এখন শৈলেন রোজ রাতে ঘুমোবার আগে কুলুঙ্গির দিকে তাকায়। বউটি ফুলদানিটা দিতে চেয়েছিল, ফিরিয়ে নিলে ভালো হত কি হত না, এই সমস্যাটা ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাকে ছটফট করায়। সে ডায়েরি লেখার চেষ্টা করেছিল। আমার বিবাহ হয় ছাব্বিশ বছর আগে, এর বেশি লেখা আর এগোতে পারেনি।
বুড়ো এবং ফুচা
ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করার প্রথম কয়েকটা দিন শব্দটা সে টের পায়নি। বাবান, তনু আর কাজের মেয়ে শম্পা ঘুমিয়ে পড়ার পর বিশ্বনাথ লিখতে বসে। শোবার ঘরটা আজকালকার সাধারণ ঘরের প্রায় আড়াই গুণ। এককোণে কাঠের ছোটো টেবিলে দুটো অভিধান, কলম রাখার জন্য একটা নকশাকাটা পিতলের গ্লাস, লেখার প্যাড, লেখা পাতাগুলো জমা করার একটা ফাইল, কয়েকটা দরকারি বই, সবই গুছিয়ে রাখা। অনাবশ্যক একটি জিনিসও সে টেবিলে রাখে না।
ঝরাপাতার উপর দিয়ে সাপ চললে যেমন শুনলেই শিরশির করে ওঠে গায়ের চামড়া, শব্দটা সেইরকমই। বিশ্বনাথ অবশ্য ঝরাপাতার উপর দিয়ে সাপ কেন কোনো সরীসৃপকেই চলতে দেখেনি বা চলার শব্দও শোনেনি। ছোটোবেলায় একটা অ্যাডভেঞ্চার বইয়ে পড়েছিল, খরখর, সরসর শব্দ করে সাক্ষাৎ মৃত্যু যেন এগিয়ে আসছে গোপনে। এটা এখনও তার মাথার মধ্যে গেঁথে আছে। মুখটা তুলে কড়িকাঠের দিকে তাকায়, গত শতাব্দীর বাড়ি। ছাদটা এখনকার ঘরের প্রায় দ্বিগুণ উঁচুতে। পাখা ঝোলাবার জন্য পাঁচ ফুট লম্বা রড় কিনে দু-ধারে প্যাঁচ কাটিয়ে আনতে হয়েছে। মোটা মোটা পাঁচটা কাঠের কড়ি আর গোটা ষাটেক বরগায় ভর দিয়ে রয়েছে দোতলার ঘরের মেঝেটা। সেটা বরফির মতো সাদা আর কালো পাথরে ঢাকা। অনেকগুলো পাথর ফেটে গেছে। ফাটলে ময়লার দাগটানা। তাদের নীচের ঘরটার মেঝেও হুবহু একই দশায় ফাটা, পাথরের ফাঁকে নোংরা জমে আছে। উপর-নীচের ঘর দুটো আয়তনে উচ্চতায় একই রকমের।
বিশ্বনাথ সরসর শব্দটা শুনেছিল রাত বারোটা নাগাদ। ঠিক মাথার উপর ঘরের একধার থেকে অন্যধার তারপর দরজা দিয়ে পৌঁছোল লম্বা বারান্দাটায়। কয়েক সেকেণ্ড থেমে বারান্দার অন্য প্রান্তে সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত গিয়ে অবশেষে আবার ঘরে ফিরে আসে। সাপ চলার শব্দের সঙ্গে ছিল ছপ ছপ বাড়তি একটা অস্পষ্ট শব্দও। নৌকার দাঁড় জলে পড়ার মতো এই শব্দটা। বিশ্বনাথ নৌকায় গঙ্গা পারাপার করেছে বলেই সেইরকম মনে হল শব্দটাকে। সর্ব অর্থেই প্রায় তখন নিশুতি। পার্টিশন করা পাশের সরিকি বাড়িতে রোজ রাতে কেউ একজন মোটরে ফেরে। বন্ধ করার আগে দু-তিন বার ইঞ্জিনটাকে গোঁ-গোঁ করিয়ে নেয়। সেটা করা হয়ে গেছে। আশেপাশের টিভি সেটগুলো বন্ধ। যদি কোনো রিকশার চাকা রাস্তার গর্তে পড়ে ঘটাং ঘট করে ওঠে সেটা বরং এইসময় সজীব লাগে। কিন্তু মাথার উপরের এই শব্দটা সিলিং থেকে হিমের মতো নেমে এসে শিরদাঁড়ায় যে অনুভূতি দিচ্ছে, এটা তার ভালো লাগছে না। হঠাৎই খরখর সরসর করে সাক্ষাৎ মৃত্যু শব্দ ক-টা মনের মধ্যে কেন যে ঝিলিক দিল তার কোনো কারণ সে নিজের কাছে দর্শাতে পারল না। সে মুখ তুলে শব্দটা কে করছে সেটাই বুঝতে চেষ্টা করল।
