শৈলেন কথাটা শুনতে পেল না। উপন্যাসে মগ্ন হয়ে থাকলে শোনা সম্ভব নয়, বিশেষত কথাগুলো খুব মৃদুস্বরে বললে। কিছুক্ষণ পরে বেবি অধৈর্য স্বরে বলল, কথা কানে গেল
হাসিমাখা মুখটা বই থেকে তুলে এক বার বেবির দিকে তাকিয়েই শৈলেন আবার পড়ায় ডুবে গেল।
এত পড়লে চোখ খারাপ হয়ে যায়। বেবি কথাটা বলল, শৈলেনের বই পড়া বন্ধ করার জন্য।
খারাপ হয় না। শৈলেন বই থেকে চোখ না তুলেই বলল।
বাবা বলত শুধু গবেটরাই বই পড়ে, ওদেরই তো শিক্ষাদীক্ষার দরকার হয়।
কথাটা শৈলেনের কানে বাজল, মাথাটা ঝাঁঝাঁ করে উঠল। বইয়ে চোখ রেখেই গম্ভীর স্বরে বলল, তোমার বাবা কথাটা বলেছেন যেহেতু তিনি লেখাপড়া কখনো করেননি, তাই যারা লেখাপড়া করে তাদের হিংসে করতেন।
তোমাদের মতো বিদ্যের গোবরপোরা মাথাওলাদের হিংসে করার কোনো দরকার হয় না। বেবি চিবিয়ে কথাটা এমনভাবে বলল যাতে শৈলেনের বুঝতে অসুবিধা না হয় কার উদ্দেশে কথাগুলো বলা। শৈলেন টের পাচ্ছে, ঝড় এল বলে।
তুমিও তো বই পড়তে পার, পড় না কেন? শৈলেন বলল বটে কিন্তু জানে বেবির কাছে। বই বিষবৎ পরিত্যাজ্য বস্তু।
আমার তো ভীমরতি ধরেনি, কাজ করতে হয় আমাকে। মুখ বেঁকিয়ে ঘৃণা ঝরিয়ে সে বলল।
এবার শৈলেন ঝাঁঝিয়ে উঠল তবে গলা নামিয়ে, কেননা বেবিকে খেপিয়ে তুলে বই পড়াটা সে মাটি করতে চায় না। এখন এসব কথা থাক, বলার একটা সময় আছে। বইটা আমায় পড়তে দাও, ক্লান্ত লাগছে।
ক্লান্ত? তুমি তো সবসময়ই ক্লান্ত। বেবি বেশ জোরেই হেসে উঠল। পাঠশালার পন্ডিত তার আবার ক্লান্তি। বসে বসে বাচ্চাদের অ আ না-শিখিয়ে, একটু খাটাখাটনি করে দুটো পয়সা আনার চেষ্টা করো-না যাতে বাসনমাজার একটা লোক অন্তত রাখা যায়।
শৈলেন কথা না বাড়াবার জন্য চুপ করে রইল। তাইতে বেবির মাথায় রক্ত চড়ে গেল। হাত থেকে বইটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে সে বলল, খালি বই বই আর বই, গাধারও অধম। বইটা দরজা দিয়ে সে উঠোনে ছুড়ে ফেলল।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে শৈলেন একটা চড় কষাল বেবির গালে। পড়তে তার খুবই ভালো লাগছিল তো বটেই, তা ছাড়া ওটা লাইব্রেরির বই। নষ্ট হলে, ছিঁড়ে গেলে ফাইন দিতে হবে, তেমন হলে হয়তো পুরো দামটাই।
বেবি গালে হাত দিয়ে অদ্ভুত চোখে শৈলেনের দিকে তাকিয়েছিল জ্বালাভরা চোখে চোখে জল টেনে আনেনি কারণ সেটা তার প্রকৃতিতে নেই। শৈলেনের তখনই মনে হয়েছিল তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর টিকবে না। এটা ভেবে সে দুঃখ বোধ করেনি, বুকও ভেঙে যায়নি। বরং ভগবানকে ধন্যবাদ দেয় তাদের ছেলেপুলে না হওয়ার জন্য। একবার বেবি গর্ভবতী হয়েছিল বটে কিন্তু বাচ্চা পেটেই নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চা হলে কে জানে, সংসারটা হয়তো একটু সহনীয় হত।
বইটা উঠোনে ছুড়ে ফেলার এক মাস পর বেবি ঘর ছেড়েছিল। প্রায় দুপুরেই সে শ্যামপুকুরে মা-র কাছে চলে যেত। সেখানেই আলাপ এবং ভাব হয় যাত্রার এক ছোটোখাটো অভিনেতার সঙ্গে। যাত্রায় সুযোগ করে দেবে এই আশায় বেবি লোকটির সঙ্গে পালায়।
