চিঠিতে কর্তা লিখেছেন : “তোমার মাতাঠাকুরানীর গণ আমি জানি না। রাক্ষসগণ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। আমি নরগণ। নর-রাক্ষসের লড়াইয়ে নরের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। তোমার মার জয় হইয়াছে ; আমি পরাস্ত হইয়া দলিত মথিত অবস্থায় পড়িয়া আছি। আমার আর জেল্লা কি করিয়া থাকিবে? তোমার মা আমায় সিসা করিয়া ছাড়িয়াছেন। বড়ই দুঃখ হয়, বুক ফাটিয়া যায়। আমার কী ছিল আর কী হইলাম। সোনা তামা হইয়া গেল। নদীটি মজিয়া নালা হইয়া গেলে এই প্রকারই হয়। তোমার প্রতি আমার উপদেশ, পুলিশের মেয়ে তো বটেই, এমন কি যে-মেয়ের চলনে-বলনে, আচারে-আচরণে বিন্দুমাত্র মদ্দানি ভাব দেখিবে, বুঝিবে সে তোমায় গলা ও বাহুর জোরে দাবাইয়া রাখিবে—কদাচ তাহাকে বিবাহ করিবে না। করিলেই মরিবে। তোমার ব্যক্তিত্ব সেই চণ্ডীস্বরূপা কন্যা অতি সহজেই আমের মতন চুষিয়া খাইবে।
আমি রীতিমত সুস্থ। এই স্থানের লাল আটার রুটি ও অড়হর ডাল যে কী অপূর্ব স্বাদের তাহা তুমি বুঝিবে না। ভিণ্ডির ঘেঁটটিও চমৎকার। কিঞ্চিৎ ছাগ দুগ্ধ পান করিয়াছি। উহা বড়ই উৎকট। মহাত্মাজি যা পারেন—সাধারণে তাহা কেমন করিয়া পারিবে। যাহা হউক, আমার জন্য চিন্তা করিও না। আমি শান্তিতে আছি। আমার বন্ধনদশা কাটিয়াছে ইহাই জগদীশ্বরের কৃপা। এখানে শীত পড়িয়াছে। ওখানে কি শীত পড়িল। শীত সমাগমে তোমার মা-জননী বাতব্যাধিতে কাবু হন। মাঝে-মাঝে আমি ভাবি, মনুষ্যরূপে না জন্মিয়া যদি বাতব্যাধিরূপে এ-সংসারে আসিতে পারিতাম আমার কিছু লাভ হইত। আমার কপাল মন্দ।”
উমাশশী চিঠিটা যথারীতি ভাঁজ করে খামে রেখে দিলেন। রাগে করকর করছিল চোখ, মাথাটাও দপদপ করছে। কিন্তু কার ওপর রাগ দেখাবেন? থাকত মানুষটা চোখের সামনে তো ঝাঁপ দিয়ে বুকের ওপর পড়তেন। নাগালের বাইরে গিয়ে আজ বলছেন আমি নাকি রাক্ষস, আর উনি নর। আমার হাতে পড়ে রুপোর তাল সিসে হয়ে গেছে? আজ এসব কথা তো লিখবেই। নেমকহারাম, অকৃতজ্ঞ। উমাশশীর হাতে পড়েছিল বলে বর্তে গিয়েছ। কিছুই তো ছিল না তোমার। এই ঘরবাড়ি, দুটো পয়সা গচ্ছিত রাখা, বড় মেয়ের বিয়ে সবই আমার জন্যে হয়েছে, তোমার কেরামতিতে নয়। ব্যারিস্টার বর ছেড়ে তোমার মতন হেজিপেজিকে বিয়ে করেছিলাম—আর আজ তুমি বলছ আমি রাক্ষুসি।
কাঁদতে ইচ্ছে করছিল উমাশশীর। কিন্তু কী হবে কেঁদে? কার জন্যে কাঁদবেন? ওই চোর, বাটপাড়, ভাগলু মানুষটার জন্যে?
