মাথাটা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে তুলে বেবি বলল, তুমি সেই আগের মতোই ভ্যাদভ্যাদেই রয়ে গেছ।
তা রয়ে গেছি।
যদি না রইতে, গলায় কোনোরকম আবেগ না এনে বেবি বলল, তাহলে আমরা হয়তো…।
বড্ড দেরি হয়ে গেছে। হইচই, ঝগড়াঝাঁটি, আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ।
বেবি হেসে মাথাটা হেলাল, অনেক বই দেখছি।
সময় কাটাতে হবে তো।
কিছুক্ষণ কেউ আর কথা বলল না। রেডিয়োয় এই সময় খবর হয়। শৈলেন নিয়মিত তা শোনে। আজ সে রেডিয়ো খুলল না।
ফুলদানিটা আমার খুব পছন্দ।
ওটা চাই তোমার? নিতে পারো।
সত্যি সত্যি দেবে?
নিশ্চয়। আমার তো কোনো কাজে লাগে না এই ভূতের বাসাটাতে। তবে তলাটা আঠা দিয়ে জোড়া, আলতোভাবে বসিয়ে রাখতে হয়।
শৈলেন সন্তর্পণে ফুলদানিটা তুলে নিয়ে ফু দিয়ে ধুলো ঝাড়ল। আরও সবধানে ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে মুছল। ঝকঝক করছে সবুজ, লাল, সোনালি, সাদা রং। খবরের কাগজে সেটা মুড়ে সুতো দিয়ে বাঁধল। এই নাও। শৈলেন টেবিলে রাখল ফুলদানিটা।
বেবি উঠে দাঁড়াল। এইবার যাই, পরে আর একদিন আসব।
নিশ্চয় আসবে। যখনই ইচ্ছে হবে…আমরা তো শত্রু নই।
কাগজে-মোড়া ফুলদানিটা তুলে বেবি সারা ঘরে এক বার চোখ বুলিয়ে আসি বলে বেরিয়ে গেল। তাকে এগিয়ে দেবার জন্য শৈলেন ঘর থেকে বেরোল না। অনেকক্ষণ পর, হিমালয়ভ্রমণ বিষয়ে বইটা পড়তে পড়তে মনে হল বেবিকে তো জিজ্ঞাসা করা হল না ছেলেপুলে হয়েছে কি না। তারপর মনে পড়ল, বেবি যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন সে হেসেছিল, তার উত্তরে বেবি শুধু যান্ত্রিকভাবে ঠোঁট দুটো টেনে ধরে। আগের মতো ঠোঁটটেপা হাসির মতো কিছু-একটা পাবে, শৈলেনের সে-আসা পূর্ণ হয়নি।
কয়েক দিন পর এক সকালে শৈলেন লন্ড্রি থেকে কাপড় আনতে যায়। লন্ড্রির পাশে ভাঙা পুরোনো জিনিসের দোকান। কাচা ধুতি ও পাঞ্জাবি এবং খুচরো পয়সাগুলো নিয়ে ফেরার সময় সে পাশের দোকানটার দিকে এক বার তাকাল। একটা ভাঙা সেতার আর কাঠের টেবিল-ল্যাম্পের মাঝে দেখতে পেল সেই ফুলদানিটা, কয়েক দিন আগে যেটা সে বেবিকে দিয়েছিল। নিশ্চিত হবার জন্য সে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে ফুলদানিটা দেখল। তার ভুল হয়নি, উপরের একটা পল ভাঙা, গায়ের চকলা ওঠা।
প্রায় এক মিনিট সে তাকিয়ে রইল। কী করে এটা এখানে এল তার বোধগম্য হচ্ছিল না। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করবে কি না ভেবেও সে তা করল না। নিশ্চয় বেবিই সেদিন ফেরার সময় এখানে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। অভাবের তাড়না ছাড়া এমন কাজ করবেই-বা কেন। বেচারা বেবি! টাকার যদি দরকার তো চাইলেই পারত।
ফুলদানিটা হাতে নিয়ে শৈলেন দোকানদারের দিকে তাকাল। কত?
লোকটা তীক্ষ্ণ একটা চাউনিতে শৈলেনের মুখটা দেখে নিয়ে বলল, ছ-টাকা।
দরাদরি করলে কমানো যাবে কিন্তু শৈলেনের স্বভাবটা তেমন নয়। এক কথাতেই সে দাম চুকিয়ে ফুলদানিটা তুলে নিল।
কেন জানি শৈলেনের মনে হতে লাগল, বেবি আবার আসবে। এবং কয়েক দিন পর সত্যিই এল, সেই একই সময়ে, সেই একই শাড়ি পরে। ওর মুখ দেখেই তার মন হল বেবি প্রচন্ড ক্ষুধার্ত।
পাঊরুটি আর ডিমসেদ্ধ আছে, চলবে?
