ইতস্তত করে অবশেষে অন্ধকার ঘর থেকে সে দালানে বেরিয়ে আলো জ্বেলে শম্পাকে দেখে নিয়েই নিভিয়ে দিল। বাইরের দরজার খিল নিঃশব্দে নামিয়ে পাল্লাটা খুলতে যাবে তখনই নাকে লাগল একটা মাংসপচা গন্ধের এগিয়ে আসা। বিশ্বনাথ অপেক্ষা করল দরজার ফাঁকে চোখ রেখে। একটা পুঁটুলি বুকের কাছে দু-হাতে ধরে বুড়ো তার সামনে দিয়ে চলে গেল। পুঁটলিটা থেকে ঝুলছে একটা লোহার শিকল যেটাকে সে চেনে। বিশ্বনাথ পায়ে পায়ে ফিরে এসে খাটে শুয়ে পড়ল। জানলার বাইরে মাটি থাবড়ানোর শব্দ হচ্ছে এবং সেটাও একসময় থেমে গেল। তার আর ঘুম এল না।
সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। জানলার ফাঁক-করা পাল্লা দুটোর মাঝে ধূসর রেখাটি একটু উজ্জ্বল হতেই বিশ্বনাথ বাইরে বেরিয়ে এল। বাড়িটা ঘুরে ঘরের জানলার কাছে এসে দেখল হাত দুয়েক লম্বা জায়গায় মাটির রং গাঢ়। ওখানে গর্ত খুঁড়ে আবার তা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। আলগা মাটির উপর পায়ের ছাপ। পা দিয়ে চেপে মাটি বসানো হয়েছে। জায়গাটি কচ্ছপের পিঠের মতো ঈষৎ উঁচু তবে চোখে পড়ার মতো নয়। বৃষ্টি আর রোদ একসময় এটাকে সমান করে দেবে।
বিশ্বনাথ একদৃষ্টে ফুচার কবরের দিকে তাকিয়ে। একটা স্বস্তি ভোরের বাতাসের মতো তার চেতনার উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। বুড়ো কেন যে এমন একটা কান্ড করল সেটা কোনোদিনই জানা যাবে না। চিরকাল এটা রহস্যই থেকে যাবে। ফুচা আর বুড়োর সম্পর্কটা এই মাটির নীচেই বরং রয়ে যাক। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে চমকে উঠল। ওটা কী? কবরের মধ্য থেকে ওটা কী বেরিয়ে? সে ঝুঁকে পড়ল।
ফুচার চেনের একটা প্রান্ত সে দেখতে পেল। অন্ধকারে তাড়াহুড়োয় বুড়ো বোধ হয় দেখতে পায়নি চেনটা পুরোপুরি মাটির নীচে চাপা পড়েনি। আঙুলে করে তুলে নিয়ে চেনটায় অল্প টান দিতেই বিশ্বনাথের মনে হল এটা এখনও ফুচার গলায় বাঁধা রয়েছে। অদ্ভুত একটা আতঙ্ক তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করল। চেনটা হাত থেকে ফেলে দিতে গিয়ে তার মনে হল এটা তার আঙুলের সঙ্গে আটকে গেছে, হাজার চেষ্টা করলেও সে আঙুল থেকে ছাড়াতে পারবে না। সারাজীবন ফুচা তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে, কিন্তু কোথায়?
