আপনি নাকি এই মরা কুকুরটাকে রেখে দেবেন?
বুডোর উত্তর বিশ্বনাথ শুনতে পেল না।
আপনার কি কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে? জানেন এর থেকে কত রকমের রোগ ছড়াতে পারে, মহামারিও হতে পারে। ঘরে বাচ্চা রয়েছে।
বিশ্বনাথ দু-ধাপ উঠেও বুড়োর কথাগুলো বুঝতে পারল না। কেন জানি তার মনে হল, বুড়ো তার জেদ থেকে এক ইঞ্চিও সরবে না।
এই পচা গন্ধ নাকে নিয়ে আপনার সঙ্গে আর তর্ক করতে পারব না, বসে বসে প্রাণভরে আপনি খুঁকে যান কিন্তু দয়া করে এটাকে বিদেয় করুন। এটা সভ্যসমাজ, পাঁচজনের কথা
ভেবে চলতে হয়। আপনি যদি আজকেই এটাকে…
গেট আউট, গেট আউট, গেট আউট।
বুড়োর তীক্ষ্ণ চিৎকারের সঙ্গেই চেয়ার সরাবার শব্দ বিশ্বনাথ শুনতে পেল। তারপরই ভীতমুখে তনুকে নেমে আসতে দেখল।
তেড়ে এল আমার দিকে। মনে হচ্চে পাগল হয়ে গেছে। … চোখ দুটো যেন কীরকম… তনু থেমে গেল।
বিশ্বনাথ অস্ফুটে বলল, জ্বলজ্বল করছিল।
জানলে কী করে! তুমি তো নীচে ছিলে।
তনুর ভাত খাওয়া আর হল না। ন-টা আটাশের কৃষ্ণনগরটা এখনও ধরার সময় আছে। বেরোবার সময় সে বলে গেল, এক বার ও-বাড়িতে গিয়ে বরং রবিবাবুকে বললা যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কুকুরটা ফেলার ব্যবস্থা করতে পারে। আর এখুনি ফিনাইল এনে চারিদিকে ছড়িয়ে দাও …শম্পা মনে করে রসটা খাওয়াস।
ফিনাইল কিনে ফেরার সময় বিশ্বনাথ ও-বাড়িতে ঢুকল। খবর পেয়ে নেমে এল রবি।
কুকুরটা মরে গেছে … আজ চার দিন।
বলেই ছিলাম টাইম হয়ে এসেছে। রবির মুখ তৃপ্তিতে ভরে উঠল।
আপনার জ্যাঠামশায়ের মাথা বোধ হয় খারাপ হয়ে গেছে। উনি ওই মরা কুকুরটাকে রেখে দিয়েছেন।
বলেন কী! রবি খাড়া হয়ে বসল। মরা কুকুরটাকে?
হ্যাঁ। এখন কী করি বলুন তো। আমি বললুম, আমার স্ত্রীও বলল, উনি তো তেড়ে প্রায় মারতেই এলেন। অথচ এই সেদিন জঞ্জাল সাফ করে দেওয়ার কথা বলতেই উনি লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি সাফ করিয়ে দিলেন। … আপনি কি এক বার ওঁকে বলবেন?
আমি কী বলব?