উপরে থাকে একটা বুড়ো। এই বাড়ির মালিক। মাঝারি উচ্চতায় শীর্ণ ছোটোখাটো দেহ। পাতাকাটা কাঁচা পাকা হালকা চুল। টানা সরু চোখ এবং একটু বেমানান লম্বা নাক। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে ট্রেসিং কাগজের মতো পাতলা। বিশ্বনাথ এক বারই মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্য ওকে খালিগায়ে দেখেছে যখন অ্যাডভান্সের টাকা দিতে আসে। লম্বা বারান্দার শেষে একটা ভারী পায়াওয়ালা চেয়ারে হেলান দিয়ে অলস ভঙ্গিতে বুড়ো বসেছিল সামনের দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেয়ে চমকে উঠে মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখেই দ্রুতপায়ে শোবার ঘরে ঢুকে পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে। বুড়োর পায়ে ছিল পাতাঢাকা ক্যানভাসের সাদা চটি। পাঞ্জাবির মতো চটিটাও সবসময় পরে থাকে। চলার সময় শব্দ হয় না।
তাহলে এত রাতে শব্দটা কেন? উপরে বুড়ো ছাড়া আর তো কোনো মানুষ বাস করে না! বিশ্বনাথ ভুলে গিয়েছিল বুড়োর সঙ্গে একটা কুকুরও উপরে থাকে। সেটা মনে পড়তেই কুকুরের চেহারাটা তার চোখে ভেসে উঠল। ঘুমন্ত বউ আর ছেলের দিকে এক বার তাকিয়ে সন্তর্পণে দরজার ছিটকিনি খুলে সে দালানে বেরিয়ে আলো জ্বালল। দোতলার বারান্দার নীচেই তাদের এই দালান, যেটাকে ভাড়াটের জন্য দেয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে দোতলায় যাবার সিঁড়ির সঙ্গে। এই দেয়ালঘেরা দালানেই রান্নাঘর ইত্যাদি এবং শম্পা রাতে ঘুমোয়। ঘুমন্ত মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে সে বাইরে বেরোবার দরজাটা খুলল।
বাড়িটার তিন দিক ঘিরে সরু জমি। আরও জমি ছিল কিন্তু বিক্রি হতে হতে এবং সম্পত্তি ভাগ হয়ে বুড়োর এই বাড়িটা বড়ো শরিকের পিছনের অংশে পড়ে গেছে। সামনের বাড়ির, যাকে বলা হয় ও-বাড়ি, তাদের ভাগে লোহার ফটক কিন্তু বুড়োর অংশে আসতে হলে পাশের সরু গলিটায় ঢুকে কোমরসমান লোহার পাতের দরজাটা ব্যবহার করতে হয়। সেখান থেকে হাত দশেক চওড়া জমি বাড়িটাকে ঘুরে বিশ্বনাথের দরজার সামনে দিয়ে এগিয়ে একটা দেয়ালে শেষ হয়েছে। সেখানে এক কালোয়ারের টিনের চালা, যাতে জমা করা আছে বাতিল বা নিলামে কেনা মেশিনপত্তর। মাঝে মাঝে কুলিরা লোহালক্কড় রাখতে বা তুলে নিয়ে যেতে আসে। রাতে একজন পাহারাদার চালার নীচে ঘুমোয়।
