কীসের।
ওই যে বললুম।
মাথা নুয়ে পড়ল মানুর। পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী বলব?
বাঃ, সেটা কি আমি বলে দেব?
জানি না।
এড়িয়ে যাচ্ছ।
দুজনেই চুপ। দূর থেকে একটা চেঁচামেচির আভাস আসছে।
অনেকেই তো আসে। কলেজের অনেক মেয়ের সঙ্গেই তো আসে, পৌঁছে দিয়ে যায়। একসঙ্গে পাশাপাশি গল্প করতে করতে আসে। মানুর কণ্ঠস্বর যেন মেঝেয় মিশে যাচ্ছে। ওরা কিন্তু খুব ভদ্র। আমাদের ক্লাসের সুলেখা আলাপ করিয়ে দিয়েছে একজনের সঙ্গে। রোজ আসে। ওর সঙ্গে সুলেখার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
শুনতে শুনতে গম্ভীর হয়ে গেল ভোম্বল। কারণ সে ভাবতে শুরু করেছে, এতদ্বারা মানু কি এই বোঝাতে চায় যে, যদি বিয়ে করো তাহলেই কলেজ পর্যন্ত সঙ্গে যেতে পারো। কিন্তু মানুকে রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাটা মিথ্যে নয়। ওর সঙ্গে গল্পকরা বা একসঙ্গে পথচলার ইচ্ছাটাও সত্যি। অতএব ভোম্বল আর ভাবনাচিন্তা না করে বলল, একদিনেই তো আর ওরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি, তার আগে.. বলেই ভোম্বল থেমে গেল।
মানু চোখ তোলেনি। হঠাৎ প্রাণপণে কিছু বলার চেষ্টায় মুখটা তুলেই সবটুকু ক্ষমতা যেন ওর ফুরিয়ে গেল।
বাবা সামনের বছর রিটায়ার করছে। আমায় বলেছে খবরের কাগজে কর্মখালির কলম যেন রোজ দেখি। আমিই তো বড়ো। আবার প্রাণপণে ও ক্ষমতা সংগ্রহ করল, আমার বিয়ে করলে চলবে কেন।
ভোম্বল দেখছিল মানুর ঠোঁট কেমন থরথর করে কাঁপছে। ও তখন ভাবতে যাচ্ছিল, আর সেই সময়েই দপ করে ঘোষপাড়া লেন অন্ধকার হয়ে গেল।
উঠোনটা অন্ধকার, ভিজে। সাবধানে পেরিয়ে দরজার কাছে ওরা দাঁড়াল। টিমটিমে বালব জ্বলছে ঘরে। বাসন্তী কনুই দিয়ে শেফালিকে খোঁচাল।
ওই কোণের জানলাটা। ফিসফিস করে শেফালি বলল। বাসন্তী আবার খোঁচা দিল।
বারো-তেরো বছরের একটি মেয়ে পিছু ফিরে বসে বাটিতে কিছু-একটা গুলছে। ছেঁড়া কাগজ কুচিয়ে ভাগা দিচ্ছে একটা বাচ্চা। আর একটি মেঝে থেকে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে। বছর দেড়েকের বাচ্চাটি তক্তায় উঠতে গিয়ে কেঁদে উঠল।
তক্তায় এদের মা শুয়ে, চোখ বোজা। হাত দুটি এলানো। ব্লাউজের বোতাম খোলা। ছোটোটি বোধ হয় মাই খাবার জন্য তক্তায় উঠতে চায়। মায়ের কাপড় অসম্ভব ময়লা। পায়ের আঙুলে হাজা। মুখটি হাঁ করা। সম্পূর্ণ চেহারাটি দেখলে মনে হয় বহুকালের বিসর্জিত প্রতিমাকে জল থেকে টেনে তুলে শুইয়ে রাখা হয়েছে। শেফালির মনে হল, মরে পড়ে আছে।
বাচ্চাগুলো ওদের দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে তাকাল। বড়োমেয়েটি টের পেল। সে ফিরে তাকাল।
এবার একটা-কিছু বলতে হয়। যেহেতু এদের মধ্যে বয়স্ক তাই বাসন্তীই বলল, কী হয়েছে?
