কালোয়ারের লাগানো একটা ষাট পাওয়ারের বালব চালার বাইরে জ্বলছে। তাইতে অন্ধকার ঘঘাছে না তবে চেনা জায়গাটা চেনা যায়। সামনের দেওয়ালে দুটো হুকে কাপড় মেলতে দেওয়ার নাইলন দড়িটা যেখানে ঝুলে পড়েছে সেখানে আলকাতরায় লেখা ঝাপসা হয়ে-যাওয়া খতম শব্দটাকে বিশ্বনাথ এখন চিনতে পারছে এইজন্যই, ওটা ওখানে যে রয়েছে তা জানে বলেই। নয়তো সে দূর থেকে আসা ষাট পাওয়ারের আলোয় খতম-কে বুঝে উঠতে পারত না। কলকাতার বহু দেওয়ালে এই শব্দটা একসময় সে দেখেছে, এখন আর দেখতে পায় না।
দরজা থেকে বেরিয়ে খতম-এর কাছাকাছি এসে ঘুরে উপর দিকে সে তাকাল। শব্দ কীভাবে এবং কে তৈরি করছে এটাই সে জানতে চায়। ঢালাই লোহার ধূসর নকশাদার রেলিং, দু-তিন জায়গায় লোহা অদৃশ্য। বিশ্বনাথ বারান্দায় দুই প্রান্তে রেলিং-এর উপর দিয়ে কয়েক বার দৃষ্টি টানল। রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে কিছুই গোচর হল না। কান পেতেও কোনো শব্দ পেল না। পাহারাদারটা খাটিয়ায় ঘুমোচ্ছে দেখে সে বাড়ির মধ্যে ঢোকার জন্য চার-পাঁচ পা এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল। কেন জানি তার মনে হল বারান্দার কেউ রয়েছে। আর এক বার বারান্দার দিকে তাকাবার ইচ্ছাটা সামলাতে না পেরে সে মুখ তুলল।
একটা সাদা ছুঁচোলো মুখ বারান্দার ভাঙা রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে, ঠিক তার মাথার উপর। কলিজাটাকে এক বার কে যেন কচলে দিয়ে ছেড়ে দিল। বিশ্বনাথের প্রায় এক মিনিট সময় লাগল ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে। সে ভূতপ্রেত, দৈত্যদাননা প্রভৃতি ব্যাপারে বিশ্বাসী নয়। মাথার কয়েক হাত উপরে, নিশুত আধা অন্ধকারে অপ্রত্যাশিত একটা সাদা জন্তুর মাথা দেখতে পেয়ে সে ভয় পেল। নীচের দিকে মাথাটা নামিয়ে জন্তুটা তার দিকেই যেন তাকিয়ে। মাথাটা কয়েক সেকেণ্ড রেলিংয়ের বাইরে থাকার পর অদৃশ্য হল। বিশ্বনাথ ছুটে ভিতরে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসার পর মুখ তুলে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে সে নিজের মনে বলল, কুকুরটার চোখ দুটো কী ভীষণ জ্বলজ্বল করছিল।
সেই প্রথম দিন অ্যাডভান্সের টাকা দিতে এসে বুড়োর চেয়ারের পিছনে সে কুকুরটাকে দেয়ালঘেঁষে ঘুমোতে দেখেছিল। তাদের কথাবার্তার শব্দে ওর ঘুম ভাঙেনি। বড়ো সাদা লোম কিন্তু নোংরা। এক নজরেই বোঝা যায় ওকে কখনো স্নান করানো হয় না, কোনো কালে চিরুনিও পড়েনি। লেজের ডগায় চটা পড়ে একটা ডেলা হয়ে রয়েছে। কোমরের দিকে পিঠের উপর লোম গুলো চর্মরোগের চুলকানিতে কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলা। জায়গাটায় কাঁচা দগদগে ঘা। পাঁজরের লোম উঠে যাওয়ায় গোলাপি রঙের চামড়া দেখা যাচ্ছে। ওর চার পায়ের নখ কিন্তু বিশ্বনাথকে অবাক করেছিল। সেগুলো প্রায় ইঞ্চি দুয়েক লম্বা। তখন এক বার মনে হয়েছিল এত বড়ো নখ নিয়ে চলাফেরা করে কী করে? সে আরও দেখেছিল কুকুরটার বকলসের বদলে একটা কাপড়ের ফালি গলায় বাঁধা আর তাতে লাগানো রয়েছে একটা লোহার চেনা চেনটা মেঝেয় পড়ে আছে। কুকুরটি পুরুষ, বৃদ্ধ আর তার প্রভুর মতোই রুগ্ন।
পরদিন সকালে তনু স্কুলে যাবার জন্য যখন শায়ার উপর শাড়িটাকে পাক দিয়ে আঁচলটা পিঠে ঝোলাতে ব্যস্ত, বিশ্বনাথ তখন ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে বলল, রাতে একটা সরসর শব্দ হয় ওপরের মেঝেয়, শুনেছ কি?
