তোমার মাকে বলিবে তিনি যেন আমার বিছানাটি গুটাইয়া ছাদে তুলিয়া দেন। আমার খাটটি ঘর হইতে বাহির করিয়া কলাবাগানে ফেলিয়া আগুনে দিবার ব্যবস্থা করেন। আমার যাহা কিছু আছে দানধ্যান করেন। সংসারের বাইরে যে শান্তি পাইয়াছি তাহা ছাড়িয়া কোন মূখে আর গৃহে ফেরে।”
উমাশশী চিঠি শেষ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকলেন। মাথার মধ্যে টনটন করছে, ঘাড়ের কাছটায় ব্যথা। সর্বাঙ্গ জ্বালা করছে রাগে। এ কেমন শত্রুতা? দূর থেকে আড়াল থেকে আমার শত্রুতা করছ? সাধ্য থাকে, সাহস থাকে সামনে এসে দাঁড়াও। কে বৃশ্চিক আর কে কুম্ভ তোমায় দেখাচ্ছি। এমন অসভ্যতা মানুষে করে। ইতরোমির শেষ নেই। নিজের ছেলেমেয়েদের তুমি তাদের মা’র পেছনে লাগাচ্ছ? ছি ছি, ঘেন্নায় মরি।
অভিমানে উমাশশীর চোখে জল এল। দু’ফোঁটা কেঁদে চোখ মুছে নিলেন।
স্বামীর জন্যে চোখের জল উমাশশী অনেক ফেলেছেন। তখন বয়েস ছিল ফেলার, জলও ছিল পর্যাপ্ত। এ-বয়েসে আর কতই বা কান্নাকাটি করতে পারেন, সেই যে কর্তা ঢং করে গাইতেন ‘নয়নের বারি রেখেছ নয়নে’—সেই বারিও এখন শরীরের আর পাঁচটা পদার্থর মতন কমে এসেছে। কমে এসেছে, না অন্তঃস্রোতা হয়েছে তা অবশ্য উমাশশী বুঝতে পারেন না। তখন হাউমাউ করে কাঁদলেও বলার কেউ ছিল না ; ছেলেমেয়েরা ছোট ছোট—তারা অতশত বুঝতে পারত না, উমাশশী অন্য কোনো কথা বলে কিংবা ছুতো দেখিয়ে প্রাণভরে কেঁদে নিতে পারতেন। এখন কি আর পারেন! ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারবে, মা, বাবার জন্যে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। দেখে আড়ালে হাসাহাসি করবে।
কান্নাটা তাই উমাশশীর বুকে বুকে রইল। নিজের ঘরে বসে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলেন, টপ টপ করে জল পড়ে চোখ বেয়ে, আঁচলে মুছে নেন। বুকের তলায় কষ্ট হয়, দুপুরে শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবেন—কোথা দিয়ে কেমন করে কর্তাকে ধরবেন, বুঝতেও পারেন না। বেনারস, এলাহাবাদ, হিল্লি-দিল্লি কোথায় গিয়ে রয়েছেন জানতে পারলেও একটা কথা ছিল—উমাশশী না হয় ছুটতেন, কিন্তু গুপ্তবাবু যে কোথায় তা জানার কোনো পথ রাখেননি।
উমাশশী একেবারে হাল ছেড়ে দেবার মানুষ নন। যদি তাই হতেন তবে কোন কালেই গুপ্তবাবুকে ছেড়ে দিতেন, আর গুপ্তবাবুও খাঁচা থেকে ছাড়া পেয়ে মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। উমাশশী অত বোকা বা কাঁচা নন, নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে গুপ্তবাবুকে স্বাধীন মুক্তপুরুষ হতে দেননি। পুরুষ মানুষ কেমন জিনিস তা তিনি জানেন, হাতের ফাঁক দিয়ে একবার গলে পড়ল তো পড়লই, কোন জলে গিয়ে ডুববে, তা কেউ জানে না। কার সাধ্য আর তাকে খুঁজে বার করে!
