উমাশশী বললেন, “পিয়ন এসেছিল?”
আশা মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ইতস্তত করল। বলল, “না। দাদা একটু বেরিয়েছিল, পোস্ট অফিস থেকেই চিঠি নিয়েছে।”
“কোথায় দাদা?”
“ঘরে।”
উমাশশী খামটা উলটে পালটে দেখছিলেন। যথারীতি খামের মুখ ছেঁড়া। চশমা দিতে বললেন মেয়েকে।
আশা চশমা এনে দিল।
চশমা চোখে দিয়ে উমাশশী খামের ঠিকানাটা যেন একটু বেশি নজর করেই দেখলেন ; তারপর ডাকঘরের ছাপ। ব্যাপারটা তাঁর কাছে খুবই আশ্চর্যের মনে হয়। একটা দুটো নয়, আজ কুড়ি বাইশ দিনে চার পাঁচটা চিঠি এসেছে কর্তার, সব কটাই খামে, কিন্তু সবকটা চিঠিরই ডাক টিকিটের ওপর মারা ডাকঘরের ছাপ এত অস্পষ্ট কেন? কেন একটারও ছাপ পড়া যায় না? ছাপটা পড়া গেলে বোঝা যেত কর্তা কোথায় আছেন।
উমাশশী হঠাৎ ছেলেকে তলব করলেন। আশা দাদাকে ডাকতে গেল। উমাশশী চিঠিটা বার করলেন। সেই একই ব্যাপার, নিজের কোনো পাত্তা দেননি কর্তা, নি-ঠিকানা চিঠি লিখেছেন ছেলেকে। তপু এল। আশাও পিছু পিছু এসেছে। উমাশশী ছেলের দিকে তাকালেন। চোখে বিরক্তি। “তুমি পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠি নিয়েছ?”
তপু মাথা দোলাল। “চুল কাটতে গিয়েছিলাম সেলুনে। পোস্ট অফিস থেকে নিয়ে নিলুম চিঠিটা।”
“পোস্টমাস্টারকে জিজ্ঞেস করলে না কেন?”
তপু মা’র চোখে চোখে তাকাল না। বলল, “কী?”
“এই যে তোমার বাবার চিঠিগুলো আসছে—এগুলো আসছে কোথা থেকে?”
তপু যেন থতমত খেয়ে গেল। বলল, “কেন? বাবা যেখান থেকে লিখেছে।”
“সেই জায়গাটা কোথায়?” উমাশশী ছেলেকে ধমকে উঠলেন। “একটা চিঠিরও টিকিটের ওপর ছাপ পড়া যায় না কেন?”
তপু রীতিমত ঘাবড়ে গেল। আশার দিকে তাকাল একবার। তারপর ঢোঁক গিলে বলল, “কি জানি। পোস্টমাস্টারবাবুকে জিজ্ঞেস করলে তিনি কেমন করে বলবেন। ছাপ তো পড়াই যায় না। আমার মনে হয় বাবা আর. এম, এস-এ চিঠি ফেলে।”
উমাশশী বললেন, “কেমন করে বুঝলে?
তপু বলল, “আমি দু’একটা খামে ‘আর আর’ দেখেছি। না রে আশা?”
আশা ঘাড় হেলিয়ে বলল, “আগের চিঠিটাতেই ছিল।”
উমাশশীর পছন্দ হল না। বললেন, “কাল পোস্ট অফিসে গিয়ে মাস্টারমশাইকে জিজ্ঞেস করবে। তিনি তো তোমাদের বাবার ইয়ার-বন্ধু ছিলেন। জিজ্ঞেস করবে, এ-রকম বে-আইনি চিঠি কেন আসে?”
আশা বলল, “বে-আইনি বলা যাবে না, মা।”
“কেন?”
“ছাপ তো থাকে।”
“তুমি আমায় আইন শেখাবে! আমার বাবার কাছে আমি অনেক আইন গুলে খেয়েছি।”
আশা চুপ করে গেল।
তপু কি যেন ভেবে নিয়ে বলল, “পোস্টমাস্টারবাবুকে বলব মা, যে বাবা রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন?”
