বিশ্বনাথ আশা করেছিল তিরিক্ষে বা মেজাজি স্বরে দায় এড়িয়ে যাওয়ার মতো জবাব পাবে। তার বদলে ওকে এমন অনুতপ্ত হতে দেখে সে অপ্রতিভ বোধ করল।
কালকেই আমি রামবিলাসকে বলে জঞ্জাল সরাবার ব্যবস্থা করব।
এত ব্যস্ত হবার কী আছে। সে কোনো একদিন পরিষ্কার করে দিলেই হবে।
বিশ্বনাথ উঠে দাঁড়াল। ফুচা একইভাবে বুড়োর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো ফুলে উঠে কোটর থেকে অল্প বেরিয়ে, পুরোটাই ঘোলাটে সাদা। বোধ হয় ছানি পড়েছে। কুকুরেরও তো ছানি অপারেশন হয়। বলতে গিয়েও বিশ্বনাথ নিজেকে সামলে নিল। হয়তো চটে গিয়ে বলবে হ্যাঁ হয়। আপনি কি ছানি নিয়ে কথা বলার জন্য এসেছেন?
ফুচার পাশ দিয়ে এগোতে গিয়ে সে চেনটা মারিয়ে অল্প একটু হড়কে যেতেই পাথরের সঙ্গে লোহা ঘষার শব্দ হল। কর্কশ শব্দটায় তার দুই বাহুর রোমের গোড়া শিরশির করে উঠল। তার মনে হল একটা সাপ যেন সে মারিয়ে ফেলেছে।
মাঝে মাঝে একটু মেজাজ খারাপ করে, তখন বেঁধে রাখতে হয় বলে চেনটা গলায় লাগিয়েই রেখে দিয়েছি। কে আর খোলে-পরায়। বুড়ো নীচু গলায় বলল।
প্রসঙ্গটা বদলাতে বিশ্বনাথ বলল, আপনার তো ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি নেই, টিভি অ্যান্টেনা লাগাই কী করে সেটাই ভাবছি।
কেন, ও-বাড়ি দিয়ে ছাদে আসবেন। আমার ভাইপো রবিকে বলবেন ও আপনাকে ছাদে নিয়ে যাবে। বাড়ি পার্টিশনে সিঁড়িটা ওদের ভাগে পড়ল। আমার দিকে নতুন সিঁড়ি করে নেওয়ার কথা কিন্তু করা আর…
সিঁড়ি দিয়ে নামতে বিশ্বনাথ ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ফুচা বুড়োর মুখের দিকে তাকিয়ে একইভাবে বসে রয়েছে আর বুড়ো তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে।
জঞ্জাল পরিষ্কার করে দেবে বলল, তনু ফেরামাত্রই বিশ্বনাথ জানিয়ে দিল।
ভালো।
কুকুরটাকে ভালো করে দেখলুম … একদম অন্ধ, শুধুই বুড়োর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে। থাকে। গায়ে পোকা অজস্র। … রাতে যে শব্দ শুনি সেটা যে ওরই কাজ আজ বুঝলুম। গলায় একটা চেনবাঁধা মেঝের উপর দিয়ে টানতে টানতে যায়, আর পায়ের বড়ো বড়ো নখ, তাই থেকেই শব্দটা হয়। … বাবা বাঁচা গেল, যা টেনশন হয়! আমি ভাবতুম না-জানি অন্য কিছু…
অন্য কিছু মানে ভূতটুত?
