এসব ব্যাপারে উনি খুব পার্টিকুলার ছিলেন, আপনাকে সাফ করার কথা বলতেই হত না। এখন অবশ্য…।
আপনার জ্যাঠামশাই বোধ হয় একা থাকতেই ভালোবাসেন।
বছর কুড়ি-বাইশ হল উনি এইরকম হয়ে গেছেন। স্বরটাকে গাঢ় করে রবি কিঞ্চিৎ বিষাদ মাখিয়ে বলল, ওঁর একমাত্র ছেলে ভান্তু, আমার থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো, নকশাল আমলে খুন হল। তারপর থেকেই উনি এমন হয়ে গেলেন।
বিশ্বনাথ নড়েচড়ে বসল। বলেন কী! ওঁর ছেলে খুন হয়েছে? কোথায়, কারা করল?
যে দরজা দিয়ে আপনি ঢোকেন ঠিক তার সামনে, সন্ধেবেলায়। আমরা শুধু একটা চিৎকার শুনেছিলুম। আট বার স্ট্যাব করে। ছুটে গিয়ে যখন পৌঁছোলুম তখন ওরা পালিয়ে গেছে। জ্যাঠামশাই দোতলার বারান্দা থেকে ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখেছিলেন।
নিজের অজান্তে বিশ্বনাথ মুখ তুলেই আবার নামিয়ে নিল। মোটা মোটা কাঠের কড়ি আর বরগা এ বাড়িতেও।
ভান্তুকে আমরাই মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাই, তখন আর বেঁচে নেই।
দেয়ালে এখনও আলকাতরার অস্পষ্ট একটা কথা পড়া যায়।
সে কী! এখনও আছে? বিস্ময়ের সঙ্গে ধাক্কাটা সঙ্গে সঙ্গে কাটিয়ে উঠে রবি বলল, সেদিন রাতেই লিখে দিয়ে গেছল, খুন নয় খতম। কথাটার মানে আজও বুঝি না। শুনেছি
জ্যাঠামশাই দোতলায় বসে থাকেন ওই দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে।
হ্যাঁ আমিও দেখেছি, কারণটা এতদিন জানতাম না। ভান্তু পলিটিকস করত কি?
বলতে পারব না। অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস নিয়ে পড়ত। মুখচোরা, বাবার মতোই রুগ্ন ছিল। জেঠিমা তো পাগলের মতো হয়ে গেলেন। ওঁদের মেয়ে টরন্টোয় কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে গিয়ে ওখানেই বিয়ে করে সেটল করেছে। সে এসে মাকে নিয়ে চলে যায়। মাঝে মাঝে বাবাকে টাকা পাঠাত। জেঠিমা ওখানেই মারা গেছেন, এখন বোধ হয় আর টাকা আসে না। রবি নিশ্চিত ভঙ্গিতে ছোটো করে মাথা নাড়ল। ওর কথা বলার ধরন থেকে বিশ্বনাথের মনে হল, লোকটি গল্প শোনানোর মতো কাউকে পেলে অনর্গল বকে যেতে পারে।
আপনার জ্যাঠামশায়ের একটা কুকুর আছে?
জানি, স্পিৎজ। খুব বুড়ো, মরার টাইম হয়ে গেছে।
ও অন্ধ।
রবি কথাটা কানে নিল না বরং নম্র করে জানতে চাইল, আপনার স্ত্রী কোথাও বোধ হয় পড়াতে যান?
