বেবি সেই একই শাড়ি পরে আসত। ক্রমশ সেটার রং জ্বলে গিয়ে বিবর্ণ মলিন দেখাতে লাগল। অবশেষে সেলাইয়ের সুতোও জায়গায় জায়গায় ফুটে উঠল। ফিরে যাবার সময় কয়েকটা টাকা ধার না নিয়ে সে যেত না। শৈলেন প্রতিবারই দিয়েছে এবং ধার কখনোই শোধ হয়নি। তাই নিয়ে সে কিছু মনে করত না কেননা, কিছুক্ষণের এই চমৎকার সময়টা সে মনে করত খুব সস্তাতেই পেয়ে যাচ্ছে। ধারের অঙ্কটা অবশ্য দুশো পঁচিশ টাকা উঠেছিল যখন বেবি মারা যায়।
বেবিকে সাহায্য করতে পেরে শৈলেন আনন্দই পেত। জগৎসংসারে ওর কেউ নেই, এই বাস্তবতা সম্পর্কেও সে সজাগ ছিল। বেবিকে সে এক বারের জন্য জিজ্ঞাসা করেনি কোথায় সে থাকে, কীভাবে থাকে, কারুর সঙ্গে না একাই থাকে, কী কাজ করছে, কত রোজগার করছে। তবে বেবি নিজেই এক বার বলেছিল এখন সে বেনেপুকুরে থাকে, পার্কসার্কাসে একটা কারখানায় চামড়ায় রং মাখাবার কাজ করছে।
শৈলেনের ঘরে বেবি যত বারই এসেছে, মাঝে মাঝেই সে ফুলদানিটার দিকে তাকাত। তার মতে ওটা সুন্দর, ওটাকে শৈলেনের হাতছাড়া করা উচিত নয়, ওর লতাপাতা আর ফুলের রঙের সঙ্গে সোনালি পাড় যে কী দারুণ বাহার তৈরি করেছে সেটাও উল্লেখ করত। আবার এর কয়েক মিনিট পরই সে ফুলদানিটা তাকে দিয়ে দেবার ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলত। শৈলেন অবশ্য পুরোনো জিনিসের দোকানে ফুলদানিটাকে আর দেখতে না চাওয়ার জন্য ইঙ্গিতগুলো না বোঝার ভান করত।
একবার শৈলেন তাকে কিছু বেশি টাকা দিতে চেয়েছিল, বেবি প্রস্তাবটা কানে নেয়নি। তবে তার মনে হয়েছিল, বিক্রি করে টাকা পাবার জন্য বেবি ফুলদানিটা চায় না বা নিজের ঘরে রাখার জন্যও নয়। সে চায় পুরোনো জিনিসের দোকানে বেচলে ওটা অন্য কেউ কিনবে ফলে দুজনের কারুর কাছেই আর ফুলদানিটা থাকবে না।
অবশেষে একদিন বেবি ফুলদানিটা সোজাসুজিই চাইল। শৈলেন তাকে প্রত্যাখ্যান করল। সাত বছর আগে যেভাবে ধুলো ঝেড়ে, কাগজে মুড়ে দিয়েছিল, সেইভাবেই বেবির হাতে সেটা তুলে দিল। বেবিকে তখন খুব খুশিই দেখাচ্ছিল।
তারপর আবার সেই পুরোনো ব্যাপার। শৈলেন পরদিন সকালেই পুরোনো জিনিসের দোকানে কৌতূহল নিয়ে গেল। দোকানটা তখনও খোলেনি। রাত্রে গিয়ে দূর থেকেই দেখতে পেল একটা লেডিজ ব্যাগ আর ছবিহীন একটা নিকেলের ফ্রেমের মাঝখানে ফুলদানিটা দাঁড়িয়ে।
বেবি মারা যায় লরির ধাক্কায়। রাত একটা নাগাদ একটা ট্যাক্সি থেকে সিআইটি রোডে নেমে রাস্তা পার হবার সময় ঘটনাটা ঘটে। ফুটপাথের এক বাসিন্দা দেখেছিল ট্যাক্সি থেকে নেমে বেবি টলছিল এবং সেইভাবেই রাস্তা পার হচ্ছিল। হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাবার আগেই সে মারা যায়। নাক-মুখ থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়েছিল।
