কয়েক দিন মাস্টারি করার পর সে বেবিকে তার কর্মস্থল দেখাতে নিয়ে গেছল। বেবির পোশাকি নাম শুভ্রা। বয়সে তার থেকে এক বছরের ছোটো। যোগ-বিয়োগ পর্যন্ত কষতে পারে, গুণ-ভাগ পারে না। সিনেমার ম্যাগাজিন কোনোক্রমে পড়তে পারে, খবরের কাগজ পারে না। বেবি ক্লাস ফাইভেই লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। ওর মা হাসপাতালে আরার কাজ করত, তাকেও ওই কাজে ঢোকাবার চেষ্টা করছিল।
বেবির চোখ মুখের ভাব বদলে গেল চেয়ারে বসে শৈলেনকে পড়াতে দেখে। ছেলে মেয়েদের স্যার বলা, ব্ল্যাকবোর্ডে চকখড়ির খসখসে শব্দ, ধমক দেওয়া, বাইরে যাওয়ার জন্য ভয়ে ভয়ে অনুমতি চাওয়া, এসবের থেকেও মুগ্ধ করে এতাবৎকাল তার কাছে অনাবিষ্কৃত শৈলেনের এই গাম্ভীর্য। তার মনে হয়েছিল মুখচোরা ছেলেটা এখন ভারিক্কি একটা লোক হয়ে গেছে!
এসব অবশ্য বিয়ের পর প্রথম সাত দিনের মধ্যেই সে বেবির কাছ থেকে শুনেছিল। বেবি আরও দু-বার নতুন ঘরের পাঠশালায় এসে একধারে বসে তার পড়ানোে দেখেছে। দুখানা বাড়ির পরেই পুরোনো ঘরে রবীনবাবু উঁচু ক্লাসেরর ছেলে-মেয়েদের পড়াতেন। ওই ঘরেই থাকতেন, বেঁধে খেতেন, ছুটিতে গ্রামে যেতেন।
প্রথম যেদিন সে মাইনে পেল সেদিন সন্ধ্যায় সে হাতিবাগানের এক রেস্টুরেন্টে বেবিকে কবিরাজি কাটলেট খাইয়েছিল। খেতে খেতে বেবি বিয়ে করার কথাটা মনে করিয়ে দেয়। শীতলা প্রতিমার সামনে শৈলেন পুজোর ফুল হাতে নিয়ে যেকথা দিয়েছিল, বেবি সেটা তাকে ভুলে যেতে দেবার পাত্রীই নয়।
শৈলেন তখন স্বর্গের কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়। মাথা কাত করে জানিয়ে দিয়েছিল, কথা রাখবে। টিপ টিপ বৃষ্টিটা ঝমঝমিয়ে নামল যখন তারা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোয়। দৌড়ে বারান্দার নীচে গিয়ে ভিড় ঘেঁষে তারা দাঁড়ায়। বৃষ্টি এবং ভিড় দুটোই যখন বাড়ল, জলের ছাট যখন লোকেদের পিছিয়ে এনে ভিড়টাকে জমাট করে দিল। তখন বেবির পাছা তার দুই ঊরুতে চেপে রয়েছে।
একটা নতুন ধরনের আমেজ এবং শিহরন শৈলেন বোধ করেছিল, তার একটা হাত ধরে বেবি আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রাখে। বাঙালি মেয়ের শরীর সাধারণত যেমন হয় বেবি তার থেকে একটু পুষ্ট, দেহে সামঞ্জস্য আছে এবং মুখখানি মোটামুটি সুন্দর। তার হাতটাকে বেবি বুকের কাছে তুলে এনে চেপে ধরেছিল। বেবি শোভনতার ধার বিশেষ ধারত না। বেপরোয়া আচরণ ও তাৎক্ষণিক আবেগ সামলাবার মতো শিক্ষাদীক্ষা তার নেই।
বৃষ্টি ধরে যাবার পর প্রায় নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটার সময় বেবি বলেছিল, দেরি কোরো না। তোমরা নীচু জাত, মা আপত্তি করবেই আর তোমার বাপ-মাও আমাকে বউ করে ঘরে তুলবে না। তাতে বয়েই গেল, আমরা কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে করে আসব।
শৈলেন আমতা আমতা করে বলেছিল, এই মাইনেতে কি আলাদা ঘর নিয়ে চালানো যাবে?