বাবানের জন্য, তনুর জন্য তার চোখ জলে ভরে উঠল। চেনটা নরম মাটির মধ্যে চেপে বসিয়ে সে মাটি দিয়ে ঢেকে দিল। ওরা যেন কখনো জানতে না পারে এখানে ফুচা রয়েছে।
ঘরে ফিরে আসার সময় বিশ্বনাথ মুখ তুলল। বারান্দায় বুড়ো চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগে সামনের দেয়ালটা দেখছে।
বৃষ্টিতে
সত্যেন বাঁড়ুজ্জের বড়োছেলে বাবুলকে কুকুরে কামড়াচ্ছিল, অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। সিনেমা দেখে রাত সাড়ে নটা নাগাদ সে বাস থেকে নামে। একটা খালি জমির প্লট কোনাকুনি পেরিয়ে রাস্তায় পড়লেই বাঁদিকে বস্তি আর ডান দিকে বিরাট একটা পাঁচিল-ঘেরা অ্যাপার্টমেন্ট হাউজিং। রাস্তাটাকে দু-ভাগ করে মাঝখানে, প্রায় পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত নানানরকম পাতাবাহার গাছের সারি। এই বস্তিরই কিছু কুকুর রাত ন-টার পর রাস্তাটাকে বিভীষিকায় রূপান্তরিত করে। পদচারী বা সাইকেলে কেউ ওই বস্তির সামনে দিয়ে গেলেই পাঁচ-ছটি কুকুর ঘেউ-ঘেউ রবে ছুটে গোড়ালি পর্যন্ত মুখ নিয়ে আসে। বুদ্ধিমানেরা দাঁড়িয়ে পড়ে, মুখে চু-চু, চুকচুক শব্দ করে ওদের বোঝাবার চেষ্টা করে, আমি ভালো লোক। ওরা তখন কামড়াবার মতো দূরত্বে এসে হিংস্রভাবে দাঁত দেখায়, ঘেউ ঘেউ করে গাছের সারির শেষ পর্যন্ত পায়ে পায়ে চলে। যারা ভীতু তারা চিৎকার করে ওঠে এবং ছুটতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনে। গত তিন মাসে চার জনের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত নানান জায়গার মাংস খুবলে নিয়েছে ওরা। সঠিক বললে, একটি কুকুরই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, কালুয়াটাই। দেখলেই চিনতে পারবে। ইয়া তাগড়াই, কুচকুচে কালো, শুধু বুকের কাছে সাদা আর দুটো চোখের ঠিক উপরে ব্রাউন দুটো স্পট, মনে হবে একস্ট্রা দুটো চোখ। ওটাই পালের গোদা।
প্যান্টের তলার দিকে ফালা হয়ে যাওয়া অংশটা সকলের সুবিধার জন্য বাবুল পা তুলে দেখাল। দাঁতের আঁচড়ে জুতোর পিছনেও ছাল ওঠা।
কী শয়তান কুকুর গো? বাবুলের মা, পুরোনো হাঁপানির রোগী সুপ্রভা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। বাবুল তাদের একমাত্র সন্তান। সেদিন অরুণ দত্তকে কামড়ে পায়ের এতটা মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে, এখনও ইঞ্জেকশন চলছে। ভদ্রলোকের পায়ের যা অবস্থা শুনছি হাসপাতাল যেতে হবে।
ভয়ে প্রথমে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। বস্তির পাঠশালার রকে কয়েকটা লোক বসেছিল। তাদের একজন কুকুরগুলোকে ডাকতেই আর আমার দিকে এগোল না! বাবুলের গলা এখনও শুকিয়ে রয়েছে। সন্তর্পণে সে পায়ে হাত বোলাল।
কিছু-একটা করা দরকার। সত্যেন চিন্তিত স্বরে বলল।
কর্পোরেশনে খবর তো মদনদের চাকরকে কামড়াবার পরই দেওয়া হয়েছিল, কিছুই হল না। শুনলুম একদিন নাকি কুকুরধরারা এসেছিল। ওদের দেখেই বস্তির লোকেরা কুকুরগুলোকে ঘরে লুকিয়ে ফেলে।
ওভাবে হবে না, অন্য কিছু ভাবে এই উৎপাত থেকে বাঁচার কথা ভাবতে হবে। সত্যেন বলল বটে কিন্তু কীভাবে বাঁচবে তার হদিস সে জানে না।
পরদিন অফিসে যাবার সময় সত্যেন কয়েকটি কুকুরকে রাস্তায় দেখল। বস্তিতে ঢোকার সরু রাস্তাটার মুখেই টালির চালের পাঠশালার ঘর। হাত তিনেক চওড়া একটা সিমেন্টের রকের উপর পর্যন্ত চাল নামাননা। স্কুলের একমাত্র দরজায় তালা, দশটার পর খুলবে।