বেবি মাথা নামিয়ে কী যেন ভাবল। দাও। কিন্তু তোমার?
আমি এইমাত্র খেলাম। তবে আর এক কাপ চা খাব, তোমার সঙ্গে। শৈলেন যে মিথ্যা বলল বেবি সেটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এই নিয়ে ঢং না করায় শৈলেন স্বস্তি পেল।
বেবির খাওয়ার সময় ওর মুখের দিকে তাকবে না ঠিক করেই সে পিছন ফিরে চা করতে বসল। কেউ সামনে বসে তাকিয়ে থাকলে খেয়ে তৃপ্তি হয় না। কুলুঙ্গিটা বেবির সামনেই। নিশ্চয় এতক্ষণে ফুলদানিটা নজরে পড়েছে। কিছু-একটা ও বলবে, বলতেই হবে।
একটিই মাত্র কাপ। সেটা বেবির সামনে টেবিলে রেখে শৈলেন কাচের গ্লাস হাতে বিছানায় বসে বেবির চোখের দিকে তাকাল। বেবির প্লেটে আর পাঁউরুটি নেই কিন্তু চিবিয়ে চলেছে। এক বার কুলুঙ্গির দিকে তাকাল। কোনো বিস্ময় চোখে ফুটল না ফুলদানিটাকে দেখে। শৈলেন তাতে একটু হতাশ হল।
একটু তাড়াতাড়িই যাব। একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, কাজের ব্যাপারে। ফুলদানিটার সম্পর্কে একটা কথাও নয়।
কাজ চলছে কেমন?
কাজ নেই, ছাড়িয়ে দিয়েছে। ছেঁড়া ন্যাকড়া, কাপড়ের ছাঁট এইসব বাছাইয়ের কাজ, রোজ বারো টাকা। যেতে দেরি হয়েছিল বলে কাজে বসতে দেয়নি। দু-কথা শুনিয়ে দিয়েছি।
মাসে তিনশো টাকা। আজকের দিনে একটা লোক আধপেটা খেয়েও মাস চালাতে পারবে। শৈলেনের মনে হল, বেবি বোধ হয় আবার এখানে থাকতে চায়। যদি চায় তাহলে থাকতে পারে। ও যা মেয়ে তাতে সোজাসুজিই এটা জানাতে পারে। তবে শৈলেন যেচে
একথা বলবে না।
বেবি আবার ফুলদানিটার দিকে তাকাল। আমাকে দশটা টাকা ধার দিতে পার?
নিশ্চয়। বালিশের তলা থেকে দুটো পাঁচ টাকার নোট বার করে শৈলেন ওর হাতে দিল। বেবি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কিছু বলল না।
সামনের হপ্তায় শোধ করে দেব। একটু ঘোরাঘুরি করলেই কাজ একটা পেয়ে যাব। বেবি উঠে দাঁড়াল।
একটা হাফ পাউণ্ড রুটি আছে, নিয়ে যাবে?
না। বেবি আবার ফুলদানিটার দিকে তাকাল। সুন্দর দেখতে তাই না? আমার খুব পছন্দের।
শৈলেন পুরোনো রসিকতাটাই করল, খালি ফুলদানিতে কিন্তু ভূতে বাসা বাঁধে।
সেইজন্যই এটাকে ভালো লাগে।
বেবি চলে গেল। এটাকে পুরোনো জিনিসের দোকানে বেচে দেওয়া নিয়ে একটা কথাও বলল না!
আট-দশ দিন অন্তরই বেবি আসতে শুরু করল, মাসের পর মাস, একই দিনে একই সময়ে। তারা এটা ওটা নিয়ে কথা বলত, বাংলা বনধ, বৃষ্টিতে রাস্তার অবস্থা, কাজকর্ম, ভগবতী পাঠশালা, ছিনতাই গুরুতর বিষয়ে কখনো নয়। কখনো চুপ করে দুজনে রেডিয়োর গান বা কথিকা শুনত। কেউই অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত না। শৈলেন কখনো চা তৈরি করত কখনো করত না। এক বারের জন্য বেবি কিন্তু আসা বন্ধ করেনি। ঝড়, বৃষ্টি, লোডশেডিং, রাস্তায় কোমরজল, এমনকী সর্দি জ্বর অগ্রাহ্য করেও সে এসেছে। একটা আলগা ধরনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তারা পরস্পরের সান্নিধ্য অল্প কিছুক্ষণের জন্য উপভোগ করত তো বটেই, আবার দেখা হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়েও থাকত। শৈলেনের ধারণা তারা একসঙ্গে এত ভালো সময় আর কখনো কাটায়নি।