প্রশ্নটা শুনে বিশ্বনাথের ভ্র উঠে গেল। রবি তাহলে তাদের সম্পর্কে খবর রাখে। চাকদায় একটা স্কুলে।
অতদূরে! তাই ফিরতে এত রাত হয়। আপনি তো সিরিয়াল লেখেন, আমার মেয়ের কাছে শুনেছি।
এইসময় চাকর এসে রবিকে জানাল, তাকে ভিতরে ডাকছে। রবি উঠে যাবার পরও বিশ্বনাথ কিছুক্ষণ বসে বুড়োর কথা ভাবল। ছাদে অ্যান্টেনা লাগানোর কাজ আর সে দেখতে গেল না, নিজের ঘরে ফিরে এল।
টিভি সেটটা রাখা আছে তার টেবিলে। ওটাকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
টেবিলেই থাক-না। তনু বলল। লেখার জন্য তা অনেকটা জায়গা থাকবে।
না থাকবে না। হঠাই রেগে উঠল বিশ্বনাথ। নিজেকে তার মনে হচ্ছে চারদিক থেকে চাপ-খাওয়া কুঁকড়ে-যাওয়া একটা মানুষ। অত অল্প জায়গায় আমি লিখতে পারব না।
একইরকম তিক্ত স্বরে তনু বলল, না পার তো সেটটাকে রান্নাঘরে রেখে এসো, শম্পা বসে বসে দেখবে।
সেই ভালো।
ওটা তোমার জন্যই আনা, আমার বা বাবানের জন্য নয়। শান্ত ধীর গলায় তনু বলল।
এত বড়ো ঘর অথচ এইটুকু একটা জিনিস রাখার জন্য আমার টেবিল ছাড়া কি আর জায়গা নেই।
নিজের চোখেই তো দেখতে পাচ্ছ, কী আছে কী নেই।
জানলা ঘেঁষে কালো ফিতের মতো অ্যান্টেনার তার ঝুলছে। গোল করে পাকানো তারের বাকিটা জানলা গলিয়ে ঘরের মধ্যে বাড়িয়ে এইসময় লোকটি বলল, ধরুন।
বিশ্বনাথ ধরল। লোকটা এবার ঘরে আসবে। নরম গলায় সে বলল, টেবিলেই এখন থাকুক, পরে দেখা যাবে।
সারাদিন দেখা আর হল না। টেবিলে যতটুকু জায়গা, বিশ্বনাথ সেইটুকুতেই কাজ চালিয়ে রাতে লেখায় বসল। বিকেল থেকে টিভি চালানো হয়েছে। সবাই বাংলা সিনেমা দেখেছে, তিন ভাষায় খবর শুনেছে। ওরা সবাই খুশি। ভোরে উঠতে হবে বলে রোজকার মতো দশটাতেই তনু শুয়ে পড়েছে বাবানকে নিয়ে।
মাথার মধ্যে ছুঁচ ফোটানোর মতো একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। দু-হাতের চেটোয় রগ চেপে বিশ্বনাথ মাথা নামিয়ে বসে আধ ঘণ্টার বেশি। একটা লাইনও লেখা হয়নি। বাড়ির সুইমিং পুলে পূর্ণিমার রাতে জলবিহার করতে নামবে বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের মালিক আর তার স্ত্রী। শিল্পপতির মৃত্যু ঘটিয়ে সাম্রাজ্য দখল করার জন্য চক্রান্ত করেছে শিল্পপতির মধ্যবয়সি স্ত্রী এবং তার তরুণ প্রেমিক। বিশ্বনাথ আপত্তি করে বলেছিল, এই ধরনের অবৈধ প্রেম আমাদের ভিউয়াররা পছন্দ করবে না। স্নেহ বলেছে, পছন্দ করাতে হবে। আমরা তো এই ধরনের প্রেমের বিরুদ্ধেই বলতে চাই। ওদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আনতে চাই বলেই…।
সুইমিং পুলের জলে গলায় চেনবাঁধা একটা কুমির গোপনে রেখে দেওয়া হবে। খিলখিল হেসে মজা করার জন্য স্ত্রী ধাক্কা মেরে স্বামীকে জলে ফেলে দেবে। তারপর একটা বীভৎস কান্ড। কুমিরে–ধরা একটা লোকের চিৎকার, জলের তোলপাড়, চোখের পাতা না ফেলে স্ত্রী কঠিনমুখে তাকিয়ে থাকবে এবং ধীরে ধীরে জল শান্ত হয়ে যাবে জলের রং বদলে যেতে থাকবে। এই দেখিয়ে ঘৃণার সঞ্চার করা যাবে। স্নেহ পাগল নয়, খুব ঠাণ্ডা মাথাতেই সে ঘটনাটা ছকেছে।
দৃশ্যটা কল্পনা করে বিশ্বনাথ নিজের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটা বুঝে নিতে গিয়ে দেখল
কোনো প্রকারের ঘৃণা তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে না। বরং মাথার মধ্যে একটা উঁচ অবিরত ফুটে চলেছে। ঘৃণাটাকে ঠিকমতো কবজা করতে না পারলে দৃশ্যটা সে লিখবে কী করে? অসহায়ভাবে বিশ্বনাথ মুখ তুলে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবাক হয়ে পড়ল। একী, কোনো শব্দ তো সে এখনও পেল না। টেবিলে রাখা রিস্টওয়াচে দেখল সওয়া বারোটা।
