তুমি মানুষ, ছাগল নও। পুলিশের মেয়ে বিবাহ করিলে তোমায় ছাগল হইয়া থাকিতে হইবে। আমার প্রথম উপদেশটি আজ তোমায় দিলাম। অবশ্য তুমি এখনও তেমন সাবালক নও। তোমার বিবাহেরও যথেষ্ট বিলম্ব আছে। তথাপি এখন হইতেই জানিয়া রাখা ভাল।
আমার লণ্ঠনের শিখাটি মিটিমিটি করিতেছে। বোধ হয় তৈল নাই। অদ্যকার মতন শেষ করিতেছি। আমি চমৎকার আছি। শরীর স্বাস্থ্য ভাল। গব্যঘৃত সহযোগে আতপচালের ভাত খাইতেছি। সুস্বাদু দুধ। ধর্মশালার ঘরটিও চমৎকার। গঙ্গার বাতাস, মুক্ত আকাশ, একটি কম্বলের বিছানা আর সাধুসজ্জনের সঙ্গ—ইহার অপেক্ষা আনন্দের কী আছে!
তোমার গর্ভধারিণী মহাতেজস্বিনী মাতাকে বলিবে—আমি বাঁচিয়া আছি, তিনি যেন সধবার আহার-বিহার করিয়া সুখে থাকেন। তোমরা আমার আশীর্বাদ লইবে। ইতি আশীর্বাদক, তোমাদের বাবা।”
চিঠিটা পড়ার সময় উমাশশীর মুখের ভাব কতবার পালটে যাচ্ছিল ছেলেমেয়েরা তা নজর করার সাহস করল না। তপন দাঁড়িয়ে থাকল—ভাবটা এমন যে, তার কোনো দোষ নেই, বাবা এরকম চিঠি লিখবে সে কেমন করে বুঝবে। এই জন্যেই তো সে চিঠি নিয়ে আসতে চাইছিল না।
চিঠিটা শেষ করে উমাশশী আগুনের ঝলকের মতন চোখ করে ছেলেমেয়ের দিকে তাকালে। চোখমুখ টকটক করছে। টান মেরে ফেলে দিলেন কাগজটা, তারপর চেঁচিয়ে বললেন, “পুলিশের মেয়ে বিয়ে করে উনি ছাগল হয়েছিলেন! আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন তো উনি সিংহ। ধর্মশালার আতপ আর ঘি খেয়ে গর্জন করছেন। আমিও দেখব।”
দুটো সপ্তাহ দেখতে দেখতে কেটে গেল। উমাশশী আশা করেছিলেন, হাতের নগদ টাকা ফুরোলেই কর্তাকে ফিরতে হবে। যেরকম কাছাখোলা, বেহিসেবি মানুষ তাতে চারশো টাকার তেজ বেশিদিন থাকবে না। অবশ্য যাবার সময় নবরত্নের আংটিটা চুরি করে নিয়ে গেছে ও। আংটির মালিক আংটি নিয়েছে তাতে কিছু নয় ; কিন্তু টান পড়লে সেটাও কি বেচে দেবে?
ছেলেমেয়েদের দিয়ে উমাশশী চিঠি লিখিয়েছেন সাত আট জায়গায় : কলকাতায়, পাটনায়, টাটানগরে, মিরজাপুরে, বেনারসে প্রায় সব জায়গাতেই—যেখানে কোনো কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন রয়েছে। একেবারে নিজের বলতে কর্তার কেউ নেই, উমাশশীরও নয়—এক বড় মেয়ে ছাড়া। খুড়তুতো জ্যাঠতুতো মাসতুতো ভাই বোনরাই যা রয়েছে দু’তরফের। আজকাল চিঠিপত্রেই যা যোগাযোগ, আগে মাঝে মাঝে তারা আসত-টাসত, এখন আর সে সময় কই, সুযোগই বা কোথায়!
