হোয়াট ইজ দিস? অ্যাাঁ, নোংরা বলের হাওয়া মুখের উপর? রাগে ঠকঠক করে বাসু নাগ কাঁপতে থাকলেন। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, আহ উইল কল পুলিশ, পুলিশ ডাকব। তেল বার করে ছাড়ব।
ডাক তোর পুলিশ, আমিও দেখে নোব তোর বনেদিপনার তেল কত। বুঝলে সত্য, যত রাজ্যের মেয়েলি পরচর্চা, পরনিন্দে হল এই লোকটার পেশা। ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে কী বলেছে জান? বলেছে ইলার মা নাকি অনন্ত সিংগির বিয়ে-করা বউ নয়। মুদির কাছে কী বলেছে জান? নোটজালের কারবারিদের সঙ্গে আমার দোস্তি আছে। আরে বাবা নিজের চরকায় তেল দিয়ে তারপর কথা বলতে আসুক। মাসের মধ্যে দশ দিন তো উনুন ধরে না।
আমার উনুন ধরে কি ধরে না তা দিয়ে কার বাপের কী? বাসু নাগ রাস্তায় লাফাতে শুরু করলেন। অনন্ত সিংগি একটু পিছিয়ে গিয়ে বললেন, খবরদার বাপ তুলবে না, তাহলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে বলছি।
তোমরা শুনে রাখো, আমায় থ্রেট করল। আমাকে খুন করবে বলল।
মিথ্যে কথা, খুন করব বলিনি। সত্য তুমিই বলো?
সত্যচরণ ফাঁপরে পড়ল, এখনও সে মনস্থির করতে পারেনি কার পক্ষ নেবে। সিংগিমশাইকে কোণঠাসা হতে দেখে বাসু নাগের দেহ মনে মত্তহস্তীর বল দেখা দিল। গামছাটাকে মালকোঁচা করে এগিয়ে গেলেন।
বাপের বেটা যদি হোস তো আয়, খুন কর দেখি, চলে আয়।
অনন্ত সিংগির ভাই বসন্ত সদ্য বাড়ি ফিরে ব্যাপার শুনেই সেইমাত্র এসে হাজির হয়েছে। বসন্ত রগচটা লোক। বাসু নাগের আহ্বানে সে এগোল। আর ঠিক সেই সময়েই অন্ধকার নামল ঘোষপাড়া লেনে।
শুয়ে রয়েছে পারুল। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে রবীন। উপরে গিয়ে দেখবে তালাবন্ধ। চাবি নিয়ে পারুল উঠল।
অ বউ, কোথায় চললি? খোকা ফিরল? অ বউ সাড়া না দিয়ে যাচ্ছিস কোথা?
যমের বাড়ি। দাঁতে দাঁত ঘষে পারুল।
বুড়ির মুখের সামনে চড় তুলল। বুড়ি দেখতে পেল না, পারুল বেড়ালের মতো উপরে উঠে গেল।
সেই মাথাধরার ওষুধটা আছে?
বন্ধ দরজার সামনে রবীন দাঁড়িয়ে ছিল। পারুলকে দেখে এবং বাসন্তীকে না দেখে জড়সড় হয়ে পড়েছে। তোতলার মতো বলল, কীসের ওষুধ, কোন ওষুধ।
আঃ! আপনাকে দু-বার করে না বললে কিছুই বোঝেন না। মাথাধরার ওষুধ, মাথাধরার। ছিঁড়ে পড়ছে মাথাটা।
দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দু-হাতে চেপে ধরল কপালটা, অস্ফুট যন্ত্রণায় আক্ষেপধ্বনি তুলে মাথা ঝাঁকাল।
ওষুধ তো বহুদিন আগে একটা কিনেছিলুম। মলম। এখনও আছে কি না…
জানেন না। পারুল ধমক দিল যেন, বাড়িতে এমন একটা কেউ নেই যাকে বলব মাথাটা টিপে দিক। আপনাকে বলা তো বৃথা। বউ বাড়িতে নেই, এখন তো আমার দিকে তাকাতেও সাহস পাবেন না।
কেন, আমি কি ভীতু? এই তো তাকাচ্ছি।
সাহস বোঝাবার জন্য রবীন চোখ দুটো বিস্ফারিত করল। পারুল মুখ টিপে হাসল। রবীন সে-হাসি দেখল।
সাহস বোঝা গেছে, তখন যেভাবে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়লেন। পারুল আঁচলটা মুখে চাপল হাসি লুকোতে এবং মুখ লুকোতে কুঁজো হয়ে পড়ল। শেষে বউয়ের উপর রেগে আমাকেই এক ঘা দিয়ে দিলেন। আমি কি আপনার বউ?