অসুখ। ঠাণ্ডা নিরুদবিগ্ন স্বরে কথাটি বলে সে বাটিতে কিছু-একটা গুলতে থাকল।
কী অসুখ। শেফালি বলল। চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে পা রাখল।
এমনি অসুখ, অনেক দিনের। মেয়েটি ফিরে পর্যন্ত তাকাল না।
ডাক্তার দেখে না? এবার বাসন্তী।
হাসপাতালে যেত। এখন বাবা গিয়ে ওষুধ আনে।
ওরা দুজন ঘরের ভিতর ঢুকল।
তোমার মা কথা বলতে পারে?
কাল থেকে খুব জ্বর, অজ্ঞানের মতো হয়ে আছে।
বাসন্তী জানলাটার দিকে তাকাল। বন্ধ রয়েছে।
জানলাটা খুলে দাও, ঘরে হাওয়া চলাচল করুক। বলে সে নিজে এগোচ্ছিল জানলাটা খুলতে।
না।
মেয়েটির ঠাণ্ডা গলার স্বরে বাসন্তী জমে গেল।
পাশের বাড়ির ওরা খুব বিরক্ত হয়। এরা তো গোলমাল চিৎকার করে। বাবা তাই সবসময় বন্ধ রাখতে বলেছে।
শেফালি বলল, বাচ্চা ছেলেপুলে থাকলে গোলমাল তো হবেই তাই বলে অসুস্থ মানুষটার কথাও তো ভাবতে হবে। খুলেই দাও, বলুক ওরা যা বলার।
না, বাবা বারণ করেছে। ঠাণ্ডা গলায় আপত্তি জানাল মেয়েটি। বাসন্তী আর শেফালি, মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তাহলে আর থেকে লাভ কী, চলে যাওয়াই ভালো।
কিন্তু কেমন যেন বাধোবাধো লাগছে। এভাবে এসেই চলে যাওয়াটা ভালো দেখায় না। বাসন্তী বলল, ওকে হাসপাতালে দিলেই তো হয়।
জবাব পেল না। খুঁটে খাচ্ছিল যে-বাচ্চাটা তাকে টেনে নিয়ে বাটিতে-গোলা জিনিসটি খাওয়াতে থাকল। বছর দেড়েকের বাচ্চাটা হামা দিয়ে শেফালির পায়ের কাছে বসে মুখ তুলে তাকাল। মজা দেবার জন্য শেফালি চোখ দুটো বড়ো করে জিভ বার করল। বাচ্চাটা ধীরে ধীরে হেসে উঠল।
রান্না করে কে, তুমি?
মেয়েটি ঘাড় নাড়ল। বাসন্তী আবার বলল, সংসারের ঝামেলাতেই সদাব্যস্ত। এসে যে দেখে যাব তার সময় কোথা? এমনভাবে বলল যেন এরা বহুকালের চেনা। এতদিন না আসায় কৈফিয়ত একটা দেওয়া দরকার।
কাচ্চাবাচ্চার সংসার আমাদেরও তো।
তোমার বাবা কখন ফিরবে? শেফালি অনেকক্ষণ চুপ রয়েছে, তাই বলল।
রাত দুটো-আড়াইটে হয়।
এতক্ষণ?
ইভনিং ডিউটি থাকলে রাত হয়। মর্নিং ডিউটি হলে দুপুরে দুটো-আড়াইটেয় ফেরে।
কী কর অতক্ষণ?
কিছু না।
তক্তা বাদ দিয়ে যতটুকু মেঝে, শুয়োপোকার মতো ছেলেগুলি নড়াচড়া করছে। বাচ্চাটা হামা দিয়ে তক্তা ধরে দাঁড়াল। মায়ের একটা পা ধরে টানতে শুরু করেছে। হঠাৎ চোখ খুলল। হাত মুঠো করে মুখ দিয়ে শ্বাস টানছে। দৃষ্টি কড়িকাঠে ঠায় হয়ে রয়েছে। ঘরের কাউকেই দেখছে না।
বাচ্চাটা পেচ্ছাপ করেছে। মেয়েটি ন্যাতা আনার জন্য উঠোনে বেরোল। সে-সময় বাসন্তী বলল, চলো, চলে যাই এবার।
মেয়েটি আসুক। বলে শেফালি তক্তার দিকে তাকাল। মরামানুষের দৃষ্টির মতো তার মুখেই ঠায় তাকিয়ে। মাথাটা ঘোরায়নি। চোখের মণি দুটো কোণে সরে গিয়ে সাদা অংশটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। দাঁতগুলো ফাঁক ফাঁক। তাতে হলুদ ময়লা।
