এইভাবেই বারোটা বছর কেটে গেছে। বেবি সম্পর্কে শৈলেন এইটুকু মাত্র জানতে পেরেছে, সেই যাত্রার অভিনেতা শ্রীরামপুরে লন্ড্রির দোকান এবং বিয়ে করে ছেলেপুলে নিয়ে সংসারী। বেবি এন্টালিতে বাস করছে হোটেলের এক বেয়ারার সঙ্গে। একদিন সন্ধ্যা বেলায় বেবি দেখা করতে এল তার সঙ্গে।
শৈলেন তখন রাস্তার পানের দোকান থেকে প্রতিদিনের মতো রাতের জন্য সিগারেট কিনছিল। পর পর দু-দিন এই সময় লোডশেডিং হওয়ায় দোকানি মোমবাতি আর দেশলাই নিয়ে তৈরি হচ্ছে। উনুন ধরানোর ধোঁয়া বস্তির উপর মেঘের মতো বিছিয়ে রয়েছে। রাস্তায় বাচ্চাদের হুটোপুটি এখনও অব্যাহত। শৈলেন সিগারেট নিয়ে দূরে বাসরাস্তার দিকে তাকিয়েই ওকে দেখল এবং মুহূর্তেই চিনতে পারল।
বারোটা বছরে মানুষ এমন-কিছু বদলায় না যে তাকে দেখে চেনা যাবে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বারো বছর পর চেনার জন্য অন্তত দ্বিতীয় বার তাকাতে হবে। দ্বিতীয় বার তাকিয়ে শৈলেন অল্প ধাক্কা খেল। বেবির হাটার ভঙ্গিতে আগের ঔদ্ধত্য যেন আর নেই। এখন অনেক মন্থর, যেন বারো বছর ধরে তার স্বাভাবিক মোরগের মতো চলন নিয়ে হাঁটতে গিয়ে অবিরাম সে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে গেছে। অনেক মোটা হয়েছে। ফুল লতাপাতার ছাপ-দেওয়া গোলাপি আর বেগুনি রঙের কমদামি সিন্থেটিক শাড়ি ওর পরনে। চুল এলোমেলো, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা।
ওকে দেখে শৈলেন খুশি বা অখুশি কিছুই হল না, তবে বুকের মধ্যে এক বার ছ্যাঁত করে উঠেছিল আর অবাক তো হলই। বেবিকে সে ভুলেই গেছল। দিনগুলো যতই ওর সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে ততই তাদের বিবাহিত জীবন কুঁকড়ে একটা বছরে, একটা মাসে, একটা দিনে, একটা ফুলকিতে পরিণত হয়েছে। নিঃসঙ্গ জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বেবি তার স্মৃতির বাইরে চলে গেছে।
যদিও বেবির হাঁটার ধরন বদলে গেছে তবু শৈলেন আশা করল হয়তো বলবে : এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসব এখানে হয়তো ভাবনি, তাই না?
বেবি সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেমন আছ, বলেই বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। শৈলেন ওর পিছু নিল। বাড়ির দরজায় এসে বেবি থমকে গিয়ে বলল, অনেক দিন পর।
হ্যাঁ, অনেক দিন পর। শৈলেন ঘরের দরজা খোলার সময় কোনোক্রমে একই কথা বলল তবে বেবির মতো স্বাচ্ছন্দ্যে নয়। আঁচলটা পিঠের উপর টেনে দিয়ে বেবি এমন ভঙ্গিতে ঢুকল যেন ঢোকা নয়, ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তারপর, চলছে কেমন? শৈলেন চেয়ারের পিঠটা ধরে জিজ্জাসা করল। ওর হঠাৎ আবির্ভাবে খানিকটা নাড়া যে সে খেয়েছেই সেটা বোঝা গেল রাতের সিগারেটটা ঠোঁটে লাগিয়ে দেশলাই খোঁজার মধ্য দিয়ে।
ভালোই চলছে। বেবি পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না। দিনে কটা সিগারেট খাও এখন?