একদিন পাঠশালা থেকে ফিরে শৈলেন একটা চিরকুট বিছানার ওপর পেয়েছিল। পাঠশালার পড়য়াদের মতো হাতের লেখায় আমি চিরকালের মতো চলে যাইতেছি আর ফিরিব না কথা ক-টি তাতে লেখা। শৈলেন স্তম্ভিত হওয়ার মধ্যেই হাঁফ ছেড়েছিল। চিৎকার চেঁচামেচি হল না, জিনিসপত্তর ভাঙা বা ছোড়াও হল না। কেমন দিব্যিই সে শান্তিতে একা হয়ে গেল। কাগজটার ওপর চোখের জলের দাগ নেই। মাত্র আটটি শব্দ ছেঁড়া হ্যাণ্ডবিলের উলটোদিকে পেন্সিলে লেখা। কাগজটা ভাঁজ করে সে ঘরের তাকে রাখা অভিধানের পাতার মধ্যে রেখে দিয়েছিল। কেন যে রেখেছিল তা সে জানে না। একুশ বছর পরও সেটা ওখানে রয়েছে।
যাত্রার সেই অভিনেতার সঙ্গে বেবি শ্যামপুকুরেই একটা গলিতে বসবাস শুরু করে। লোকটি মদ খেত এবং প্রায় রাতেই বেবিকে ঠ্যাঙাত। পাড়াপ্রতিবেশীররা অতিষ্ঠ হয়ে থানায় নালিশ জানায়। অবশেষে একদিন তারা কোথায় যেন চলে যায়। এসব কথা শৈলেন শুনেছিল তার ছোটোবোনের কাছে। বাড়ির লোকেরা ভেবেছিল দাম্পত্য সম্পর্ক ফিরে পাবার জন্য, অর্থাৎ পৌরুষের মর্যাদা রাখার জন্য শৈলেন মামলা ঠুকবে বেবির নামে। কিন্তু সে অমন কোনো চিন্তাকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেয়নি।
শৈলেনের জীবনের যে-ছকটা বিবাহিত জীবনে গড়ে উঠেছিল সেটা অবশ্যই নাড়া খেয়েছিল এই ঘটনায়। পাঁচ বছর একই ঘরে একটি মেয়ের সঙ্গে বসবাস করার পর তার অভাব তো তারা পেয়েছে। বেবির হঠাৎ চলে যাওয়ার পর ঘরের দেওয়াল, সিলিং, টেবিল, বিছানা সব কিছুই শৈলেনের চোখে অন্যরকম ঠেকেছিল। তার নিজের ভিতরটাও কেমন যেন পালটে গিয়েছিল। তখন সে মনে মনে বার বার নিজেকে বলল, বেবি চলে গেছে তো কী হয়েছে, সব একইরকম আছে, কিছু বদলায়নি। প্রথম প্রথম ঘরে ফিরে সময় কাটাতে তার খুবই অসুবিধা হত। নিজেকে টানতে টানতে একাকী দিন কাটানোটা তাকে শিখতে হয়েছে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সকাল আর সন্ধ্যা তার জীবনে এল আর চলে গেল। নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্ণতাকে সঙ্গী করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সে সুখী বোধ করতে থাকে। পৃথিবী থেমে নেই, শৈলেনের মনে হয় সেও চলেছে এর সঙ্গে।
কয়েক বছর পর রবীনবাবু একবার দেশে গিয়ে অসুস্থ হলেন। চিঠি এল, স্ট্রোক হয়ে শরীরের একটা দিক পড়ে গেছে। চার মাস পর চিঠি এল তিনি মারা গেছেন। ভগবতী ইনস্টিটিউশন চালাবার ভার শৈলেন নিল। দিন তার ভালোই কেটে গেছে। হোটেলের সঙ্গে ব্যবস্থা করে ঘরেই খাবার এসে যায়। কেরোসিন স্টোভে খাবার গরম করে নেয়, চা বা জলখাবার করে। ট্রানজিস্টর রেডিয়ো শোনে, বই পড়ে। টিউশনি বহুদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে। নিঃসঙ্গ বোধ করলেও শান্তিতেই সে দিন কাটাচ্ছে। দুপুরে স্কুলে-পাওয়া বহু মুখ বহু কথা তাকে রাত পর্যন্ত সঙ্গ দেয়। শৈলেন নিজের মতো করে সুখীজীবন তৈরি করে নিয়েছে।