উমাশশী স্বামীকে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলতে দেননি, খুব সাবধানে মুঠোর মধ্যে ধরে রেখেছিলেন। মুঠো একটু আধটু আলগা হলেই বুঝেছেন গুপ্তবাবু গলবার চেষ্টা করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মুঠো আরও শক্ত হয়েছে। গুপ্তবাবু বুঝে নিয়েছেন, তিনি যদি যান ডালে ডালে উমাশশী ঘোরেন পাতায় পাতায়।
মানুষটাকে বরাবর এইভাবে বেঁধে রেখেছিলেন উমাশশী। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন—তোয়াক্কাও করেননি ; পালাবার পথ ছিল না কর্তার, খোঁয়াড়ের জীব ঠিকই ধরা পড়ে যাবে, উমাশশী জানতেন। আজ বাবা নেই, উমাশশী অসহায়, আর ঠিক এই সময়ে যখন উমাশশীর মনে কিছুমাত্র খল ছিল না, দুশ্চিন্তা ছিল না, তখন কর্তা তাঁকে ফাঁকি দিয়ে পালালেন। উমাশশী ভাবতেই পারেন না। এই বয়সে কেউ পালায়! যখন বয়েস ছিল পালাবার তখন যদি পালাতে পারতে, তোমায় আমি ত্যাজ্য করতুম। তখন তো মুরোদ ছিল না। এখন আমায় অক্ষম দেখে খুব সাহস দেখালে!
কুড়ি বাইশটা দিন তো কাটল। উমাশশী তো পাথর নন, মানুষ। তাঁরও গায়ে রক্তমাংস আছে। তুমি যতই তাকে রাক্ষসগণ বল, বল না কেন বৃশ্চিকের জাত, তার স্বভাব চরিত্র নিয়ে খোঁচা মার, তবু সে কেমন করে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারে! হাজার হোক, মানুষটি জোয়ানমদ্দ নয়, বয়েস হয়েছে, বুড়ো—; তার এখন নিয়মে থাকার কথা, একটা সহ্য হয় অন্যটা হয় না, আরাম-আয়াস ধরাবাঁধা দরকার ; সেই মানুষ লাল আটার রুটি, অড়হর ডাল, ঢেঁড়সের তরকারি আর ছাগলের দুধ খাচ্ছে, মাটিতে কম্বল পেতে শুয়ে আছে, ভাবলেই উমাশশীর বুকের মধ্যে কেমন যেন করে। তার ওপর লিখেছে, সর্দিকাশি হয়েছিল—মিছরির কৎ আর আদা খেয়ে আরাম হয়েছে।
উমাশশী বুঝতে পারছেন, একটা সর্বনাশ না করে গুপ্তবাবু ছাড়বেন না। অত জেদ, অত তেজ, স্ত্রীর ওপর পুষে রাখা তিরিশ বছরের গায়ের জ্বালা মেটাতে গিয়ে কর্তা কোথায় কোন ধর্মশালায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়বেন—তখন উমাশশীর ডাক পড়বে। ভবিষ্যতটা উঁকি মারলেই বুক কেঁপে ওঠে উমাশশীর। অর্শের রোগী, ওদিকে আবার শ্লেষ্মার ধাত, সামান্য গোলমাল হলেই বুকে কফ জমে, অল্পস্বল্প ডায়েবেটিস—, ঠাকুরের কত অঙ্গে কত খুঁত,—সেই মানুষ গিয়েছেন সংসার ত্যাগ করতে। আসলে সবই উমাশশীকে ভোগাবার জন্যে। কিন্তু এ-কথা কে কর্তাকে বোঝাবে—অত তেজ ভাল নয়, এটা আহম্মুকি। নিজে যখন চোখ উলটে পড়বে—তখন তোমার ভোগান্তিও কম হবে না।
কুড়ি বাইশ দিনের মাথায় আবার চিঠি এল। ছেলেমেয়েরা চিঠি লুকোয় না। মেয়েই চিঠিটা এনে দিল। উমাশশী তখন রান্নাঘর ঘুরে সবে নিজের ঘরে এসেছেন, একটু জিরিয়ে নেবেন, আশা এসে চিঠিটা দিল।
