শরীরটা দুপুর থেকেই ভাল ছিল না। পূর্ণিমা সামনে। কোমরে, হাঁটুতে, আঙুলের গাঁটে বাতের টনটনানি। বিকেলের দিকে উমাশশী বাইরের বারান্দায় বসেছিলেন খানিক। তাড়াতাড়ি বেলা পড়ে যাচ্ছে আজকাল। সন্ধের মুখে বিকেলের কাপড় চোপড় ছেড়ে সোজা ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
শুয়ে থাকতে থাকতে মনটা বড় মুষড়ে পড়ল। জোড়া খাটের একটা আজ কতদিন ধরে ফাঁকা, বড় বড় বালিশগুলো টানটান হয়ে পড়ে থাকে, মাথার দাগ পড়ে না কোথাও। বিছানার চাদর-টাদরও একবিন্দু কোঁচকায় না। ঘরের কোণে আলনায় কর্তার একটা ময়লা পাজামার পা দু’টো ঝুলছে। যেন আড়ালে বসে ভূতের মতন গা দোলাচ্ছেন কর্তা। কর্তা ঘরে থাকলে তামাকের গন্ধ থাকে—কাগজ পাকিয়ে সিগারেট খান—সেই গন্ধও আর নেই। পায়ের চটি দুটো বরাবরই খাটের তলায় পড়ে থাকত ; তাও নেই।
বেশ ফাঁকাই লাগে আজকাল উমাশশীর ঘরটা। মেয়ে এসে শুতে চেয়েছিল রাত্তিরে ; উমাশশী না করে দিয়েছেন। তার বিছানায় কেউ কোনোদিন শোয়নি, কাউকে শুতে দেননি উমাশশী, ছেলেমেয়েরা যখন কচি ছিল তখনও নিজের বিছানায় রেখেছেন, তারপর আজ কতকাল তো দুই বুড়োবুড়ি এইভাবে শুয়ে এলেন। থাক, পড়ে থাক ফাকা বিছানা, উমাশশী নিজের ঘরে একাই শুতে পারবেন।
মনটা ভাল ছিল না। পাঁচ রকম ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তাঁর কী খেয়াল হল, কানাইকে ডাকলেন। কানাই এলে বললেন, “দিদিকে একবার ডেকে দে। কামিনীকে বল, আমায় একটু চা দিয়ে যাবে, আর পান।”
কানাই চলে গেল ; একটু পরেই আশা এসে দাঁড়াল।
উমাশশী বললেন, “তোমার বাবার চিঠিগুলো রেখেছ, না ফেলে দিয়েছ?”
“আছে।”
“চিঠিগুলো আমায় এনে দাও। সমস্ত চিঠি। খামগুলো আছে না গেছে?”
“রয়েছে।”
“ওগুলোও আনবে। …দাদা কোথায়?”
“এই তো বাড়ি ফিরল।”
“জানলার দিকের বাতিটা নিবিয়ে মাথার দিকেরটা জ্বেলে দাও। আমার চশমাটাও দিয়ে যাবে।”
মা’র হুকুম মতন আশা একদিকের বাতি নেবাল, মাথার দিকেরটা জ্বালল। চশমা এনে দিল। তারপর চিঠিগুলো আনতে চলে গেল ঘর ছেড়ে।
আশা সামান্য পরেই ফিরে এল চিঠি নিয়ে। কামিনীর দেরি হল আসতে। চা এনেছে, পানের ডিবে আর জরদার কৌটো।
উমাশশী ধীরে সুস্থে চা খেয়ে পান জরদা মুখে পুরলেন। জরদাটা ভাল নয়। কর্তা থাকলে পাঁচ দোকান খুঁজে এনে দেন; তিনি নেই, ছেলেকে বলেছিলেন উমাশশী, ছেলে যা পেয়েছে হাতের কাছে এনে দিয়েছে ; বিশ্রী জরদা। দায়সারা কাজ। এসব থেকেই বোঝা যায়, কর্তা না থাকলে উমাশশীকে কেউ তোয়াক্কাও করে না।
চোখে চশমা এঁটে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লেন উমাশশী। চিঠিগুলো গুছিয়ে নিলেন।
