প্রীতি বলল, “মোটেই যাঃ যাঃ নয়। তোমার বাবা একটা ইয়ে—কোনো সাহস নেই, ভিতু, ডরপোক্কা। মার বিয়ে হয়ে গেল। তোমার বাবার আর তো কোনো ক্ষমতা হল না—মার ওপর রাগ নিয়ে বসে থাকল। সেই জের এখনও চলছে….”
অতুল সন্দেহের গলায় বলল, “আমার বাবা তোমার মার সঙ্গে প্রেম করত কে বলেছে?”
“দেখেছি” প্রীতি সটান গলায় বলল।
“তুমি দেখেছ?”
“হ্যাঁ মশাই দেখেছি। তোমার বাবার দেওয়া একটা বই মা এখনও কী যত্ন করে রেখে দিয়েছে। তাতে কি লেখা আছে জানো? লেখা আছে—আমার আদরের ধন লক্ষ্মীমণিকে।”
অতুল এবার সত্যি সত্যি লাফ মেরে উঠল। “যাঃ শালা। এই কেস। কী বই, মাইরি?”
“চন্দ্রশেখর। ”
“এই বইয়ের কথা তুমি আগে বলোনি তো?”
“আগে ছাই আমি দেখেছি নাকি। মা কোথায় লুকিয়ে রাখত কে জানে! বইটা তো সেদিন দেখলাম ; মার কেরাসিন তেল আর তোমার বাবার ঘুমের ওষুধ খাবার পর। মা এখন মাথার কাছে বইটা রেখে শুয়ে থাকে।”
অতুল বার কয়েক মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে নিল। ফস করে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর বলল, “আমার বাবাটা চরিত্রহীন নাকি?”
“চরিত্রহীন?”
“না তেমন চরিত্রহীন নয়। ক্যারেকটার নেই আর কি? প্রেম করতিস তো করতিস—সো হোয়াট? বিয়ে করলেই লেঠা চুকে যেত।”
প্রীতি জোরে চিমটি কাটল অতুলকে। তারপর জিব দেখাল। “ঘোড়ার মতন বুদ্ধি তোমার। তোমার বাবা আর আমার মা বিয়ে করলে—আমাদের কী হত মশাই? তোমায় যে দাদা বলতে হত!”
অতুলের খেয়াল হল যেন ব্যাপারটা। জিব কেটে ফেলল। বলল, “রিয়্যালি, আমার কোনো সেন্স নেই। খাজা মাথা। তুমি ঠিক বলছ! আমাদের ব্যাপারটার জন্যে ওদের স্যাক্রিফাইস করা উচিত ছিল। যাক গে, ওই বইটা আমাকে দিয়ো। ”
“কী করবে বই নিয়ে?”
অতুল রহস্যময় মুখ করে হাসল, ততোধিক রহস্যময় গলায় বলল, “ব্ল্যাকমেইল করব। প্রেশার দেব। তোমার আমার ব্যাপারে বাবা এবার যদি ঝামেলা করে—বইটা আমি আমার মার হাতে তুলে দেব। মা একটিবার শুধু দেখুক আমার ফাদারমশাই কাকে আদরের ধন ‘লক্ষ্মীমণি’ বলতেন। বাস ওতেই হয়ে যাবে। কিস্যু আর করতে হবে না আমাদের।”
প্রীতি একটুর জন্যে থমকে দাঁড়াল। তারপর দমকা হেসে উঠল। হাসি আর থামতেই চায় না। হাসতে হাসতেই বলল, “ভীষণ বুদ্ধি তো তোমার! এত বুদ্ধি ওই মাথায় ধরে রেখেছিলে! দেখি—দেখি—” বলে প্রীতি হাত বাড়িয়ে অতুলের চুলের ঝুঁটি ধরে মাথাটা নিজের মুখের কাছে নামিয়ে নিল। তারপর চকিতে একবার চারপাশ দেখে নিল প্ল্যাটফর্মের। কেউ নেই।
অতুল মুখ তুলে ভেজা গালের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “বড্ড দাড়ি হয়ে গিয়েছে। স্কিনে টাচ করল না।”
দুজনেই হেসে উঠল একসঙ্গে। হাসতে হাসতে ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে চলল।