তৃতীয় চিঠিটা বার করে নিলেন উমাশশী। এটা আবার আদিখ্যেতা করে মেয়েকে লেখা। পড়া চিঠি। আবার পড়লেন।
খুবই অবাক কাণ্ড, মানষুটা কোথাও দুদিন স্থায়ী হচ্ছে না।
আজ এখানে, কাল ওখানে। কোন পথ থেকে কোথায় চলেছে? হিমালয়ের দিকে নাকি? আগের বার যেখানে ছিল তার সামনে ঝরনা, বন, পাখি, শিবমন্দির কত কী! এবারে মেয়ের কাছে বর্ণনা করে লিখেছে, এক শেঠের বাড়ির দোতলার ঘরে রয়েছে। সামনে নর্মদা নদী। শয়ে শয়ে লোক সকাল থেকে স্নান পুজো-আর্চা করছে, সাধু সন্ন্যাসীদের আসা-যাওয়া, নর্মদা নদী তরতর করে বয়ে চলেছে, ঘাটের পাড়ে গাছের ছায়ায় সারাদিন ধুনি জ্বলে সাধুদের।।
কর্তা মেয়েকে লিখেছেন, “তীর্থে তীর্থে কত কী ছড়াইয়া রহিয়াছে। সংসারে থাকিলে জীব অন্ধ হয়, কিছুই দেখিতে পায় না। আমি যাহা দেখিতেছি তাহাতেই চমৎকৃত হইতেছি। এখানে এক বাঙালি সন্ন্যাসীর সহিত সাক্ষাৎ হইল। আঠারো বৎসর বয়সে সংসার ত্যাগ করিয়া হিমালয়ের দিকে চলিয়া গিয়াছিলেন। বারো বৎসর গুহায় সাধনা করিয়াছেন। এখন আবার এই অঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়ান। বয়স পঞ্চাশ হইবে। কী তেজপূর্ণ চেহারা। মহা পণ্ডিত ব্যক্তি, মস্ত সাধক। কিন্তু বড় বিনয়ী, নম্র, প্রাণখোলা।
স্বামীজি আমায় একটি দুটি উপদেশ দিয়াছেন। তোমার মঙ্গলের জন্যে লিখিতেছি। স্বামীজি বলেন, মানুষের কয়েক প্রকার স্বভাব আছে, সে কখনও কখনও বৃষ জাতীয় আচরণ করে, কখনও বৃশ্চিক জাতীয়। আবার কাহারও আকার প্রকার, আচার বিচার কুম্ভ জাতীয়। বৃষ জাতীয় মানুষ সংসারে খায় দায় ঘুমায়, কখনও কখনও সামনে পড়িলে গুঁতা মারে। বৃশ্চিক জাতীয় মানুষ ভীষণ, তাহারা শুধু কামড় দেয় না, বিষের জ্বালায় জ্বালায়। আর কুম্ভ জাতীয়রা গোবেচারি। তাহারা সহজেই ফাটিয়া যায়।
তুমি আমার কনিষ্ঠা কন্যা। তোমার স্বভাব যদি তোমার গর্ভধারিণীর মতন হয় তবেই মরিবে। তোমার মা যে বৃশ্চিক জাতীয় মানুষ তাহাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। তাঁহার কামড় যত, বিষও তত। আমি তো তাঁহাকে সজারুও বলিতে পারি। কাছে গেলে তাঁহার গা ফোলে, কাঁটা দিয়া বিদ্ধ করেন। তুমি কখনও মার স্বভাব গ্রহণ করিও না। আমাদের দেশের মেয়েদের নম্র, বিনীত, মিষ্টভাষী হইতে হয়। ইহাতেই তাহারা সকলকে সুখী করে নিজেও সুখী হয়। তুমি অন্য সংসারে গিয়া অন্যদের সুখী করো, নিজে সুখী হও—ঈশ্বরের কাছে ইহাই আমার প্রার্থনা। তুমি যে কেমন তাহা আমি জানি, তবু ভয় হয় তোমার মাতাঠাকুরাণী না তোমায় দলে টানিয়া লন। বৃশ্চিকম্ বিভেতি। সংস্কৃত ব্যাকরণ বিদ্যা আমার নাই। শুদ্ধ করিয়া নিবে। মোদ্দা কথাটি এই, বৃশ্চিক হইতে সাবধান।
আমার অল্পস্বল্প কাশি হইয়াছিল। এই অঞ্চলে শীত আসিয়াছে। ঠাণ্ডা লাগিয়াছিল বোধ হয়। মিছরির কৎ করিয়া আদা গোলমরিচ সহযোগে খাইয়াছি। কাশি আরাম হইয়াছে। মনে আমার স্ফূর্তি, প্রাণে মুক্তি। বেশ আছি। মোটা মোটা চাপাটি, বেগুনপোড়া, ছোলার ডাল, দহি দিন দুই খাইলাম। ভালই লাগিল। আধ লোটা দুধও জুটিয়াছিল গতকাল। ঘুমটুম ভালই হইতেছে।
