বউদি এবার চলো।
শেফালি কথা শেষ করা মাত্রই ঝুপ করে ঘোষপাড়া লেনে অন্ধকার লাফিয়ে পড়ল। শিউরে কাঠ হয়ে গেল শেফালি। কে কঠিনভাবে তার হাতটা আঁকড়ে ধরেছে। ঘরটা স্তব্ধ। কে যেন ভারী হয়ে শ্বাস টানছে।
প্রথমে কেঁদে উঠল ছোটো বাচ্চাটা, তারপর একে একে বাকিরা। বড়োমেয়েটি অন্ধকারেই ঘরের মেঝেতে ন্যাতা বোলাল। বাসন্তী বলল, মোমবাতি কি। হ্যারিকেন এসব কিছু নেই?
না।
ফিসফিস করে শেফালি বলল, আমার আঁচলে একটা সিকি আছে। খুলে নিয়ে ওকে দাও। মোমবাতি আনুক।
অন্ধকার কঠিনভাবে ওর হাত ধরে রয়েছে। প্রথমে দেখে মনে হয়েছিল মরে গেছে।
বস্তির গলিটা দিয়ে প্রায় ছুটছিল ফ্যালা। হাতে মোটরের চাকা। মোটর গাড়ির পিছনের ক্যারিয়ারে বাড়তি যেটা থাকে সেই জিনিস। অন্ধকারে ধাক্কা লাগল সামনের একজনের সঙ্গে। টায়ারটা হাত থেকে পড়ে গেল। লোকটা বলল, আস্তে চলুন-না, দেখছেন না কী অন্ধকার। ফ্যালা জবাব দিয়ে কথা বাড়াল। লোকটা কালীবাবু।
রাস্তায় উবু হয়ে বসে ফোঁপাচ্ছেন বাসুদেব নাগ। ছেলে-মেয়েরা গোল হয়ে ঘিরে। স্ত্রী মাথায় জল ঢালছে। সামনের বাড়ির একজন লম্প হাতে দাঁড়িয়ে। বাসুবাবুর মাথা ফেটেছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে তিনি বললেন, সব তোমার জন্য, এ সব তোমার জন্য। ছেলে-মেয়ে-সংসার সব ফেলে রেখে যেদিকে দু-চোখ যায় চলে যাব। বুঝবে কী করে সংসার চলে। কত অপমান সয়ে চলতে হয়।
বাসুবাবুর স্ত্রী সাত চড়ে রা করেন না। তিনি জল ঢালতে লাগলেন।
মানু বলল, আমি এখন যাই।
ভোম্বল বলল, কেন যেতে তো বলছি না।
মানু বলল, না অন্ধকারে আমাদের দুজনের থাকা উচিত নয়।
ভোম্বল বলল, কথা উঠবে, অপবাদ দেবে?
মানু বলল, হ্যাঁ, তাতে আমাদের দুজনেরই ক্ষতি হবে।
দুজনেই চুপ করে থাকল। ভোম্বল হাত বাড়িয়ে মানুর হাত চেপে ধরল। মানু বলল, ছেলেদের অনেক সুবিধে, বিয়ের পর বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে হয় না। যদি ছেলে হতুম।
তাহলে তোমায় দেখবার জন্য কষ্ট করে জানলায় দাঁড়াতুম না। অবশ্য তুমি যদি চাও তাহলে এবার থেকে মেয়ে হিসেবে তোমায় আর ভাবব না।
বেড়ালের মতো নেমে এসে পারুল বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথাধরা সেরে গেছে। ঘুম পাচ্ছে। বুড়িটা চ্যাঁচাচ্ছে, বলে ছেলের আবার বিয়ে দেব। দিয়ে দ্যাখো না, সেও আটকুড়ি থাকবে। পুজো-মানত-মাদুলি কত কী তো হল, তাতে কি ফল ফলল? যত্তসব ধাপ্পা। বাসন্তীর ছেলে হয়েছে। পারুল ভাবল, তাহলে আমারই-বা হবে না কেন?
