ফুচার চলাফেরা কি শেষ হয়ে গেছে? কুমিরের মানুষ-খাওয়া দেখতে দেখতে সে খুবই কি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল? কিন্তু সরসর শব্দটা এমনই যে সেটা তার শরীরের যেকোনো জায়গা স্পর্শ করবেই, বীভৎস সুখে তার সর্বাঙ্গ মোড়া থাকলেও। ফুচা আজ সময় রাখতে পারেনি। আলো নিভিয়ে বিশ্বনাথ চিত হয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল। ফুচার চলাফেরা হল কি না সে জানল না।
পরের রাতেও একই ব্যাপার, ফুচার চলাফেরার আভাসটুকুও নেই। কৌতূহলী হয়ে বিশ্বনাথ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। সামনের দেয়ালে খতম-এ পিঠ লাগিয়ে দোতলার বারান্দায় রেলিঙের ফাঁক দিয়ে যতদূর দেখা যায়, দেখার জন্য গোড়ালিও তুলল। কিছুই নেই। খাটিয়ায় রামবিলাস ঘুমোচ্ছে। ফিরে আসার জন্য দরজার কাছে এসে থমকে সে মুখ তুলল। চোখ বন্ধ করে এক বার শিউরে উঠে চোখ খুলল।
ফুচার মাথাটা বেরিয়ে নেই, সেই জ্বলজ্বলে চোখ দুটোও নেই। জন্তুজানোয়ারের চোখ, তনু বলেছে অন্ধকারে জ্বলে। কিন্তু ফুচার চোখে কোনো আলো থাকার কথা নয়, ও-দুটো তো ছানি পড়ে সাদা হয়ে গেছে। ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে বিশ্বনাথের একটাই চিন্তা, আমি ভুল দেখলাম কেন? কূলকিনারা না পেয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে সে তনুকে বলল, আশ্চর্য ব্যাপার, ফুচার নখ অর চেনের শব্দ দু-দিন হল পেলাম না!
শাড়ি পাট করে নাভির উপর গুঁজে দিতে দিতে তনু আড়চোখে বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, বুড়ো হয়তো কোথাও চেনটা বেঁধে রেখেছে তাই ও চলছে না … শম্পা ঠিক তিনটের সময় মনে করে কিন্তু রসটা খাওয়াবি। রামকৃষ্ণর ছবির সামনে সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়াল।
বোধ হয় তাই, ফুচাকে বেঁধেই রাখা হয়েছে কেননা আরও চার দিন বিশ্বনাথ শব্দ পেল। এখন তার শব্দ না পাওয়ার অস্বস্তিটা আর হয় না। কিন্তু শম্পার একটা কথায় সে বিচলিত বোধ করল।
আজ সকালে বউদি বলল, জানলা দিয়ে কীরকম যেন একট গন্ধ আসছে। তুমি কি পাচ্ছ?