মোটেই আমি মারিনি। রবীন ব্যাকুল হয়ে পড়ল। মুখ থেকে আঁচল নামিয়ে পারুল গলা খাটো করে বলল, যাক আর মিথ্যেকথা বলতে হবে না। এখনও ব্যথা করছে জায়গাটা। একে মাথার যন্ত্রণা তার ওপর আপনার যন্ত্রণা। বক বক করিয়ে আরও বাড়িয়ে দিলেন, দিন না বাপু মাথাটা টিপে।
রবীনের হাতটা ধরে পারুল হ্যাঁচকা টান দিল। উভয়ের ব্যবধানটুকু তাতে ঘুচে গেল। হাতটা কপালে রেখে পারুল বলল, বউকে অত ভয় করেন কেন।
আর ঠিক সেই সময়েই, ঘোষপাড়া লেনে দপ করে অন্ধকার নামল।
সত্যি বলছি, রোজ জানলার কাছে সেইজন্য অপেক্ষা করি। ঘুমভাঙা ফোলা ফোলা চোখ, সকালের বাতাসে চুলগুলো কপালের ওপর ফুরফুর করে ওড়ে। যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় তোমাকে দেখি। ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়ে তোমার পিছু পিছু কলেজ পর্যন্ত যাই। তারপর ভাবি—না:, চ্যাংড়া ছেলেরা এসব করে। তুমি হয়তো আমাকে তাই ভাবতে পার।
শুনতে শুনতে নুয়ে পড়ল মানুর মাথা। নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, আপনার সম্বন্ধে এইরকম ভাবব তাই-বা আপনি ভাবলেন কী করে? আপনি কি আর সবায়ের মতো।
মানুর স্বরে ক্ষোভ, অভিমান যেন। ভোম্বল ভাবল, এর দ্বারা কি এই বোঝায় যে মানু তাকে মোটেই চ্যাংড়া ভাবে না। তাহলে কী ভাবে?
আচ্ছা যদি তোমার কলেজ পর্যন্ত যাই, অনেকটা পিছনেই থাকব অবশ্য কেউ বুঝতেই পারবে না, তাহলে তুমি কি রাগ করবে?
মানুর মাথা আবার নুয়ে পড়ল। ভোম্বল বাক্যহারা। পলকহীন। মানু এক বার চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে হার মেনে জানলার কাছে উঠে গেল। মাথাটা কাত করে ত্যারছা চোখে দেখল ধূসর মোটর গাড়িটা দাঁড়িয়ে।
এখনও বেরোয়নি, শুনেছি নিজের পিসি হয় মাস্টারনি।
আমাদের সঙ্গে এক ইয়ারেই বিএ পাস করেছে। আমি সিটি ও স্কটিশ। ভোম্বল উঠে গিয়ে তাক থেকে একটা বই পেড়ে নিল। বড়োবউদির বাচ্চা ছেলেটা এইমাত্র দরজায় উঁকি দিয়ে গেল। নিশ্চয় মা-র কাছে রিপোর্ট করবে, তিনি হয়তো এক বার এসে ঘুরে যাবেন।
পড়াশুনোয় এমন-কিছু ছিল না, তবু দ্যাখো হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে, শুধু চেহারার জন্য। ওর পার্ট তোমার ভালো লাগে?
মানু এইবার চোখে চোখ রাখল। বড়ো করে মাথা নেড়ে বলল, মা গো, কেমন যেন। মেয়েলি মেয়েলি।
খুশিতে হাসল ভোম্বল। ওকে দেখার জন্য মেয়েরা কেন যে এত ব্যস্ত হয়!
বইয়ের পাতা উলটোতে শুরু করল সে। মানু জানলা থেকে পা-পা করে করে সরে এল। দরজায় দিকে তাকাল ভোল। গলা খাঁকারি দিয়ে নীচু গলায় বলল, কই বললে না তো সেকথার জবাব।