যাতে কুকুরটার ব্যবস্থা করেন।
ও-বাড়িতে আমরা কেউ যাই না। আপনি বরং কর্পোরেশনে কি পুলিশে খবর দিন। ওপরে আমি কাজ ফেলে এসেছি, কিছু মনে করবেন না। রবি চেয়ার থেকে উঠল।
মরা কুকুর পড়ে থাকলে আশপাশের বাড়িতে রোগভোগ তো হতে পারে। বিশ্বনাথ শেষ চেষ্টা করল রবিকে সক্রিয় করে তুলতে।
তা তো পারেই। আচ্ছা।
বিশ্বনাথ দরজা-জানলার বাইরে ফিনাইল ছড়িয়ে তনুর মতো না খেয়েই অফিসে গেল। যাবার আগে শম্পাকে হুঁশিয়ার করল, বাবান যেন ঘরের বাইরে না যায়। অফিস থেকে আজ সে তাড়াতাড়ি ফিরল এবং তনুও ফিরল প্রাইভেট কোচিং না করেই। বিশ্বনাথ আর এক বার ফিনাইল ছড়িয়ে এসে ঘরের জানলা বন্ধ করে দিল।
এভাবে কতদিন চলা যাবে? তনুর প্রশ্নে বিশ্বনাথ অসহায়ভাবে শুধু তাকিয়ে রইল।
কাল সকালেই থানায় যাও। পুলিশ দেখলে হয়তো বুড়ো ভয় পাবে।
কিন্তু পুলিশ যে আসবেই তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ব্যাপারটা একদমই অবাস্তব। ওরা বিশ্বাসই করতে চাইবে না। কেনই-বা করবে, আমি নিজেকে তো বিশ্বাস করাতে পারছি না।
তবু তুমি সকালে এক বার যাও। লোক পাঠিয়ে অন্তত এক বার ওরা দেখে যাক। ব্যাপারটা সত্যি কি না। পুলিশ ছাড়া তাড়াতাড়ি কিছু করার আর তো উপায় নেই।
পুলিশ তো আর হাতে করে কুকুরটাকে ফেলতে আসবে না, কর্পোরেশনের ডোমকে দিয়ে ফেলবে। গড়িমসি করে, সময় নেবে। আমি তো কেষ্টবিষ্ট্র নই। তবে আমার মনে হয় সোজা যদি কাউন্সিলারের কাছে যাই তাহলে তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা হতে পারে।
সেই ভালো।
ওরা টিভি দেখল না। বিশ্বনাথ লিখতে বসল না। রাতে খেতে বসে তনু বমি করতে ছুটে গেল কলঘরে। বিশ্বনাথ বিষণ্ণ মুখে চেয়ারে বসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এই রকম পাগলের বাড়িতে বাস করা যায় না, অন্য কোথাও ঘর দেখতে হবে। জায়গাটা কিন্তু আমার খুব পছন্দের ছিল।
বালিশে মুখ চেপে তনু উপুড় হয়ে শুয়ে। মুখ ফিরিয়ে শুকনো গলায় বলল, বাবানকে নিয়ে কালই আমি শ্যামপুকুরে চলে যাব।
গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে আলো নিভিয়ে বিশ্বনাথ শুয়ে পড়ল। ভোররাত্রের দিকে হঠাৎই তার ঘুম ভেঙে গেল। জানলার বাইরে কীসের যেন একটা শব্দ। কিছু-একটা দিয়ে মাটিতে আঘাত করার মতো ধস ধস ধস হয়ে চলেছে।
প্রথমেই তার মনে হল চোর। ভয়ে সে কিছুক্ষণ সিঁটিয়ে রইল। মিনিট কয়েক পর শব্দটা থেমে গেল। বিশ্বনাথ ভাবল, এক বার উঠে জানলাটা খুলে দেখবে কি না। বিছানায় উঠে বসতেই শব্দটা আবার শুরু হল আর সেইসঙ্গে জোরে জোরে শ্বাস ফেলার শব্দ। কোনো মানুষই হবে তবে চোর নয়।
অন্ধকারে পা টিপে জানলায় এসে সন্তর্পণে একটা পাল্লা সে ইঞ্চি চারেক ফাঁক করল। দূর থেকে রাস্তার আলোয় অন্ধকারটা ঈষৎ ফিকে। বিশ্বনাথ চোখ সইয়ে নিতে কিছুটা সময় নিল। জানলার পাশেই গেঞ্জি-ঢাকা একটা পিঠ। কেউ উবু হয়ে বসে। হাতে শাবলের মতো একটা কিছু, তাই দিয়ে মাটি খুঁড়ে চলেছে।
এত রাতে এখানে, এমন কাজে ব্যস্ত হল কে? তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিশ্বনাথ প্রায় বলে ফেলছিল, কী করছেন আপনি? তার বদলে সে বিস্ফারিত চোখে বুড়োর দিকে শুধু তাকিয়ে রইল।
হাঁটু গেড়ে বুড়ো এবার দু-হাত দিয়ে গর্ত থেকে মাটি তুলছে। কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়া দেহ থেকে বিশ্বনাথের মনে হল গর্তটা হাত খানেক গভীর। মাটি তোলার সঙ্গে রয়েছে হাঁফ ধরার শব্দ। কিছুক্ষণ ধরে গর্ত খোঁড়া ও মাটি ভোলা চলল। বুড়ো তারপর শাবলটা মাটিতে রেখে ব্যস্তভাবে জানলার সামনে থেকে চলে গেল। বিশ্বনাথ ভাবল, বেরিয়ে কি দেখে আসবে, বুড়ো এত রাতে গর্ত খুঁড়ছে কেন?
