“কখন ঘুম থেকে উঠেছিস?”
“আজ্ঞে, ভোর কালে।”
“বাবু ভোরবেলায় ওঠেন, হাঁটাহাঁটি করেন—বাবুকে দেখিসনি?”
“না, মা।”
“না, মা! তুই ভোরবেলায় উঠিসনি? খাস কি রাত্তিরে? গাঁজা? গাঁজাখোরের মতনই তো চেহারা করেছিস! যতসব আমার কপালে জোটে। সব কটাকে তাড়িয়ে দেব একদিন। বাড়িতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেলেও তোরা কুম্ভকর্ণের ঘুম ঘুমোবি!…কামিনীকে ডাক। তিনি তো রান্নাঘরে বসে বসে পান-জরদাই খেতে শিখেছেন।”
কানাই এ-বাড়ির পুরনো লোক। গিন্নিমার মতিগতি বোঝে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল উমাশশীর চোখের সামনে থেকে।
উমাশশীর মাথা গরম হয়ে উঠেছে। মাথা গরম হলেই কপালের শিরা দপদপ করে। মাথার পেছনদিকে ঘাড় বরাবর ব্যথা হয় কেমন। গোপী ডাক্তারকে ডাকলেই ব্লাডপ্রেশার যন্ত্র বার করে বসে, একটা পট্টি বেঁধে দেয় হাতে, কানে তার স্টেথস্কোপের নল গোঁজে ; কি যে দেখে ছাই কে জানে! বলে, হাই। খাওয়া দাওয়ার ধরাকাটা করুন, আলুটালু খাবেন না, নুন না হলেই ভাল, এটা করবেন না ওটা করবেন না। নিকুচি করেছে তার ডাক্তারির! কিছুই করব না তো সংসারে রয়েছি কেন, চিতায় গিয়ে শুয়ে পড়লেই হয়।
কামিনী এল।
কামিনীর দিকে চোখ পড়তেই উমাশশী ঝাঁঝালো গলায় বললেন, “করছিলে কী তুমি?”
কামিনী বলল, “উনুনে আঁচ পড়ে যাচ্ছিল, ঝামা কয়লা। আঁচ তুলে কুটনো কুটতে বসেছিলাম।”
“আমার মাথা কুটতে বসেছিলে,—“ উমাশশী ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “পান সাজতে আর গালে পুরতে তোমার দিন চলে যায়। একগোছ করে পান আসে রোজ, কে অত পান খায়?”
কামিনী চুপ করে থাকল, একগোছ পানের প্রায় সবটাই যে গিন্নিমার মুখে যায়—এই সত্যি কথাটা তার বলার সাহস হল না। পান জরদার নেশা নিয়ে কামিনী এ-বাড়িতে কাজে ঢোকেনি, গিন্নিমার পান সেজে দিতে দিতে তারও নেশা ধরেছে।
“সকালে যখন ঘরদোরের তালা খুলে ঝাটপাট দিচ্ছিলে হেঁসেলের দিকে—বাবুর গলাটলা পাওনি?”
“না, মা।”
“সকালে বাবুর চা করোনি?”
“করেছি। চা নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে দেখি বাবু নেই। বারান্দাতেও ছিলেন না। বাগানেও দেখিনি বাবুকে।”
“দেখতে পেলে না তো আমায় ডাকলে না কেন?”
কামিনী চুপ করেই থাকল ; সকালে বাবুকে চা দিতে গিয়ে দেখতে না পেলে যে গিন্নিমার শোবার ঘরে গিয়ে তাঁর ঘুম ভাঙাতে হবে—কামিনীর তা জানা ছিল না। এই প্রথম জানল।
কত যেন অপরাধ হয়ে গেছে, কামিনী একটু চুপ করে থেকে মিনমিনে গলায় বলল, “বাবুকে সকাল থেকেই দেখছি না, মা! কোথায় গিয়েছেন তিনি?”
উমাশশী করকরে চোখে তাকালেন কামিনীর দিকে। সমস্ত মুখে বিরক্তি। কপাল ভুরু কুঁচকে রয়েছে। বললেন, “জানি না। গিয়েছেন কোথাও।…তুমি নিজের কাজে যাও। একটু জল দিয়ে যেও।”
কামিনী চলে গেল।
উমাশশী চুপচাপ বসেই থাকলেন বিছানায়। এ রকম অবস্থা তাঁর কখনো হয়নি। মানুষটা তাঁকে একেবারে বোকা বানিয়ে পালিয়ে গেল। পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে থাকেন দুজনে, ওরই মধ্যে কখন যে ও উঠল, জিনিসপত্র গোছাল, আলমারি দেরাজ খুলল—টাকাপয়সা আংটি হাতাল, তারপর চুপিচুপি পালিয়ে গেল—উমাশশী কিছুই বুঝতে পারলেন না। তাঁকে কি কালঘুমে পেয়েছিল? নাকি ওই বুড়ো তাঁকে চোর ডাকাতদের মতন বেঁহুশ করে রেখে কাজ গুছিয়ে পালিয়ে গেছেন।
প্রথম রাতের দিকে উমাশশীর ভাল ঘুম আসে না। হাঁটু, পায়ের গোছ, হাতের গাঁট—কোথায় না বাতের ব্যথা! তার ওপর মাথা গরমের ধাত, বুকেরও ধড়ফড়ানি রয়েছে। আজকাল দু-একদিন অন্তর ঘুমের বড়িও খেতে হয় এক আধটা। কালও খেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে মড়ার ঘুম কেন ঘুমোবেন?
