আশা তখনও হাঁফ সামলাচ্ছিল। বলল, “মা, বাবা কি সত্যি সত্যি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে?”
উমাশশী বললেন, “রাগের মুখে আগুন। এঁচোড়ে পাকা বকাটে ছেলেদের মতন টাকা-পয়সা হাতিয়ে সোনাদানা চুরি করে পালাতে গেছে! লজ্জা করল না বুড়োর। যাবে যাও, ন্যাংটো ফকির হয়ে যাও। সংসারে যার অরুচি ধরেছে তার এত তল্পিতল্পা বাঁধা কেন?” জোরে কথা বললেই উমাশশীর গলায় কয়লার এঞ্জিনের ভোঁয়ের মতন সুর খেলে, বুক ধড়ফড় করে, ঘাম হয় মুখে। বুকে একবার হাত দিলেন তিনি। তিন ভরির বিছে হার গলায়। হারে আঙুল ঠেকতেই কেমন যেন সচেতন হয়ে হারটা দেখে নিলেন। এই হার সর্বক্ষণ তাঁর গলায় থাকে, হাতে তিন গাছা করে মোটা চুড়ি। চুড়িগুলো এমন করে বসে গেছে কজিতে যে ওগুলো খুলতে গেলেই উমাশশী জেগে যেতেন। খোলা অসম্ভব। তবে গলার হারটা খুলে নেওয়া যেত। সারদা গুপ্ত তা নেননি।
আশা বলল, “এখন কি করবে? দাদাকে খোঁজ নিতে পাঠাবে?”
উমাশশী মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “কেন, খোঁজ করব কেন? বাষট্টি বছরের বুড়ো গিয়েছেন ঘরসংসার ত্যাগ করে নিমাইসন্ন্যাস হতে! যাক না! মজাটা বুঝুক। যার নেই কাছার ঠিক তার আবার গৃহত্যাগ। আবার লম্বা লম্বা কথা—ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়—কোথাও নাকি দেখা হবে না। পরকালে আমি পেত্নি হয়ে তোমার ঘাড়ে চড়ে বসে থাকব—দেখি তুমি কেমন করে পালাও।”
আশা মুখ ফিরিয়ে জানলার দিকে তাকাল। মার মুখের দিকে তাকিয়ে একটুও যদি হেসে ফেলে, কুরুক্ষেত্র কাণ্ড হয়ে যাবে।
“তোমার দাদা কোথায়?” উমাশশী জিজ্ঞেস করলেন।
“বেরিয়েছে কোথায় সাইকেল নিয়ে, আসবে এখুনি।”
“যেমন বাপ তার তেমনি ছেলে। সকাল থেকে ইয়ার বন্ধু করে বেড়াচ্ছে। একটা লোক বাড়ি ছেড়ে পালাল একরাশ জিনিস নিয়ে, তোমরা কেউ জানতেও পারলে না। বাড়িতে একটা কুকুর থাকলে সেটাও ঘেউ ঘেউ করত।”
আশা একেবারে থ। মার চোখে তারা কুকুরেরও অধম হয়ে গেল! একটু তাকিয়ে থাকল মার দিকে। রাগলে এখনও মার গালটাল টকটকে হয়ে ওঠে। চোখ দুটো ঝকঝক করছে। সাহস হল না আশার ; মনে মনে বলল, ‘তুমি তো পাশেই শুয়ে থাকো বাবার—তুমিই জানতে পেরেছ বাবা কখন পালিয়েছে।’
এ-সব সময় কথাটথা বলা উচিত নয়। আশা চুপ করেই থাকল, গোবেচারি অপরাধী মুখ করে ; যেন স্বীকার করে নিল—তারা দুই ভাইবোন একেবারে অপদার্থ, কুকুরের চেয়েও অধম।
উমাশশী রুক্ষ চোখে কিছুক্ষণ ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে মেরের দিকে মুখ ফেরালেন। বললেন, “দাদা এলে বলো একবার থানায় যেতে হবে।”
“থানা?”
“থানায় গিয়ে ডায়েরি লেখাতে হবে। চুরির ফর্দটা আমি দিয়ে দেব।”
আশার মুখ আরও খানিকটা শুকিয়ে গেল। গলা পরিষ্কার করে বলল, “বাবার নামে থানায় ডায়েরি লেখাবে?”