রাতে! কখন?
এই বারোটা নাগাদ।
তখন তো ঘুমে কাদা, শুনব কী করে। এই বলে নাভির উপরে পাট-করা শাড়ির গুছিগুঁজতে খুঁজতে তনু কৌতূহলী চোখে তাকাল। বিশ্বনাথ খুবই পছন্দ করে তনুর ক্ষীণকটি। মা হবার পর মেয়েরা দেহের ছন্দ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে, তনু পড়েনি। ওর চরিত্রের কাঠিন্য দেহতেও বিস্তৃত।
অত রাতে মাথার উপর গা-শিরশির-করা একটা শব্দ, তার সঙ্গে আর একটা ছপ ছপ শব্দ রীতিমতো ভয় লাগিয়ে দেয়।
কীসের শব্দ, বুড়োটা পায়চারি করছিল?
তাই জানতেই তো কাল রাতে বাইরে বেরিয়েছিলুম। বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখি রেলিং থেকে মুখ বার করে কুকুরটা আমাকে দেখছে।
তনুর উদবিগ্ন চোখ হাতঘড়ি হয়ে শম্পার কোলে বাবানের মুখের উপর পড়ল। ঠিক তিনটের সময় ওকে মুসুম্বির রস করে খাওয়াবি…দাদা না ফেরা পর্যন্ত বাড়ির বাইরে যাবি না। … হ্যাঁ তারপর, কুকুরটা দেখছে বললে…
মনে হল চোখ দুটো জ্বলছে।
অন্ধকারে জন্তুজানোয়ারের চোখ অমন দেখায়।
বউদি, দাদাকে সেই কথাটা বলেছ। শম্পা মনে করিয়ে দিল।
কোন কথা?
ওপর থেকে বাড়িওয়ালা আমাদের জানালার পাশে কুকুরের গু ফেলে।
হ্যাঁ, এই এক বিশ্রী ব্যাপার করে বুড়োটা, এটা নিয়ে ওকে বলা দরকার। হাগাতে-মোতাতে রাস্তায় নিয়ে যেতে পারে তো! জানালার ধারে এইসব নোংরা জমলে রোগভোগ হতে কতক্ষণ। তুমি এক বার ওকে বলো। হাতব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে, রামকৃষ্ণের ছবির সামনে চোখ বন্ধ করে সেকেণ্ড পনেরো মাথা নামিয়ে তনু দাঁড়িয়ে থাকল। হাতঘড়িটা আর এক বার দেখেই সে চটি পরে নিয়ে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে গেল। শম্পা পিছু নিল বাবানকে কোলে নিয়ে, সদর দরজা থেকে বাবান তার মাকে টা-টা করবে।
তনিমা বাস ধরে শেয়ালদা স্টেশন যাবে। ন-টা আটাশের কৃষ্ণনগর লোকাল ধরে যাবে চাকদা। দেড় ঘণ্টা ট্রেনের পর কুড়ি মিনিট ভ্যান রিকশায় সহজপুর। সীতানাথ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম ক্লাস সাড়ে এগারোটায়। স্কুল ছুটির পর ছ-টি ছেলে-মেয়েকে সে অঙ্ক আর ফিজিক্যাল সায়েন্স পড়ায় এক ঘণ্টা। এটা সে করে যাতায়াতের আর যৎসামান্য খাওয়ার জন্য খরচটা তুলে নিতে। সাতটা এগারোর কৃষ্ণনগর ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায়শই রাত সাড়ে নটা হয়। ক্ষুকাতর, অবসন্নতায় বসে যাওয়া মুখ নিয়ে সে মোটামুটি বারো ঘণ্টা বসবাসের জন্য বাড়ি ফেরে। বিয়ের আগে থেকেই সে জীবনযাপনের এই প্রণালীর সঙ্গে সড়োগড়ো। বিশ্বনাথ ওর জন্য কষ্টবোধ করে, ওকে সমীহ করে, ভয়ও পায়।