স্কুলের শাড়িটা খাটের উপর বিছিয়ে তনু আলনা থেকে শাড়ি নিতে এগোল। শায়াটা ধবধবে, বিশ্বনাথ চোখ বুলিয়ে একটা কোনো দাগও দেখতে পেল না। এই বয়সে তনুর শরীর একটু ভারী হওয়ার কথা। কিন্তু সেই রোগাই রয়ে গেল।
প্রায় তাই-ই। সিনেমায় দ্যাখোনা, পোড়াবাড়িতে কুয়াশা আর ঝিঝির ডাকের সঙ্গে কতরকম শব্দ আর গান হয়, অনেকটাই সেইরকম লাগত। কথাটা বলার সঙ্গেই বিশ্বনাথের দৃষ্টি থেকে তনুর নিতম্বের বক্র ভাঁজ অদৃশ্য হয়ে গেল শাড়ি জড়িয়ে নেওয়ায়। আধময়লা ছাপাশাড়ি। সাশ্রয়ের জন্য হপ্তায় এক দিন, রবিবার, তনু সারা পরিবারের কাচাকাচির কাজ করে, ইস্ত্রি করে স্কুলের জন্য মাড় দেওয়া শাড়ি। ছুটির দিনেও নিজেকে ও ক্লান্ত করতে হন্যে হয়ে ওঠে।
শম্পা চা দিয়ে গেল দুজনকে। খাট থেকে শাড়িটা পাট করতে করতে তনু বলল, তুমি আগে গা ধুয়ে এসো।
টিভি শনিবার আনব। রোববার সকালে প্রােগ্রাম চলার সময় ওদের লোক এসে অ্যান্টেনা লাগাবে। বুড়ো বলল ও-বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে ছাদে যাওয়া যাবে।
ভালো। তার আগে জঞ্জালগুলো পরিষ্কার হোক তো।
বিশ্বনাথ রাতে সিলিংয়ের দিকে মুখ করে শুয়ে অপেক্ষা করছিল। সরসর শব্দটা শুরু হতেই সে আজ এর মধ্যে কোনো রহস্য অনুভব করল না। ওপাশ ফিরে শোয়া তনুকে কাঁধ ধরে হ্যাঁচকা টানে সোজা করে দিতেই সে কে, কে বলে উঠে বসতে গেল।
কে আবার, আমি।
বিশ্বনাথ বুকে ছোট্ট ঠেলা দিয়ে ওকে শুইয়ে দিল। মিনিট পাঁচেক পর শাড়িটা ঊরু থেকে নামিয়ে, বিড়বিড় করতে করতে তনু আবার পাশ ফিরে শুল।
রবিবার অ্যান্টেনা লাগাবার লোকটিকে নিয়ে বিশ্বনাথ হাজির হল ও-বাড়িতে। বরফিকাটা তকতকে পাথরের মেঝে, দরজা-জানলায় উজ্জ্বল রং, আসবাবে ধুলো নেই অথচ সবই প্রাচীন। বুড়োর ভাইপো রবির কথাবার্তা মার্জিত ও নম্র। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স। সাদা পাজামা আর গেঞ্জিটা তনুর শায়ার মতোই নিদাগ। বিশ্বনাথের অস্বস্তি ছিল হয়তো ছাদে যেতে দেবে না। জ্যাঠার সঙ্গে শরিকি সম্পর্কটা কেমন রয়েছে সেটা তার জানা নেই। সাধারণত ভালো থাকে না।
নিশ্চয় যাবেন, এতে আপত্তি করার কী আছে। ওদিকে ছাদটা তো জ্যাঠামশায়েরই।
জলছাদের সুরকির আস্তরণ উঠে গিয়ে খোয়া বেরিয়ে পড়েছে। বৃষ্টির জল বেরোবার নলের মুখে আবর্জনা। পাঁপড়ের মতো মড়মড়ে হয়ে রয়েছে শুকিয়ে-যাওয়া শ্যাওলা। গাছের পাতা, কাগজ, কাঠকুটোয় ঝাঁঝরির মুখ বন্ধ। পলেস্তারা-খসা ইট বহু জায়গায় বেরিয়ে হাঁটুসমান একটা পাঁচিল দিয়ে ছাদটা ভাগ করা।
আমরা মাঝে মাঝে নর্দমার মুখ পরিষ্কার করে দিই। বৃষ্টির জল বসে বসে জ্যাঠামশায়ের পোর্শানটার যা অবস্থা হয়েছে।
চোখে জ্বালা-ধরানো রোদে দাঁড়িয়ে তারা। লোকটি অ্যান্টেনা লাগাবার কাজে ব্যস্ত। ঘণ্টা খানেক সময় তো লাগবেই। বিশ্বনাথের মনে হল, এখানে তার দাঁড়িয়ে কাজ দেখার কোনো দরকার নেই।
এই রোদে দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ, আপনি নীচে গিয়ে বসতে পারেন, ততক্ষণ ও কাজ করুক।
বিশ্বনাথ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এক তলায় বসার ঘরে গোল একটা মেহগনির টেবিল ঘিরে চারটে কাঠের চেয়ার। সবই পুরোনো আমলের। একটা লোক সামনের চেয়ারে বসে, কিছু একটা বিষয় পেড়ে কথা তো বলতে হবে, তাই বিশ্বনাথ শুরু করল, আমার ঘরের বাইরে বহুদিনের জঞ্জাল জমে ছিল। ওনাকে বলেছিলুম তাই আজ সাফ হচ্ছে।