উমাশশী কচি খুকি নন, তাঁর বোধবুদ্ধি যথেষ্ট। লোক হাসানোর কাজ তিনি করবেন না। ছেলেমেয়েদের বলে দিয়েছিলেন, “তোমাদের বাবা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন এ সব কথা কিছু লিখো না। লোকে হাসবে। তোমাদের বাবার তাতে মান বাড়বে না। গুণের তো শেষ নেই বাবুর। সবাই জানে। ঘর ছেড়ে পালানোর কথা লিখবে না ; একথা ওকথার পর শুধু লিখবে—তোমাদের বাবা এখন এখানে নেই, বাইরে গেছেন। ওতেই কাজ হবে। কোথাও যদি গিয়ে উঠে থাকেন তোমাদের বাবা ওদের জবাবে জানতে পারব। তোমাদের দিদিকেও ওইরকম লিখবে। তার শ্বশুরবাড়িতে দিদির মানসম্মান আছে। তার বাবা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে—এটা জামাইয়ের জানার দরকার নেই, তাতে তো তোমাদের মুখ উজ্জ্বল হবে না।”
ছেলেমেয়েরা চিঠি লিখে লিখে মাকে দেখিয়েছিল ; উমাশশী সব চিঠি আগাগোড়া পড়ে নিজের হাতে খামের মুখ এঁটে দিয়েছিলেন।
এই পনেরো দিনে অনেকের চিঠিরই জবাব এল, কিন্তু কেউ লিখল না কর্তার কারও কাছে গিয়ে উঠেছেন।
উমাশশী ভাঙবার পাত্রী নন, গুপ্তবাবুকে হাড়ে হাড়ে চেনেন। সারা জীবন ধরে জ্বলছেন উমাশশী ; অনেক রাগ অভিমান তর্জন গর্জন দেখেছেন ; গুপ্তবাবু হলেন গাদা বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ, আওয়াজ ছাড়া তাঁর কিছু নেই। কিন্তু নিজেকে যতই সামলান, থেকে থেকে মনটা খুঁত খুঁত করতে লাগল। গেল কোথায় মানুষটা?
ছেলেমেয়ের কাছে ইতিমধ্যে আরও তিন চারটে চিঠি এসেছে কর্তার ; উমাশশী দেখেছেন। তাঁর বড় অবাক লাগে। চিঠিতে কোনো ঠিকানা নেই—। সে না হয় কর্তা না দিলেন, কিন্তু খামের ওপর পোস্ট অফিসের ছাপ দেখেও কিছু বোঝার উপায় নেই। এমনই ছাপ যে একটা অক্ষরও পড়া যায় না। চিঠিগুলো কোথা থেকে আসে বোঝা গেলেও না হয় উমাশশী ধরতে পারতেন কর্তার গতিবিধি কোন দিকে।
সেদিনও একটা চিঠি এল ছেলের নামে। যথারীতি উমাশশীকে দেখানো হল। উমাশশী দেখলেন, পড়লেন ; কিছু বললেন না। গুপ্তবাবু একতরফা চালাচ্ছেন, প্রত্যেকটি চিঠিতে উমাশশীর মুণ্ডপাত করছেন, খোঁচার ওপর খোঁচা, চিমটে গরম করে গায়ে ছেঁকা দিলেও এত লাগত না। এক একসময় উমাশশীর মনে হয়, তাঁর গায়ের চামড়া কেটে কেটে লেবুর রস আর নুন ছড়িয়ে গুপ্তবাবু যেন জ্বালাটা দেখবার চেষ্টা করছেন। কোনো উপায় নেই উমাশশীর, আড়াল থেকে যে-লোক লড়াই চালায় তাকে মানুষ ধরবে কেমন করে? সামনাসামনি হলে দেখে নিতেন তিনি। কাপুরুষ কোথাকার! সাহস নেই যে সামনে দাঁড়িয়ে লড়বে, আড়ালে গিয়ে উমাশশীকে চোরা বাণ মারছ, ভাবছ তাতে তোমার পৌরুষ বাড়ছে। ঘেন্না ধরে গেল তোমায় দেখে।
এক একদিন এই বয়েসেও চোখে জল চলে আসে উমাশশীর। বাবা বেঁচে থাকলে একবার দেখতেন সারদা গুপ্তকে, কোমরে দড়ি বাঁধিয়ে ধরিয়ে আনাতেন। আজ বাবা নেই, উমাশশী একেবারে অসহায়। এমনই কপাল তাঁর, নিজের পেটের ছেলেমেয়ে দুটোকেও নষ্ট করে দিচ্ছে তাদের বাপ, মার নামে লাগিয়ে লাগিয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই কাণ্ড করছে। উমাশশী তো বলতে পারেন না, তোদের বাবার চিঠি তোরা পড়বি না—আমায় এনে দিবি—আমি আগুনে ফেলে দেব।’ ছেলেমেয়েরা শুনবে কেন? হয়তো দেখা যাবে, বাপের চিঠির কথা আর তারা মার কাছে জানাচ্ছে না। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ছে। এ তবু বোঝা যায়, চিঠিপত্তর এলে, মানুষটা কোথাও না কোথাও রয়েছে ; ছেলেমেয়েরা যদি চিঠির কথা লুকোয় উমাশশী কিছুই জানতে পারবেন না।