বৃদ্ধস্য ভার্যা
উমাশশী বারো হাত শাড়ি ধরেছেন সেই কোন যুগে—যখন তাঁর বয়স চল্লিশও হয়নি। এখন পঞ্চাশ চলছে। বারো হাতে আর কুলোয় না, যোলো হলেই যেন তাঁকে সবদিক থেকে মানাত। কিন্তু পাবেন কোথায়? দোকানে বাজারে বারো হাতই জোটে না সবসময়। এমনই বরাত উমাশশীর, পছন্দ মতন কোনো জিনিসই তাঁর ভাগ্যে এ-যাবৎ জুটল না। স্বামীও নয়।
অনেকটা বেলায় যখন কানাই এসে এক টুকরো কাগজ উমাশশীর হাতে তুলে দিল, কাগজের টুকরোয় বার দুই চোখ বুলিয়ে উমাশশী তাঁর বরাতের বহরটা দেখলেন। স্বামী গৃহত্যাগ করেছেন।
“আমি গৃহসংসার ত্যাগ করিলাম। বৃথা অন্বেষণ করিও না। তুমি তোমার সংসার লইয়া সুখে থাকো। ইহকালে আর সাক্ষাৎ হইবে না। পরকালেও যেন না হয়। ইতি সারদা গুপ্ত।”
“পুঃ : পথ খরচ হিসাবে কিছু লইয়া গেলাম।”
উমাশশী কচি খুকি নন, স্বামীর গৃহত্যাগের দৌড় তাঁর জানা আছে। বাষট্টি বছরের বুড়ো—যার এক গ্লাস জল গড়িয়ে খাবার ক্ষমতা নেই, দু পাটি দাঁতের অর্দ্ধেক বাঁধানো—সে করবে গৃহত্যাগ? ঢং কত!
ছোট মেয়েকেই ডাকলেন উমাশশী। ডেকে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। নিজে বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না, ওঠা-বসা, কোমর নোয়ানো, উবু হওয়া—এসব তিনি প্রায় ত্যাগই করেছেন।
ঘরে এসে মেয়েকে বললেন, “আলমারি খোল, দেরাজ খোল। বাক্সটাজ যা আছে টেনে বার কর। দেখি তোর বাবা কী কী নিয়ে পালিয়েছে?”
মেয়ে মার কতটা বাধ্য বোঝা গেল না, বলল, “কোনটা আগে খুলব?”
“আলমারি।” আঁচল থেকে চাবিরর গোছা খুলে ঝনাৎ করে ফেলে দিলেন উমাশশী।
আলমারি, দেরাজ, কোণে রাখা ট্রাঙ্ক, ঘরের এ-কোন ও-কোন, তাক, খাটের তলা সমস্ত আঁতিপাঁতি খুঁজে মেয়ে—মানে আশা যখন গলদঘর্ম হয়ে উঠে দাঁড়াল তখন উমাশশী তাঁর প্রাথমিক তল্লাসি শেষ করে ফেলেছেন। ধোপা এবং সংসার খরচের খাতার একপাশে গোটা গোটা করে হারানো জিনিসের লিস্টি লেখা হয়ে গেছে।
তালিকাটা এইরকম ; নগদ টাকা চারশো ; একটি নবরত্ন আঙটি, একজোড়া ধুতি, একটি প্যান্ট, পায়জামা নতুন একটি, পাঞ্জাবি দুই, কর্তার বুশ শার্ট এক, গেঞ্জি দু’তিনটি, চাদর ও সোয়েটার একটি একটি, কর্তার দু’পাটি জুতো, এক শিশি মিল্ক অফ ম্যাগনেশিয়া, নতুন জবাকুসুম তেল ইত্যাদি।
ফর্দর দফা প্রায় এগারো হল। উমাশশী বুঝলেন, ঠিক যা যা বুড়োর লাগতে পারে—সবই নিয়ে পালিয়েছে। মায় একটা স্যুটকেস পর্যন্ত। পোস্ট অফিসের টাকা তোলার বই, ব্যাংকের জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের চেক খাতা, বাড়ির দলিলপত্রের কাগজ—এ-সব অবশ্য রেখেই গেছে। একটা জিনিস কিন্তু নিয়ে যেতে ভুলে গেছে, বুড়ো তারক কবিরাজের দেওয়া অর্শের ওষুধ। বুঝবে ঠেলা।
