কামিনী পান, জল নিয়ে এল।
উমাশশী জল খেলেন। পান জরদা মুখে পুরলেন। তারপর পাখাটা খুলে দিতে বললেন—গরম লাগছিল।
কামিনী চলে যাবার পর উমাশশী স্থির করলেন, বড় মেয়ে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের চিঠি পাঠাতে হবে। নিজে লিখবেন না, মেয়ে কিংবা ছেলেকে দিয়ে লেখবেন। কোথাও গিয়ে দু’দিন গা ঢাকা দিয়ে উমাশশীকে জব্দ করবার চেষ্টা করছে বুড়ো। উমাশশী জব্দ হবার মানুষ কিনা! জব্দ তুমিই হবে। দু’দিনেই তোমার তেল শুকোবে। সাতকাল গিয়ে এককালে ঠেকল—এখন উনি হবেন নিমাইসন্ন্যাস! চোর জোচ্চোরের মুখে বড় বড় কথা!
উমাশশী জোরে জোরেই বললেন, “দেখব তোমার মুরোদ, করো না গৃহত্যাগ। তোমার ত্যাগ আমার জানা আছে।”
দিন দুই পরে আশা এসে মাকে বলল, “বাবার চিঠি এসেছে।”
উমাশশী জানতেন, আসবে। টিকি তো এখানেই বাঁধা ; যাবে কোথায়? ধরুক না একবার অর্শ। তখন তারক কবিরাজের মলম আর উমাশশীর তোয়াজ ছাড়া চলবে না। ডুকরে কাঁদতে হবে। বিজয়িনীর মুখ করে উমাশশী বললেন, “কই চিঠি?”
আশা মিনমিনে গলায় বলল, “দাদাকে লিখেছে।”
উমাশশী গ্রাহ্য করলেন না! মুখ আছে না সাহস আছে ওই গুপ্তবাবুর যে স্ত্রীকে চিঠি লিখবে। ছেলেমেয়েকেই লিখতে হবে, ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদুনিটা ওই ভাবেই গাইতে হবে এখন।
“দাদাকে ডাক।”
“আসতে চাইছে না।”
“ওর ঘাড় আসবে।”
আশা দাদাকে ডাকতে গেল।
উমাশশী অপেক্ষা করতে লাগলেন ছেলের।
তপন এল, সঙ্গে আশা।
“কখন এল চিঠি?” উমাশশী ছেলেকে দেখামাত্র জিজ্ঞেস করলেন।
“এই তো পিয়ন দিয়ে গেল”, তপন বলল।
“কোথায় গিয়ে বসে আছে?” পচুঠাকুরপোর কাছে না মণির কাছে?”
তপন চোরের মতনই এসেছিল ; দাঁড়িয়ে থাকল চোরের মতন। হাতে একটা খাম। মার দিকে ভাল করে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল না। আশা ঠিক তার পেছনে।
“ঠিকানা লেখেনি”, তখন ঢোঁক গিলে বলল।
উমাশশী ছেলেকে ভুরু কুঁচকে দেখছিলেন। বাপের নখের যুগ্যিও নয় ছেলে। জোয়ান মদ্দ ছোঁড়া অথচ বাপের মতন লম্বা চওড়া কাঠামো নেই, বেঁটে লিকলিকে চেহারা, মাথায় রাজ্যের চুল, একেবারে মেয়ে-মেয়ে গড়ন পেটন।
“ঠিকানা দেবে না তো লিখবে কেন চিঠি?” উমাশশী ধমকে উঠলেন। “কী লিখেছে তোমার বাবা?”