শৈলেন তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ঠোঁট থেকে তুলে নিল। একটাই, রাতে। অভ্যেসটা রেখেছি।
একা নিজের দেখাশোনা ভালোই পার দেখছি।
না পেরে উপায় কী। শৈলেনের গলার বিদ্রুপ নেই। সে লক্ষ করল বেবির ঠোঁটে লিপস্টিক, যা আগে কখনো দেখেনি। ঘামে-ভেজা পাউডার গলার ভাঁজে। বেবিকে বয়স্কা মনে হচ্ছে অন্যরকমভাবে। এর বদলে মুখে কিছুই না মাখলেই বরং শৈলেনের মনে হল ওকে কমবয়সি দেখাত। বারো বছর আগে ও যা ছিল সেটা আড়ালে রাখার জন্য যেন হালকা ছদ্মবেশ মুখে পড়েছে।
চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে শৈলেন বলল, বসো, জিরোও।
চেয়ারে বসে মুখ তুলে বেবি সামনের দেওয়ালের কুলঙ্গিটার দিকে চেয়ে রইল। শৈলেন। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তারা এখানে আসার পর রবীনবাবু চিনেমাটির একটি ফুলদানি উপহার দিয়েছিলেন। সাদা জমিতে সবুজ লতাপাতা, সোনালি বর্ডার আর লাল ফুল। গলার কাছটা কলসির মতো সরু। রজনিগন্ধার এক হাত লম্বা ছড় ওতে ভালোমতোই রাখা যায়। প্রথম প্রথম শৈলেন রাখত। বেবিও ফুল কিনে আনত। একদিন তপ্ত কথাকাটাকাটির চূড়ান্ত পর্যায়ে বেবি ফুলদানিটা তাকে লক্ষ করে ছুড়েছিল। শৈলেন হাত দিয়ে আটকায় কিন্তু মেঝেয় পড়ে সেটির তলার কানা ভেঙে যায়, মাঝখানের অংশ থেকে খানিকটা চকলা খসে পড়ে। তা ছাড়া পলকাটা গলা থেকে একটা পলও ভাঙে। ফুলদানিটা বেবির খুব পছন্দের ছিল। ফুল না থাকলে সাবান জলে ধুয়ে সে টেবিলে রেখে দিত ঘরে শোভা আনার জন্য। দুজনের সম্পর্কটা যখন ভালো থাকত তখন শৈলেন বলত, খালি ফুলদানিতে ভূত এসে বাসা বাঁধে।
এখন করছ কী? চলছে কেমন?
ভালোই আছি।
বেবি আগের মতো আর অনর্গল কথা বলছে না। শৈলেন এটার সঙ্গে আরও লক্ষ করল কথার মধ্যে আগের মতো কামড় নেই, স্বরটা চাপা আর সাদামাটা। এর কারণ হিসেবে
শৈলেন ভাবল, হয়তো সেই পুরোনো ঘরে এত বছর পরও আবার তাকে দেখতে পাওয়ায়, যাবার সময় ঘরে সব কিছু যেমন ছিল ঠিক তেমনটিই রয়ে যাওয়ায় বেবি হয়তো আশ্চর্য বোধ করছে। ট্রানজিস্টরটাই শুধু তার কাছে নতুন।
কাজকম্ম কিছু করছ?
প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবার জন্যই বোধ হয় না-শোনার ভান করে বেবি ফুলদানির দিকে তাকিয়ে রইল। ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে শৈলেন ওর মধ্যেই রেখে দিয়েছিল। ফুলদানির আর দাঁড়াবার মতো অবস্থা ছিল না, কাগজ মুড়ে শোয়ানো ছিল কয়েক বছর। একদিন শৈলেন আঠা দিয়ে তলার টুকরোগুলো লাগিয়ে ফুলদানিটাকে দাঁড় করায়।
থাক কোথায় এখন?
বেবি মাথায় হাত বোলাল। শৈলেনের চোখে পড়ল দু-তিনটে রুপোলি চুল। এন্টালিতে থাকি।
ইতস্তত করে শৈলেন বলল, একা?
হ্যাঁ। কথাটা বলেই বেবি মাথা নামিয়ে মেঝের দিকে তাকাল। শৈলেনের মনে হল ওর জীবনীশক্তির অনেকটাই ক্ষয়ে বেরিয়ে গেছে। চাহনিতে আগেকার সেই মজাদার ঝকঝকানিটা স্তিমিত পান্ডুর লাগছে। চোখের চারধারে দাগ আর কালি জানিয়ে দিচ্ছে বয়স হয়েছে।