“আলবত লেখাব। আমার বাড়ি থেকে জিনিস চুরি গেলে ডায়েরি লেখাব না? হাজার বার লেখাব। যা যা চুরি গিয়েছে—সব লেখাব”, উমাশশী তাঁর ফোলা ফোলা—পাকা কাঁঠালের কোয়ার মতন আঙুল তুলে শাসালেন, তারপর ডান হাতের তর্জনী বাঁ হাতের তালুতে ঠুকতে ঠুকতে বললেন, “থাকত আমার বাবা বেঁচে তো দেখে নিতাম। পালাত কোথায় তোমাদের গুপ্তবাবু? আমার বাবার হুকুমে ঘাড় ধরে টেনে আনত পুলিশ ওই নিমাইসন্ন্যাসকে। বুঝতে পারত—কত ধানে কত চাল।” উমাশশী হাঁফ ফেললেন, বুকটা ধড়ফড় করছে। বার দুই ঢোঁক গিলে বললেন, “পালানো অত সোজা। এ কি খরগোসের বাচ্চা নাকি যে দিলাম ছুট আর বনে গিয়ে লুকোলাম! তোমাদের বাবার কেরানি আমার জানা আছে। অনেক হম্বিতম্বি, পালাপালির চেষ্টা করেছে আগে। পেরেছে? আমার বাবার এক দাবড়ানিতেই সব ঠাণ্ডা।”
আশা ভয়ে ভয়ে বলল, “দাদু ছিল ডাকসাইটে পুলিশ অফিসার, দাদুর কথা আলাদা। এখানের এই ছোট্ট থানায় ডায়েরি লিখিয়ে তুমি কি করবে? ওরা কিছুই করতে পারবে না—শুধু শুধু লোক হাসাহাসি হবে।”
উমাশশী বললেন, “তোমায় কত্তামি করতে হবে না। আমি যা বলছি তাই হবে। তোমার দাদা এল কিনা দেখো! আর কানাইকে ডেকে দাও। আমি জানতে চাই—ওই চিরকুট সে কোথায় পেল।”
আশা আর দাঁড়াল না, পালিয়ে গেল।
উমাশশী বিছানার ওপর বসে থাকলে। মাথার দিকের জানলা খোলা, পায়ের দিকেরও। দু দিকের জানলাতেই ছোট ছোট পরদা, জানলার তলার দিকটা ঢাকা, ওপরটা ভোলা। মাথার জানলা দিয়ে বাইরের বাগান দেখা যায়, করবী আর কাঠচাঁপা, দু-একটা ঝাউ কিংবা জবাগাছ। বেশ রোদ পড়েছে বাগানে, ঝকঝক করছে। করবেই তো। এটা তো কার্তিক মাসের শেষ, কোথাও কোনো মেঘবাদলা নেই, সবই পরিষ্কার। বাগানে কাক চড়ই শালিখ ডাকাডাকি করছিল। উমাশশী কেমন যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। কার্তিক মাসে মানুষটা বাড়ি ছেড়ে পালাল। মাস বছর হিসেব করে না—এ কেমন লোক! আর ক’দিন পরেই অঘ্রাণ পড়ছে। বারোই অঘ্রাণ কর্তার জন্মদিন, তেষট্টি বছরে পড়বে। আর ঠিক এই সময়ে পালাল! বুড়ো হয়ে ভীমরতিতেই ধরেছে!
কানাই এসে দাঁড়াল নিচু মুখে।
“তুই ওই কাগজটা কোথায় পেয়েছিস?” উমাশশী ধমকের গলায় বললেন।
“বসার ঘরে”, কানাই বলল, “ঘরদোর ঝাট দিচ্ছিলাম, গোল টেবিলের ওপর থেকে পড়ে গেল।”
“টেবিলের ওপর থেকে এমনি এমনি কাগজ পড়ে যায়?” উমাশশী সন্দেহের গলায় বললেন।
কানাই থতমত খেয়ে বলল, “টেবিল সরিয়ে রাখছিলাম, মা।”
