স্নান করতে যাবার আগে সে বাইরে গিয়ে ঘরের পিছন দিকটা দেখতে গেল। বুড়োকে বলার আগে ব্যাপারটা দেখে রাখা উচিত। যা দেখল তাতে বিরক্ত হতে হতে মাথা গরম হয়ে উঠল। সরু জমিটা এতরকম জঞ্জাল, আগাছা, ভাঙা ইট-রাবিশে ভরা যে পরিষ্কার করতে ময়লা ফেলার অন্তত তিনটে হাতগাড়ির দরকার হবে। তনু মিথ্যা বলেনি, জানলার গায়েই রোগের ডিপো! বিশ্বনাথের মনে হল, এটা তারই ত্রুটি। যতক্ষণ সে ঘরে থাকে শুধু লেখার চিন্তা নিয়ে সংসারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াতেই ব্যস্ত থাকে। জানলার বাইরে কী জমা রয়েছে সেটা তারও তো লক্ষ করা উচিত ছিল। বাবানের স্বাস্থ্যের কথাটাই আগে ভাবা দরকার। বুড়োকে আজ সন্ধ্যা বেলায়ই সে বলবে দু-দিনের মধ্যে যেন সে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করে। শুধু ঘরভাড়া দিয়েই বাড়িওয়ালার কর্তব্য যে শেষ হয় না, এটা ওঁকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার।
বাড়ি ফিরতে বিশ্বনাথের একটু বেশিই দেরি হল। এক বিদেশি ওষুধ কোম্পানিতে সে মার্কেটিং ম্যানেজারের স্টেননা। তা ছাড়া সে চিত্রনাট্য লেখে টিভি সিরিয়ালের জন্য। অফিস ছুটির পর ভবানীপুরে স্নেহময়ের বাড়িতে গেছল চিত্রনাট্যের কিছু অংশ দেখাবার জন্য। স্নেহর সঙ্গে কলেজে পড়ার সময় তার পরিচয়। কলেজের বড়ো ঘরটায় ইউনিয়নের কালচারাল কমিটির উদ্যোগে বছরে তিন-চার বার যেসব অনুষ্ঠান হত তাতে দু-বার বিশ্বনাথের লেখা একাঙ্ক হাসির নাটক অভিনীত হয় স্নেহর পরিচালনায়। সবাই খুব হেসেছিল। বিকম পাস করার পর বিশ্বনাথ নাট্যকার হবার শখটা আর লালন করেনি ভেঙে পড়া সংসারটাকে মেরামত করার জরুরি তাগিদে। এর বছর দশেক পর পাড়ার এক বন্ধুর বাড়িতে সে ওয়ান-ডে ক্রিকেট ম্যাচ টিভিতে দেখতে যায়। ম্যাচ শেষ হবার পর একটা ডকুমেন্টারি হচ্ছিল প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে। সেটা শেষ হতেই বিশ্বনাথ পাঁচ-ছ সেকেণ্ডের জন্য একটা নাম দেখেছিল : পরিচালক স্নেহময় মান্না। তার মনে হল এই লোকটি তার সহপাঠী স্নেহ ছাড়া আর কেউ নয়। অতঃপর সে খুঁজে বার করে স্নেহকে, এবং তার স্ক্রিপ্ট লেখক হয়ে যায়। কয়েকটা ডকুমেন্টারির পর ছোটোগল্পের একটি তেরো পর্বের সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখে বিশ্বনাথ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। এখন সে স্নেহের সঙ্গে আলোচনা করে অস্ট্রেলীয় একটি সিরিয়ালকে তেরো পর্বে বঙ্গীকরণের কাজে ব্যস্ত। এজন্য প্রায়ই তাকে ভবানীপুরে স্নেহের বাড়িতে যেতে হচ্ছে সিরিয়ালটির ভিডিয়ো ক্যাসেট দেখার জন্য।
ভবানীপুর থেকে তার এবং চাকদা থেকে তনুর ফেরাটা প্রায় একই সময়ে ঘটল। বারান্দায় রেলিঙের ধারে বুড়োটা চেয়ারে বসে মাথা ঝুকিয়ে কিছু-একটা পড়ছে, বাড়ি ঢোকার সময় এটা দুজনেই দেখেছে। বিশ্বনাথই শুরু করল :
রাত হয়ে গেছে, আজ থাক। বুড়োকে কাল কি পরশু বলব।
বলার সময় একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোলো। ঝগড়া করে বোস না। খাটে পা ঝুলিয়ে চিত হয়ে শুয়ে তনু বলল।