প্রথম রাতের দিকে উমাশশী একরকম জেগেই থাকেন, মাঝরাত নাগাদ ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরের দিকে উঠতে পারেন না। খানিকটা বেলা হয় ঘুম ভাঙতে। ঘুম ভাঙলে ঠাকুর নাম জপতে জপতে যান চোখেমুখে জল দিয়ে আসতে। কামিনী চা দেয়। চা খেয়ে দু-চারটে ছোটখাটো কাজ সেরে চলে যান স্নানে। স্নানের ঘর থেকে সোজা ঠাকুরঘরে। পুজোআর্চা সেরে নিজের ঘরে আসেন। গরদের শাড়ি ছেড়ে জামাকাপড় বদলে সংসারের কাজেকর্মে হাত দেন। এই সময়টায়—যতক্ষণ না তিনি সংসারের কাজে এসে হাত দিচ্ছেন—তাঁকে কেউ কিছু বলে না। বললেই সর্বনাশ। আজকেও উমাশশী ব্যাপারটা জানতে পারলেন অনেক পরে। কর্তা বাড়িতে নেই—এটা তাঁর কানে গিয়েছিল পুজোর ঘর থেকে বেরিয়েই। তাঁর কোনো কিছু মনে হয়নি, সন্দেহও নয়। কর্তা প্রায় সকালের দিকে স্টেশনের দিকে যান গল্পগুজব করতে, নন্দীমশাইয়ের বাড়ি যান আড্ডা দিতে, একটু আধটু বাজারটাজার ঘুরে আসেন, পোস্ট অফিসেও ঢুঁ মারেন।…মানুষটা বাড়িতে নেই বলে যে পালিয়ে যাবে এটা উমাশশী কেমন করে বুঝবেন?
বুঝলেন আরও খানিকটা পরে, কানাই যখন চিরকুটটা এনে দিল। পড়ে বিশ্বাস করতে পারেননি ; তারপর যখন দেখলেন ঘর থেকে নগদ টাকা, আংটি, জামাকাপড়, স্যুটকেস—সবই উধাও তখন বুঝলেন, মানুষটা পালিয়েছে।
কিন্তু পালাল কেন? কাল তো তেমন কোনো ঝগড়াঝাটি হয়নি। সকালে কর্তার মেজাজ খুব ভাল ছিল। উমাশশী ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে যখন শোবার ঘরে এলেন কাপড় চোপড় ছাড়তে কত তখন ঘরে, ওই জানলার সামনে বসে সিগারেট ফুঁকছেন। এখন আর লজ্জা শরমের বয়েস নেই, উমাশশী ঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে জামা-কাপড় পরতে পরতে শুনলেন কর্তা একটু খাটো গলায় মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ফক্কুড়ির সুরে ‘গীতগোবিন্দ’-র গান ধরেছেন। ওই জিনিসটি ওঁর দখলে আছে। গান গাইতে গাইতে উঠে এসে কর্তা উমাশশীর গায়ের কাপড় ধরে টান মারলেন—‘বিগলিত-বসনং পরিহৃত-রসনং’ আরও কি কি ‘পয়োধর-ভার-ভরেণ’ বলতে বলতে সাত সকালে গাল চাটার জন্যে মুখ বাড়াতেই এক ঠেলায় কর্তাকে দশ পা হটিয়ে দিলেন উমাশশী। বুড়ো বয়েসে ঢংয়ের শেষ নেই। কর্তা এতেই চটে গেলেন। বয়েই গেল উমাশশীর। এরপর আর কিছু ঘটেনি। ভাতের পাতে বরাবরই খানিকটা ঘন দুধ খান কর্তার। বয়েস তো হয়েছে। দুধের জ্বাল ভাল হয়নি। রাগারাগি করছিলেন। তা উমাশশী তখন দু’কথা বলেছিলেন। বিকেলও কোনো অশান্তি হয়নি। সন্ধেবেলায় আবার একপশলা হয়েছিল, সেটাও তেমন কিছু নয়। রাত্রে বাক্যালাপই হয়নি। তা হলে মানুষটা পালাবে কেন?
