হোক, তবু এখানে আমি বাবানকে মানুষ হতে দেব না। এত ইতরোমি আর নোংরা কথাবার্তার মধ্যে ও একটা অমানুষ হয়ে উঠবে। ওকে আমি ভালোভাবে মানুষ করব, ওকে ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াব। কঠিন গলায় তনু জানিয়ে দিয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে সংসার পেতে সে ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে না। বাপ-ঠাকুরদার বাড়ি ছেড়ে আসতে বিশ্বনাথের কষ্ট হয়েছিল কিন্তু তনুর উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার কষ্টটাকে ঘাড় ধরে নুইয়ে দিয়েছিল। এখন আর ব্যথা করে না।
রাত্রে লিখতে বসে বিশ্বনাথ অনেকক্ষণ পর আবিষ্কার করল সে এক লাইনও লেখেনি, উৎকর্ণ হয়ে দোতলা থেকে সরসর আর ছপ ছপ শব্দ দুটো কখন নেমে আসবে তার জন্যই সে অপেক্ষা করছে। বার বার সে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। কোনো শব্দ নেই। অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে হতাশ হয়ে পড়ল। আজ আর লেখা হবে না, এমন এক ধারণায় পৌঁছে সে আলো নিভিয়ে শুয়ে বাঁ-হাতটা অঘোরে-ঘুমোনো তনুর কোমরের উপর আলতো রাখল। বিশ্বনাথ আশা করল তনু নড়েচড়ে উঠবে। কিছুই হল না। আঙুলগুলো কোমরে চেপে বসাতে যাচ্ছে আর তখনই দোতলায় সরসর শব্দটা চলতে শুরু করল। আঙুলগুলো প্রথমে অসাড় হল তারপর নেতিয়ে পড়ল। সরসর শব্দের সঙ্গে ছপ ছপটাও যথারীতি দালানের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত তারপর ঘরের মধ্যে, থেমে থেমে যাতায়াত শুরু করল। বিশ্বনাথের মনে হল, বাসি ভাতের মতো তার শরীর কড়কড়ে ঠাণ্ডা লাগছে। তনুর কোমর থেকে হাতটা তুলে নিয়ে সে স্থির করল, বুড়োর সঙ্গে কাল অবশ্যই কথা বলবে।
পরদিন সকালে সে সময় করে উঠতে পারল না। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে নিজের দরজায় না থেমে সে সোজা দোতলার সিঁড়ি ধরল। বাঁকটা নিয়ে সিঁড়ি ধরে উঠতে উঠতেই সে দেখল বারান্দায় মাঝখানে কুকুরটা উবু হয়ে সামনের পায়ের থাবা দুটো পাশাপাশি রেখে বসে। সিঁড়ির দিকে মুখ করে সোজা এমনভাবে তাকিয়ে যেন তার জন্যই প্রতীক্ষা করছে। বারান্দার অল্প পাওয়ারের বালবটা কুকুরটার পিছনে, তাই মুখটা বিশ্বনাথের কাছে স্পষ্ট লাগল না। চেয়ারে বসে চশমাপরা বুড়ো মাথা ঝুঁকিয়ে একটা বই পড়ছে। সে থমকে গেল।
আর দুটো ধাপ উঠলেই দালান। কুকুরটার স্বভাব তার জানা নেই, পাশ দিয়ে যেতে গেলে যদি কামড়ে দেয়? বিশ্বনাথ গলাখাঁকারি দিল বুড়োর মুখ ফেরাবার জন্য। মুখ ফিরল। বুড়ো যখন বোঝার চেষ্টা করছে লোকটি কে, তখন বিশ্বনাথ বলল, আমি আপনার ভাড়াটে, নীচে
চশমাটা খুলে ঠাণ্ডা মৃদুস্বরে বুড়ো বলল, দাঁড়িয়ে কেন, আসুন।
আপনার কুকুরটা।
ও কিছু বলবে না, পাশ দিয়ে চলে আসুন। চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বুড়ো বলল। কিছু কি দরকার আছে?