তপন একবার মার দিকে চোখ তুলেই নামিয়ে নিল। চট করে দেখে নিল আশাকে। তারপর খামটা এগিয়ে দিল মার দিকে।
উমাশশী হাত বাড়িয়েই রেখেছিলেন। নিয়ে নিলেন চিঠিটা। খামের মুখ ছেঁড়া। ছেলেমেয়ে আগেই পড়েছে।
আশা তৈরি ছিল। চশমাটা এনে দিল দেরাজের ওপর থেকে।
চোখে চশমা আঁটলে উমাশশীকে আরও গম্ভীর গম্ভীর দেখায়। চশমা পরে চিঠিটা বার করলেন উমাশশী। মাথার দিকে কোনো ঠিকানা নেই।
চিঠিটা পড়তে লাগলেন:
“কল্যাণবরেষু,
তপু, আমি যে গৃহত্যাগ করিয়াছি, আশা করি তোমরা এতদিনে তাহা সুনিশ্চিতভাবেই বুঝিতে পারিয়াছ। যাহা ত্যাগ করিয়াছি তাহা আর গ্রহণ করিবার বাসনা আমার ইহজীবনে নই। আমি আর গৃহে ফিরিব না। গৃহের সুখশান্তি আমার বিলক্ষণ জানা হইয়া গিয়াছে। ত্রিশ বত্রিশ বৎসর গৃহসংসার করিলাম ; একটি কাঁঠালবিচি মাটিতে পুঁতিলে বত্রিশ বৎসরে বিরাট কাঁঠালবৃক্ষ হইয়া যায়, আর আমার ত্রিশ বৎসর বয়েসে তোমাদের দাদামহাশয় (তোমাদের গর্ভধারিণীর পিতা) যে বিচিটি আমার জীবনে পুঁতিয়া দিয়াছিলেন তাহাতে এই বত্রিশ বৎসরে আমার জীবনটি যে কীরূপ ফলময় হইয়া গিয়াছে তাহা তোমরা বুঝিবে না। কিছুটা বা অনুমান করিতেও পার। তোমরা আমার স্নেহের সন্তান। তোমাদের জন্যই দুঃখ হয়। তোমার দিদির বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে বাঁচিয়াছে। তোমার বোনের বিবাহ আজ অথবা কাল হইয়া যাইবে, সেও বাঁচিবে। তোমার গতি কী হইবে? তোমার জন্যই দুশ্চিন্তা।
আমি স্থির করিয়াছি—তোমাকে আমি মাঝে মাঝে পত্র দিব। উত্তর আশা করি না, কারণ আমার ঠিকানা তোমায় দিব না। দিবার উপায়ও নাই। কোথায় থাকিব বলিতে পারি না। এই যে পত্রটি লিখিতেছি—কোথা হইতে লিখিতেছি বলিতে পার? একটি মনোরম ধর্মশালা হইতে। ইহা সাধুসজ্জনের স্থান। শান্ত, নিরিবিলি ধর্মশালা। নিকটেই গঙ্গানদী। হু-হু করিয়া বাতাস আসিতেছে, জটাজূটধারী এক সন্ন্যাসী জলদকণ্ঠে গীত গাহিতেছে। আহা, কী সুন্দর।
আমি ভাবিয়া দেখিলাম যে, তুমি আমার একটিমাত্র পুত্র। তোমায় কিছু উপদেশ দেওয়া আমার কর্তব্য। সেই মতো আমি তোমায় পত্র লিখিব। আশাকেও পত্রগুলি পড়াইতে পার। তোমার মাতাঠাকুরানীকে না পড়াইলেই ভাল। কিন্তু তাঁহার নিকট হইতে কিছু লুকাইবার ক্ষমতা তোমাদের নাই। তাঁহাকেও পড়াইবে। আমি আর তাঁহাকে ডরাই না। তিনি আমার গ্রিনব্যানানা করিবেন।
তোমার প্রতি আমার প্রথম উপদেশ, কখনো পুলিশের মেয়েকে বিবাহ করিবে না। পুলিশের মেয়েকে বিবাহ করিয়া আমি সারা জীবন নষ্ট করিলাম। পুলিশের মেয়েকে যদি বিবাহ কর জানিবে তোমার সমস্ত স্বাধীনতা লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। ইহারা জামাইষষ্ঠিতেও আসামী ধরার মতন করিয়া নিজেদের জামাইকে ধরিয়া আনে। আমি ভুক্তভোগী। একবার নয়, অন্তত তিনবার আমার শ্বশুরমহাশয়—যিনি বিহার গভর্নমেন্টের এস. পি. জি. ছিলেন—আমাকে দুইবার মুঙ্গের হইতে, আর একবার ভাগলপুর হইতে একজোড়া কনস্টেবল পাঠাইয়া ধরিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার এইরূপ অত্যাচারের আরও নমুনা পরে দিব। তবে জানিয়া রাখো আমার অমন পিতৃদত্ত নামটি সারদাপ্রসাদ গুপ্ত, সংক্ষেপে যাহাকে এস. পি. বলে, তাহা আমার কাছে চরম ব্যঙ্গের মতন শুনাইত। বন্ধুরা বলিতেন—এস. পি. জি. অর্থে ‘এস পি’র গোট।