চেয়ারে-বসা বিশ্বনাথ মুখ ঘুরিয়ে তনুর দেহের মাঝামাঝি অংশটায় চোখ রেখে বলল, পাগল নাকি। এমন নিরিবিলি পরিবেশ, ভিড়ভাট্টা চ্যাঁ-ভ্যাঁ নেই, ঝুটঝামেলা নেই, এইরকম জায়গায় ঝগড়া করে অশান্তি টেনে আনতে যাব কেন? এই একটা ঘর মানে তো দুটো ঘর, সঙ্গে অতবড়ো দালান, এই ভাড়ায় কলকাতায় এখন কোথায় পাব। বুড়োমানুষ, একা, ওর সঙ্গে মানিয়ে আমাদেরই চলতে হবে।
বুড়োকে কখনো দোতলা থেকে নামতে দেখেছ? তনু মুখ ফিরিয়ে স্বামীর দিকে তাকাল এবং খোলা পেটের উপর শাড়িটা টেনে দিল। বিশ্বনাথের চোয়াল শক্ত হয়েই আবার শিথিল হল। চোখ দেখেই ও বোধ হয় বুঝতে পারে স্বামী কী চায়। তার মনে হচ্ছে রাতে তনু বলবে, আজ থাক, বড্ড ক্লান্ত। তারপর পাশ ফিরে বাবানকে জড়িয়ে ধরে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়বে। তনু অবশ্য সত্যিই ক্লান্ত থাকে।
লক্ষ করিনি। কাজের লোকজন নেই যখন নিশ্চয় বেরোয়। তুমি দেখেছ?
বেরোয়। শম্পা দেখেছে, বেলা দশটায় থলি হাতে বেরোয়। কালোয়ারের দারোয়ানটা কেরোসিন এনে দেয়। বুড়ো নিজের হাতে রান্না, কাচা, ঘরমোছা সব কাজ করে। … খুব কিপটে। তনু স্বামীর দিকে তাকাল কিছু-একটা মন্তব্য আশা করে।
কুকুর পোষার শখ আছে। বিশ্বনাথ মন্তব্য না করে উঠে পড়ল। এখন স্নান করে, কিছু খেয়ে বিছানায় চিত হয়ে সকালে চোখ-বুলোনো খবরের কাগজটা সে খুঁটিয়ে পড়বে।
টিভি সেট-এর কী হল, খোঁজ নিলে? তনু উঠে বসে আলগা স্বরে জানতে চাইল। প্রােগ্রাম গুলো তো তোমার দেখা দরকার।
দেখার আর কী আছে। আমার কাজ গল্প তৈরি করা আর সাজানো। আসল কাজটা তো করবে স্নেহ।
তবু, খোঁজ নাও।
নিয়েছি। ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট দু-হাজারের মধ্যে, কালার চোদ্দো হাজার।
চোদ্দো! অত টাকা দিয়ে তো নেওয়া সম্ভব নয়।
বিশ্বনাথ কথা না বাড়িয়ে স্নানে চলে গেল। সে জানেই তনু চোদ্দো হাজার টাকা খরচে আপত্তি জানাবে। আপত্তি তার নিজের নেই বটে কিন্তু টাকার অঙ্কটার সঙ্গে শখের বনিবনা যে সম্ভব নয় অসহায়ভাবে সেটা তাকে মেনে নিতে হয়েছে। তারা দুজনেই টাকা জমাচ্ছে একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য। কলকাতার আশেপাশে ছোটো দু-ঘরের ফ্ল্যাট তিন লাখের কমে পাওয়া যাবে না এটা তারা জানে। আজ পর্যন্ত দুজনে যা জমিয়েছে আর নানান জায়গা থেকে ধার বা আগাম হিসেবে যা সংগ্রহ করতে পারবে, সব মিলিয়ে যোগ করে দেখেছে আধখানা ফ্ল্যাটের মালিক হবার মতো অবস্থায় তারা এখন রয়েছে। সুতরাং দু-রকমের টিভি সেট-এর মধ্যে বারো হাজারের ব্যবধানটা তাদের কাছে মাটির মেঝের সঙ্গে মোজাইক টালির মতো। টিভি সেট কেনার বাসনাটা এতদিন তারা দমন করেই রেখেছিল। কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ থেকে বাড়তি আয়ের পথ খুলে যাওয়ায় তারা পরিজনে-ঠাসা পৈতৃক বাড়ির ছোটো একটা ঘর, অবিরাম চেঁচামেচি এবং নিত্য বিবাদের কবল থেকে রেহাই পেতে বেরিয়ে এসেছে। এজন্য প্রতি মাসে আটশো টাকা বেশি খরচ হবে। বিশ্বনাথ তখন সেটা তনুকে বলেছিল।