হ্যাঁ, একটা কথা বলার জন্য এসেছি। বাকি দুটো ধাপ এখনও ওঠেনি। এখনও সে পুরো ভরসায় পৌঁছোতে পারেনি। কুকুরটা একটা পাথরের মূর্তির মতো বসে, একইভাবে সিঁড়ির দিকে সোজা তাকিয়ে। ভয়ে ভয়ে বিশ্বনাথ ওর চোখ দুটো লক্ষ করল। ছায়াঢাকা মুখের মধ্যিখানে দুটো অনুজ্জ্বল মার্বেলের গুলি যেন বসানো রয়েছে। মনে মনে সে বলল, তবে কি ভুল দেখেছিলাম সেদিন।
ঘর থেকে একটা মোড়া এনে দালানে রেখে বুড়ো বলল, আসুন আসুন, ভয়ের কিছু নেই। জীবনে ও কখনো কাউকে কামড়ায়নি।
বিশ্বনাথ যখন আড়ষ্ট ভাবে পা টিপে কুকরটিকে অতিক্রম করছে বুড়ো তখন বলল, ফুচা দেখতে পায় না, ও অন্ধ।
বিশ্বনাথ ধাক্কা খেল কথাটা শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে সে ফুচার দিকে তাকিয়ে রইল। একইভাবে ও বসে রয়েছে সিঁড়ির দিকে মুখ করে। বসার ভঙ্গিতে রয়েছে যেন কারুর জন্য অপেক্ষা। নিশ্চয় তার জন্য নয়। সে যে আজ দোতলায় উঠে আসবে ফুচার সেটা জানার কথা নয়।
মোড়ায় বসে বিশ্বনাথ বলল, রোজ রাতে ওপরে একটা সরসর, ছপ ছপ শব্দ শুনতে পাই।
বুড়োর ভ্রু কুঁচকে উঠল। চোখ দুটো সরু করে একটু রুক্ষ স্বরে বলল, তাতে কী হয়েছে? কোনো অসুবিধে হচ্ছে নাকি?
বিশ্বনাথ সাবধান হয়ে গেল। চটাচটির মধ্যে কোনোক্রমেই সে যাবে না। তেমন কিছু নয়, তবে কৌতূহলও হয়।
বুড়ো চাপা গলায় নরম সুরে ডাকল, ফুচা, ফুচা …
এখানে আয়। ফুচা মুখ ফিরিয়ে কিছুক্ষণ পিছনে তাকিয়ে থেকে মাথা নামিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল বুড়োর দিকে। গলার চেনটা মেঝেয় ঘষড়াননার দরুন যে-শব্দটা হচ্ছে বিশ্বনাথ সেটা চিনতে পারল। বড়ো বড়ো নখগুলো ওর প্রত্যেক বার পা ফেলাতে যে শব্দ তৈরি করল, সেটা বুঝে নিতেও তার অসুবিধে হল না।
ফুচা কি সারারাতই ঘুরে বেড়ায়?
হ্যাঁ। এটা ওর অনেক দিনের অভ্যেস। আজীবন একা একাই ওর কেটেছে। জীবনের শেষ সীমায় এখন ও।
বুড়োর থেকে তিন হাত দূরত্বে উবু হয়ে মুখ তুলে ফুচা কথাগুলো শুনছে। বিশ্বনাথ কয়েকটা কালো পোকা ওর চোখের কোণে, কানের পাশে, হাঁটুর কাছে দেখতে পেল।
পোকা হয়েছে, খুব কষ্ট পায় নিশ্চয়।
হয়তো পায়।
পোকা মারার জন্য তো পাউডার পাওয়া যায়।
বুড়ো তীব্র চোখে তাকিয়ে বলল, তা যায়। আপনি কি পোকা নিয়ে কথা বলার জন্য এসেছেন?
বিশ্বনাথ আর এক বার সাবধান হল।
ওপর থেকে আমার জানলার ধারে যেসব জিনিস পড়ে তাতে একটু অসুবিধে হচ্ছে। কী পরিমাণ জঞ্জাল, কী ধরনের ময়লা জমে উঠেছে সেটা যদি দয়া করে এক বার দেখে আসেন। যথাসম্ভব বিনীত স্বরে সে বলল।
সচকিত বুড়ো সোজা হয়ে বসল। জঞ্জাল? আপনার জানলার ধারে! ছি ছি ছি, এটা আমারই দোষ। বহুদিনের অভ্যেস তো, নীচে কেউ থাকত না বলে তাই .. বুড়ো দুই তালু চেপে বলল, আমারই অন্যায়।