একসময় ঘোষপাড়া লেনে আবার আলো জ্বলে উঠল। ইতিমধ্যে ধূসর রঙের সেই মোটর গাড়িটা কখন চলে গেছে। বেড়ালবাচ্চাটা চটকে পড়ে রয়েছে।
একমাত্র সত্যচরণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবল, মৃতদেহটার সদগতি না করলে কাল সকালেই তো কাক আর কুকুরে মিলে সারা রাস্তাটাকে নোংরা করবে।
ফুলদানি
শৈলেনের একবার কিছুদিনের জন্য ইচ্ছে হয়েছিল ডায়রি লেখার। সে প্রথম লাইনটা লেখার জন্য তিন রাত ভেবে একদিন সকালে লিখল— আমার নাম শৈলেন্দ্রনাথ বারিক, আমি ছাব্বিশ বছর যাবৎ প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছি।
লেখার পর তার মনে হল, বড্ড সাদামাটা লাগছে। খুব পন্ডিত লোকেরা এইভাবে সাদামাটা লিখে বা কথা বলে নিজেদের জাহির করে। সুতরাং, ভাষায় আড়ম্বর থাকা উচিত। আড়ম্বরপূর্ণ শব্দ খুঁজতে হলে তাকে অভিধানের পাতা ওলটাতে হবে। অবশ্য অভিধান একটা রয়েছে কিন্তু বার বার পাতা উলটে একই শব্দ বার বার ব্যবহার করলে সেটা বোকামিই হবে।
শৈলেন সেদিন খাতাটা বন্ধ করে রাখে। পরদিন সে লিখল—আমার বিবাহ হয় ছাব্বিশ বছর আগে।
তার কাছে এই লাইনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ছাব্বিশ বছর আগেই সে উলটোডাঙা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ভগবতী ইনস্টিটিউশন—যাকে পাড়ার লোকেরা ভগবতী পাঠশালা বলে, সেখানে চাকরি পায়। তার আগে সে স্কুল ফাইনাল ফেল করার পর দপ্তরির কারখানায় ছাপা ফর্মা ভাঁজ করার কাজে ঢুকেছিল। বছর দুই পর সেখান থেকে ছেড়ে সে আসে স্কুল বইয়ের এক প্রকাশকের দোকানে। কাউন্টারে বসে বই বিক্রি করার চাকরি। এখানে থাকাকালেই সে প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল আর পি ইউ পরীক্ষা পাস করে। দোকানের মালিক তাকে খুবই সাহায্য করেছিল পড়ার ব্যাপারে।
এই দোকানেই তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ভগবতী পাঠশালার মালিক এবং হেডস্যার রবীনবাবুর। কথায় কথায় যখন তিনি জানলেন শৈলেন শুধু তাঁর জেলারই নয় একই মহকুমার ছেলে, তারপর তিনি বিশেষ স্নেহভরে তার সঙ্গে কথা বলতেন। রবীনবাবুর একটা প্রাইমারি বাংলা বই ছাপার কাজ চলছিল। ছাপাখানা থেকে খুব জরুরি তাড়া দেওয়ায় শৈলেনকে একদিন দুপুরে প্রুফ নিয়ে পাঠশালায় রবীনবাবুর কাছে যেতে হয়েছিল। যখন তিনি প্রুফ দেখছিলেন শৈলেন তখন খেলাচ্ছলেই হোক, কৌতূহলেই হোক বা সময় কাটাবার জন্যই হোক চারটি ক্লাসের প্রায় পঁচিশটি ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর ভার নিয়েছিল। পড়ানো বললে ভুল হবে, সামলানোই বলা উচিত।
প্রুফের বাণ্ডিল শৈলেনের হাতে দেওয়ার সময় রবীনবাবু বলেছিলেন, এখানে বাপ মায়েদের খুব ইচ্ছে বাচ্চাদের লেখাপড়া করাবার, তবে খুবই গরিব, কাছাকাছি প্রাইমারি স্কুলও নেই। ভাবছি আর একটা ঘর নেব। দেখলুম ভালোই তো পড়ালে, পড়াবে? আরে দোকানের কর্মচারী থাকার চেয়ে মাস্টারিতে সম্মান আছে।
এ হল ছাব্বিশ বছর আগের কথা। শুধুমাত্র সম্মানের লোভেই সে পঁচিশ টাকা কম বেতনে মাস্টার হয়। তখন সে থাকত শ্যামপুকুরে বাবা-মা-ভাই-বোনদের সঙ্গে। পঁচিশ টাকা তখন অনেক টাকা। পরিবারের সবাই, এমনকী পাশাপাশি ঘরের লোকেরাও বলল, এতগুলো টাকা! কাজটা বোকার মতো হল।