উমাশশী আরও বিরক্ত হলে, অসহ্য লাগল তাঁর। বললেন, “তা আর বলবে না? বদ্যির ঘরে কি দামড়াই জন্মেছে! ঘরের কথা পাড়ার লোককে না বলে বেড়ালে তোমার বাবার মান আর বাঁচছে না।”
তপু অধোবদন হল।
উমাশশী বললেন, “তোমাদের বাবার এমনিতে তো আর গুণের ঘাটতি ছিল না, এখন এই বুড়ো বয়েসে ভীমরতি ধরেছে, চুরি চামারি করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে—এটা আবার শহরময় ঢ্যাঁঢড়া পিটিয়ে বলে বেড়াও—তাতে তোমাদের বাবার আরও চারটে পা গজাবে। মুখ্যু, দামড়া কোথাকার।”
আশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
তপুও পালাবার চেষ্টা করছিল, উমাশশী বললেন, “আমি পই পই করে না বলেছি, তোমাদের বাবা নিমাইসন্ন্যাস হয়েছে একথা কাউকে বলার দরকার নেই। শুনলে লোকে হাসাহাসি করবে, ছি ছি করবে। তোমাদের বাবা ক’দিনের জন্যে বাইরে গেছেন দরকারে—এর বেশি কিছু বলার দরকার তো করে না।”
তপু ঢোঁক গিলে বলল, “তাই তো বলি—কেউ জিজ্ঞেস করলে।”
“তাই বলো। যাও।”
তপু মা’র চোখের সামনে থেকে সরে পড়তে পারলেই যেন বাঁচে। সরে সরে ঘর ছেড়ে পালাল।
ছেলেমেয়েরা চলে যাবার পর উমাশশী কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকলেন। রাগ, ক্ষোভ, অশান্তিতে তাঁর মুখচোখ অপ্রসন্ন দেখাচ্ছিল। এই রকম ছেলেমেয়ে তিনি আর দেখেননি।
একটা বুড়ো মানুষ, ঘরের কর্তা, তোদের বাবা—বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, দেখতে দেখতে প্রায় মাস পুরতে চলল, অথচ তোদের কোনো গা নেই। একটা দিনের জন্যেও দেখলাম না, তোরা তোদের বাপের জন্যে ছটফট করিস, মুখ শুকনো করে বসে থাকিস! চারবেলা খাচ্ছিস দাচ্ছিস, সাজন-গোজন করছিস, রেডিয়ো বাজিয়ে গান শুনছিস আর বাইরে বাইরে আড্ডা ইয়ার্কি মেরে বেড়াচ্ছিস! তোদের দেখলে মনে হয়, গলা কেটে কেটে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আসি। বাপ বাড়ি নেই, সে-মানুষটা কোথায় কোন চুলোয় ছাতু ছোলা খেয়ে মাটিতে শুয়ে মরছে, আর তোরা দুজনে কেমন যে যার ঘরে চাদর মুড়ি দিয়ে নাক ডাকাচ্ছিস!
একেই বলে ছেলে মেয়ে! স্বার্থপরের দল! মা-বাপকে শুধু শুষতেই পারিস তোরা, তোদের মায়া মমতা ভালবাসা ভক্তি কিছু নেই। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এই রীতি নীতি। উমাশশীদের সময় অন্যরকম ছিল। উমাশশী নিজেই বাবা বলতে অজ্ঞান ছিলেন। অবশ্য বাবাও ছিল সেইরকম। তোদের বাবার মতন চোর জোচ্চোর বাটপাড় বাবা নয়।
আসলে যেমন বাপ তার তেমনই ছেলেমেয়ে, উমাশশীর দুর্ভাগ্য, তিনি আর মাথা খুঁড়ে কেঁদেকেটে কী করবেন! ভগবান যার কপালে যা লিখেছেন তাই তো হবে।
বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে ভারী বুকে উমাশশী এবার চিঠিটার ওর চোখ রাখলেন। ছেলেকেই লেখা হয়েছে।
কর্তা আর নর্মদার তীরে নেই। আগের আশ্রমটিও ত্যাগ করেছেন। লিখেছেন, এখন তিনি পরিব্রাজক। কোথাও আর স্থিত হচ্ছেন না। শুধু এগিয়ে চলেছেন।