ও আমি চালিয়ে নোব। বেবি এই বলে ফুঁ দিয়ে সমস্যাটা উড়িয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে ঢোকার সরু গলিটা অন্ধকার। শৈলেন আচমকা একটা দুর্দান্ত চুমু পেয়েছিল বেবির কাছ থেকে।
বেবির আন্দাজে মোটেই ভুল ছিল না। দুই পরিবার থেকে প্রবল আপত্তি ওঠায় তারা কালীঘাটেই বিয়ে করে এবং দু-দিন পর ভগবতী পাঠশালার কাছাকাছি মুরারিপুকুর বস্তির একটা ঘরে এসে ওঠে।
শুরু থেকেই তাদের যৌথ জীবনে বেবি একদমই সুখী হয়নি। শৈলেনও নয়, কারণ বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই বেবি বলতে শুরু করে, তার মা আর বন্ধুরা নাকি পইপই বলেছে এই বিয়ে এক মাসও টিকবে না। শুনতে শুনতে শৈলেন ব্যাজার হয়ে উঠত বটে কিন্তু প্রকৃতিতে সে ঠাণ্ডা, কোনো কিছুতেই চঞ্চল হয়ে পড়ে না। বিয়েটাকে সে শ্যামপুকুর থেকে মুরারিপুকুর ঘর বদলের ব্যাপার হিসেবে ধরে নেয়।
মাসের শেষে সে মাইনের টাকা বেবির হাতে তুলে দিত। তাই থেকে তিরিশটা সিগারেটের দাম বাবদ দশটা টাকা সে পেত, রাতে শোবার আগে একটি করে সিগারেট খাওয়ার জন্য। মাইনের টাকা যথেষ্ট নয়, তাই সে সকালে ও রাত্রে দুটি টিউশনি নেয় ফলে নব্বই টাকা আয় বাড়ে।
কিন্তু তাদের বিয়ে এক মাসের বেশিই টিকেছিল। পুরো পাঁচ বছর। বেবি তাকে ছেড়ে যখন চলে যায় তখন শৈলেনের বয়স উনত্রিশ, বেবির আটাশ। ঝগড়াঝাঁটি প্রায়ই হত। তার আয়ের স্বল্পতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভীরুতা ইত্যাদি নিয়ে বেবি কুশ্রী ভাষায় আক্রমণ করত, হাতের কাছে যা পেত ছুড়ে মারত। তাদের জীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। শৈলেনের তখন মনে হত, যেদিন থেকে পরস্পরের দিকে তারা চোখ ফেলেছে সেই দিন থেকেই ঝগড়া ছাড়া আর কিছু যেন তারা করেনি। চিরজীবন ধরে তারা শুধু যন্ত্রণাই ভোগ করে আসছে, এর আর বিরাম নেই। যতদিন তারা একসঙ্গে থাকবে ততদিন এইভাবেই চলবে। কিন্তু একুশ বছর পর এখন শৈলেনের মনে হচ্ছে—মাঝে মাঝে তখনও অবশ্য মনে হত, তাদের তখনকার জীবনের অনেকটা সময়ই টক ঝাল মিষ্টি স্বাদে ভরা ছিল। বেবিকে তার মন্দ লাগত না।
বেবির গৃহত্যাগের আগেই শৈলেনের মনে এই ধারণাটি তৈরি হয়ে গেছল, স্বামী এবং স্ত্রী হিসেবে তাদের জন্য বরাদ্দ সময়সীমা এবার বোধ হয় তারা অতিক্রম করতে চলেছে। দাম্পত্য জীবনের সবথেকে বিশ্রী ঝগড়াটি একদিন তাদের মধ্যে ঘটে যেতেই সে বুঝেছিল ভাঙন আসবে।
একদিন রাতের খাওয়া সেরে সিগারেট শেষ করে শৈলেন বিছানায় চিত হয়ে একটা উপন্যাস পড়ছিল। চমৎকার জমাটি গল্প, কুঁদ হয়ে গেছল বইয়ের মধ্যে। বেবি দরজার কাছে মোড়ায় বসে উল বুনছিল। নিজের জন্য কার্ডিগান। হঠাৎ সে বলল, আজকাল তুমি যেন কেমন হয়ে গেছ, আমার দিকে আর তাকাই না।