শৈলেন এইসব কথা জেনেছে বেবির এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। পর পর তিন সপ্তাহ বেবি না আসায় সে শূন্যতা বোধ করতে শুরু করে। খালি কুলঙ্গিটার দিকে চোখ পড়লেই তার মনে হতে থাকে, ফুলদানিটা ওকে দিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এটা দেখার লোভেই ও আসত। একদিন সে পুরোনো জিনিসের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। ফুলদানিটা দেখতে পেল না। কেউ হয়তো কিনে নিয়েছে। নানারকম ভয়ের সম্ভাবনা তাকে উত্ত্যক্ত করতে থাকায় একদিন স্কুল ছুটির পর বিকেলে সে বেবিকে খুঁজতে বেনেপুকুর রওয়ানা হয়। বেবি বলেছিল বাসরাস্তা থেকে পুবে গলি দিয়ে সে যায়। গলির মুখে একটা পানের দোকান থেকে মিঠে পান কেনে। দোকানের ভিতর চাররকম রঙের কাচের শেড-লাগানো একটা আলো আছে। শেডটা ঘোরে আর রংগুলো ঝিলিক দেয়। বলেছিল, ওই ঝিলিকগুলো দেখবার জন্যই পান কিনতে দাঁড়াই।
আধ ঘণ্টার চেষ্টায় শৈলেন পানের দোকানটা খুঁজে বার করেছিল। তখন দিনের আলো, তাই আলো জ্বালানো হয়নি। পানওয়ালা বিহারি। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলেছিল, সেই মেয়েমানুষটা তো লরিচাপা পড়ে মারা গেছে। ওই জায়গাটায়। আঙুল দিয়ে একটু দূরে রাস্তাটা দেখাল। তা কুড়ি-পঁচিশ দিন তো হয়ে গেল। আপনি ওর কে হন?
আত্মীয় হই। শৈলেনের ভিতরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছিল। পানওয়ালার কাছ থেকে জানল, এই গলিটার মধ্যে বস্তির কোন ঘরে বেবি থাকত।
শৈলেন খুঁজে পেয়েছিল। অল্পবয়সি রুগ্ন একটি বউ, তাকে ঘিরে তিনটি ছেলে-মেয়ে।
এই তো পাশের ঘরেই শুভ্রাদি থাকত।
ঘরে এখন অন্য পরিবার ভাড়া এসেছে।
আমরা খবর পেলুম তো পরের দিন সকালে। থানা থেকে লোক এসেছিল খোঁজখবর নিতে। আমরা তো ওর সম্পর্কে কিছুই জানি না, কোনোদিন কাউকে আসতেও দেখিনি। বলেছিল কোনো আত্মীয়স্বজন নেই, একা।
ওর কোনো জিনিসপত্তর ছিল না।
জিনিস! ওই রান্নার একটা হাঁড়ি আর একটা কড়া, থালা, গেলাস, দুখানা শাড়ি। আর তেমন কিছু থাকার মতো অবস্থা তো ছিল না। রোজগারের যে লাইন ধরেছিল তাতে যৌবন না থাকলে কি আর হয়?
এই সময় বছর ছয়েকের ছেলেটি বলে ফেলে, মা, শুভ্রামাসির ফুলদানিটা?
কড়া চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বউটি বলে, একটা চিনেমাটির ভাঙা ফুলদানিই শুধু ওর ঘরে ছিল, সেটা আমি রেখে দিয়েছি। আপনি নিয়ে যাবেন তো নিয়ে যান।
কই দেখি।
সেই ফুলদানিটাই। হাতে নিয়ে শৈলেন ভাবল, এটা পুরোনো জিনিসের দোকানে অবশ্যই সে দেখেছিল কিন্তু তারপর বেবিই আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। নিশ্চয় বিক্রির দামের থেকে বেশিই ওকে দিতে হয়েছে।
না থাক, এটা রেখে দিন।
