোর রণ করে কামনা…’
তোমার মাতাঠাকুরাণীকে বলিবে, তাঁহার তুরঙ্গ যতই নাচুক না কেন তিনি আর ইহজীবনে রণসাধ মিটাইতে পারিবেন না। আমি তাঁহার খড়গ ও আস্ফালন হইতে বহুদূরে। তিনি আমার কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিবেন না। বরং ধর্মমতে ও শাস্ত্রমতে আমি যখন জীবিত—তখন বৃথা তুরঙ্গ না নাচাইয়া মহাশয়া যেন শয়নে-ভোজনে-তাম্বুলে চর্বণে তৃপ্ত থাকেন। তাঁহার ক্রোধ ও ক্লেশের কোনো কারণ নাই। আপদ বিদায় লইয়াছে, ইহাতে তো তাঁহার শান্তি পাইবার কথা।
আমি পরে তোমায় পত্র লিখিব। এইস্থানে ইতি করিতেছি। তোমরা আমার আশীর্বাদ জানিও।”
উমাশশী চিঠিটা বার দুই পড়লেন। পায়ের নখ থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত গনগনে আঁচের মতন জ্বলছে। ঘাড় টনটন করছিল। কপাল ফেটে যাচ্ছে।
চোখের পাতা বন্ধ করে যেন নিজেকে খানিকটা সামলবার চেষ্টা করলেন।
সামলানো কি যায়! এই অসভ্যতা, ছোটলোকমির কোন জবাব উমাশশী দেবেন? পরিব্রাজকের এই কি লক্ষণ? যে-লোকের নাকি চৌরাশি জন্মের আর ভয় নেই, যার চৈতন্য জেগেছে—সেই লোক এমন সব নোংরা অসভ্য বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা লেখে? তাও আবার ছেলেকে!
উমাশশী আরও খানিকটা বসে থেকে উঠলেন। চোখে মুখে মাথায় জল ছিটিয়ে আসলেন। পা টলছিল উমাশশীর। গা দুলছিল। কলঘরে গিয়ে চোখে মুখে ঘাড়ে ভাল করে জল দিলেন। আঁজলা করে জল নিয়ে মাথায় থাবড়ালেন। জ্বালা কি যায়? না এই আগুন ভাবটা?
কলঘর থেকে বেরিয়ে কামিনীকে ডাকলেন। জল, পান দিতে বললেন।
ছেলেমেয়েদের গলা পাওয়া যাচ্ছে। হা হা হি হি করছে দুজনেই। রেডিয়ো বাজছে। কোনো শোক তাপ দুশ্চিন্তা উদ্বেগ নেই। ওদের বাপ এই দুই ছেলে মেয়েকে আস্কারা আর আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছিল। যেন ইয়ার বন্ধু। যারা তার বাপকে চিরটা কাল ইয়ার-বন্ধুর মতন পেয়েছে—তারা আর কতটুকু বুঝবে বাবা কী জিনিস।