বিশ্বনাথ জানলার কাছে এসে কয়েক বার শ্বাস টানল। একটা গন্ধ সে পেল। কথা না বলে সে বেরিয়ে এসে জানলার বাইরে দাঁড়াল। ইঁদুর কি বেড়াল কিছু-একটা মরেছে, সকালে দেখা যাবে এই ভেবে সে ফিরে এল।
তনু ফিরে এসে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, আবার ওপর থেকে ফেলা শুরু করেছে। কাল সকালেই গিয়ে বোলো।
বিশ্বনাথ সকালে বলতে যাবার আগে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য জানালার বাইরে এক বার খোঁজাখুঁজি করল। উপর থেকে কোনো কিছু পড়ার চিহ্ন নেই। তবে সে মাংস পচার গন্ধ পেল। কিছুই যখন পাওয়া গেল না তাহলে কী বলতে সে উপরে যাবে? বিশ্বনাথ ফাঁপরে পড়ল।
বলো একটা উৎকট গন্ধ পাচ্ছি। এ ব্যাপারে বাড়িওয়ালা হিসেবে ওঁরও তো কিছু কর্তব্য আছে, নাকি নেই? তনু স্নান করে ভিজে শাড়ি জড়িয়ে ঘরে এসেছে। মাথা দিয়ে গলিয়ে এবার শুকনো শায়াটা পরবে, যাতে একটা দাগও নেই। তারপর শায়াটাকে বগলের আর নিচে না নামিয়ে দড়ি বাঁধবে এবং ভিজে শাড়িটা প্রতিদিনের মতো ঝরে পড়বে পায়ের কাছে। হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা শায়ার তলায় সরু দুটো পা দেখলে বিশ্বনাথের হাসি পায় কিন্তু সে কখনো হাসে না।
শম্পা মেলে দিয়ে আয়। তনু চেঁচিয়ে কথাটা বলে বিশ্বনাথের দিকে ফিরে বলল, দাঁড়িয়ে থেকো না।
বিশ্বনাথ আর দাঁড়াল না। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই গন্ধটা তার নাকে ধাক্কা দিল। বারান্দার শেষ প্রান্তে বুড়ো মাথা ঝুকিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। তার পিছনেই পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে ফুচা। চেনটা গলায় বাঁধা।
ওটা যে ফুচার মৃতদেহ এটা বুঝতে বিশ্বনাথকে অর্ধসমাপ্ত একটি মাত্র বাক্য খরচ করতে হল।
একটা বিশ্রী পচা গন্ধ আজ দু-দিন ধরে আমরা…
বুড়ো মুখ ফিরে বিশ্বনাথের দিকে শান্ত চোখে তাকাল এবং কয়েক সেকেণ্ড পর আঙুল দিয়ে ফুচাকে দেখাল—মরে গেছে।
হতভম্ব বিশ্বনাথ ধাতস্থ হবার পর বলল, এটা কীরকম ব্যাপার হল? মরে গেছে তো ফেলে দেননি কেন?
থাক-না যতদিন খুশি ও থাক-না। বুড়ো আবার খবরের কাগজে মাথা ঝোঁকাল।
বিশ্বনাথ স্তম্ভিত। একটা মরা কুকুর নিয়ে এটা কী ধরনের আদিখ্যেতা? সে শুনেছে অনেকে ছেলে-মেয়ের মতনই কুকুরকে ভালোবাসে, মারা গেলে কান্নাকাটি করে, নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। খবরের কাগজে ছবি দিয়ে শোকও প্রকাশ করে। কিন্তু এটা কী করছে বুড়ো।
আপনি এই মরা কুকুরটাকে রেখে দেবেন। বিশ্বনাথ অবিশ্বাসভরে বলল।
হ্যাঁ। কেন, তাতে আপনার আপত্তি আছে।
অবশ্যই আছে। আপনি কি এখনও গন্ধটা পাচ্ছেন না?
না তো। বুড়ো মাথা ঘুরিয়ে ফুচার লাশটার দিকে তাকাল। না পাচ্ছি না। শান্ত গলায় আবার বলল।
আমরা নীচের থেকে পাচ্ছি আর আপনি… বিশ্বনাথ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল।
আমি কী করতে পারি?
কর্পোরেশনের ধাঙড় ডেকে, কিছু টাকা দিয়ে এটাকে নিয়ে যাওয়ায় ব্যবস্থা করতে পারেন।
না। বুড়ো খবরের কাগজটা চোখের সামনে তুলে ধরল। বসার ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল আর সে কোনো কথা শুনতে চায় না।
বিশ্বনাথ প্রায় ছুটেই ফিরে এল। তনু তখন ভাত খেতে শুরু করেছে। ওপরে কুকুরটা মরেছে, তারই পচা গন্ধ। ওটাকে ওইভাবেই রেখে দেবে বলল।
অ্যাঁ! থালার উপর তনুর হাতটা স্থির হয়ে গেল। মরাটাকে রেখে দেবে? কী বলছ তুমি!
তাই তো বলল।
ব্যস্ত হয়ে খাওয়া ফেলে উঠে কোনোক্রমে হাতটা ধুয়েই তনু সিঁড়ির দিকে ছুটল। বিশ্বনাথ ওকে অনুসরণ করে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