প্রথম চিঠিটা বাড়ি ছেড়ে যাবার দিন দুই পরে এসেছে। আবার একবার খুঁটিয়ে পড়লেন। উমাশশী আর উমাশশীর বাবাকে কী বিচ্ছিরি করে গালাগাল দিয়েছে দেখেছ। যেন পুলিশের মেয়েকে বিয়ে করে উনি বাঘের খাঁচায় ঢুকে পড়েছিলেন বেরুবার আর পথ পাননি, মেয়ে বাপে মিলে ওকে শুধু ভয় দেখিয়েছে, আঁচড়েছে, কামড়েছে।…ঠিক আছে কর্তা—ছেলের কাছে তুমি খুব সাধু সাজছ, নিরীহ গোবেচারি সাজছ। এ-রকম বেইমানি ধর্মে সইবে না। মা-বাপ মরা ছেলে, দেখতে শুনতে ভাল, বিদ্যেবুদ্ধি রয়েছে দেখে বাবা তোমায় যেচে জামাই করেছিলেন—নয়ত পাঁচ সাতটা অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার ছেলে হাতে ছিল বাবার। কাঞ্চন ফেলে কাচ নিয়েছিলেন বাবা। অমন মানুষের গায়ে তুমি কাদা ছিটোলে! নিজের দোষটা দেখ না কেন গুপ্তবাবু? বিয়ে করেছিলে যখন তখন থাকার মধ্যে চাকরিটাই না হয় ছিল, আর কোনো সাংসারিক জ্ঞান ছিল তোমার? একটা ঘরভাড়া পর্যন্ত জোটাতে পারো না, বউকে নিয়ে আহ্লাদ করার ইচ্ছে। বাবা রাজি হননি বলে কত তেরিয়া-মেরিয়া। শ্বশুরবাড়ির ছায়া মাড়াবে না বলেছিলে। আমার বাবা তোমায় ধরে আনিয়েছিলেন। তাতে কোনো দোষ হয়েছে?…পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে বোলো না, তোমারই তাতে মাথা কাটা যাবে। আমার তখন প্রথম, পাঁচ ছ’ মাসে নষ্ট হয়ে গেল, আমি বিছানায় শুয়ে কেঁদে মরি আর তুমি স্বার্থপর ইয়ার বন্ধু নিয়ে নৈনিতাল বেড়াতে যাবার ফন্দি করছ। বাবা তোমায় ধরে আনিয়েছিলেন। বড্ড অন্যায় করেছিলেন আমার পুলিশ-বাবা? কোন একটা দলের সঙ্গে ক্যাম্প করতে গিয়েছিলে—যেখানে তোমার ঘাড় মটকাবার জন্যে মেয়ে জুটেছিল এক, দুজনে শীতের মধ্যে হু হু হি-হি করতে করতে আগুন সেঁকতে। এই নিয়ে অশান্তি করতে চেয়েছিলে তুমি। বলেছিলে, বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। বাবা তোমায় শাসিয়ে দিয়েছিলেন আড়াল থেকে। কত না গুণ ছিল তোমার গুপ্তবাবু। ছেলেমেয়েদের কাছে তো তোমার মতন নির্লজ্জ হয়ে সব কথা বলতে পারি না, তুমি আজ তাই আমার মুখে চুনকালি মাখাচ্ছ। মাখাও।
খুঁজেপেতে দ্বিতীয় চিঠিটাও সাজিয়ে নিলেন উমাশশী। পড়লেন আবার খুঁটিয়ে। ঠিকানা নেই। কিন্তু চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে, পুরনো ধর্মশালা ছেড়ে কর্তা নতুন জায়গায় গিয়ে উঠেছেন। অন্য কোথাও। লিখেছেন, এখানে ঝরনা আছে, বন আছে, গাছে গাছে অজস্র পাখি। পুরনো এক শিবমন্দির। শিবমন্দিরের সামান্য তফাতে এক আশ্রম মতন। চার পাঁচটি সাধু সন্ন্যাসী থাকেন। সকলেই অস্থায়ী। এক দু’মাস করে থাকেন, আবার চলে যান। সেখানে কোনো এক মহাসাধুর সাক্ষাৎ পেয়েছেন কর্তা। তিনি নাকি গুপ্তবাবুকে বলেছেন, “তুমি তো চাঁদি ছিলে বেটা, কিন্তু তোমায় এখন সিসে বলে মনে হচ্ছে—তোমার জেল্লা কেউ নষ্ট করে দিয়েছে।”
