ওঠ ওঠ, দেখতে যাবি তো চ এইবেলায়। পারুলকে ঠেলা দিল বাসন্তী। যন্ত্রণায় মুখ বেঁকিয়ে পারুল বলল, সত্যি বলছি, ভয়ংকর মাথা ধরেছে।
সাধাসাধি করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। চাবিটা পারুলকে দিয়ে বলল, ছেলেটা রইল. কাঁদলে দেখিস। আমি এখুনি আসছি।
শেফালির সঙ্গে বাসন্তী বেরিয়ে গেল। দালানের কোণ থেকে বুড়ি বলল, অ বউ, তোর কী হয়েছে?
রাস্তার আলোর নীচেই গাড়িটা। একটা বেড়ালবাচ্চা গুটিগুটি এসে গাড়ির নীচে ঢুকল। অনন্ত সিংগি বৈঠকখানা থেকে তা লক্ষ করে উঠে এসে হাঁকডাক শুরু করলেন। ওঁর ভাবভঙ্গিতে সেই জিনিসটিই প্রকট, যার দ্বারা অন্যের এই ধারণা হয়—গাড়িটির অভিভাবক তিনিই। বেড়ালবাচ্চাই হোক আর একটা মাছিই হোক, কাউকেই তিনি রেয়াত করবেন না।
এ সবই হচ্ছে ডেঞ্জারাস। চুপচাপ রয়ে গেল কেউ জানল না, তারপর গাড়ি স্টার্ট দেওয়ামাত্রই চটকে গেল। অযথা একটা প্রাণীহত্যা। দেখেছি যখন, তখন বার করে দেওয়াই ভালো।
নিশ্চয়। সত্যচরণ বলল, মরলে তো রাস্তাটাই নোংরা হয়ে গেল। কাক এসে ঠুকরে নিয়ে এখানে-ওখানে উড়ে বসবে। আপনি ঠিকই বলেছেন।
উবু হয়ে সত্যচরণ হুশ হুশ শুরু করল। বেড়ালবাচ্চা ভয়ে সিঁটিয়ে দেয়াল ঘেঁষে বসে রইল। ফ্যালা মোড় থেকে দেখল গাড়ির নীচে সত্যচরণ কী খোঁচাচ্ছে। ছুটে এল সে।
দ্যাখো তো ফ্যালা, ওটাকে বার করা যায় কি না, গাড়ি চললেই তো চাপা যাবে। সিংগিমশাই বললেন।
তাই ওটাকে বার করে দিচ্ছিলুম। সত্যচরণ কৈফিয়ত দিল।
ফ্যালা নীচু হয়ে দেখল। দেখে বলল, স্টার্টের আওয়াজ শুনলেই ব্যাটা সটকান দেবে। আছে থাক।
নীচু হয়ে যখন দেখছিল, তখন একটা ব্যাপার ফ্যালার চোখে পড়ল। গাড়ির পিছনে মাল রাখার ক্যারিয়ারের চাবিটা ভাঙা। ডালাটা একটু ফাঁক হয়ে রয়েছে।
তাই বলে চীনারা মহান জাতি, চীনাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই। নেহরু এই যে সব বলল, এটা কি বলা ঠিক হয়েছে? অ্যাজ এ প্রাইম মিনিস্টার অব ইণ্ডিয়া, তাঁর তো ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত।
কী এমন অন্যায় বলেছে নেহরু। পিসতুতো শালার বিলেতফেরত জামাই গম্ভীর হবার চেষ্টা করল। কালীবাবু নার্ভাস বোধ করলেন।
চীনেরাই তো আমাদের অ্যাটাক করেছে।
তা করেছে।
ওরা তো এনিমি।
নিশ্চয়।
তবে কেন ওরা মহান?
ঊরু চাপড়ালেন কালীবাবু। জামাই কী-একটা বলতে যাচ্ছিল, থামিয়ে দিয়ে দুলতে দুলতে বললেন, মানি নেহরু খুব শিক্ষিত কালচার্ড। আমরা তাঁর সমকক্ষও নই। কিন্তু ইনিই তো বলেছিলেন সুভাষ যদি আসে তো তরোয়াল নিয়ে তাকে রুখব। কী, বলেছিল তো?
জামাই কিছু বলতে যাচ্ছিল, কালীবাবু হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কাশ্মীরে যখন ইণ্ডিয়ান আর্মি মোচোলমানদের ঠেঙাতে ঠেঙাতে পগারপার করছিল তখন যুদ্ধ বন্ধ করে ইউএনও-তে মামলা করার কী দরকার ছিল? পনেরো বছরেও তো মামলা মিটল না। বুঝলে বাবু, শুধু শিক্ষা কালচার দিয়ে একটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। এজন্য দরকার ডিক্টেটর। চাবুক হাতে নিয়ে দেশশাসন করতে হয়। হিটলার করেছিল, স্ট্যালিন করেছিল, তবেই-না চড়চড় করে ওরা বড়ো হতে পারল।
বাবাজি রীতিমতো ঘায়েল। সত্যচরণ থাকলে কী অবাকটাই-না হত। কালীবাবু দুলে দুলে আপশোস মেটাতে লাগলেন। জামাই অস্ফুটে বিড়বিড় করে দেয়ালে-টাঙানো চারুশীলার সূচিশিল্পের নমুনা দেখতে লাগল।
প্রথম রাউণ্ড জিতে কালীবাবুর উৎসাহ বেড়েছে। দ্বিতীয় রাউণ্ড শুরু করলেন।
আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, ইণ্ডিয়ার নন অ্যালাইড থাকা উচিত?
জবাবের জন্য কালীবাবু উদগ্রীব। জামাই তখনও চারুশিল্পে মগ্ন। ঠিক সেই সময়েই দপ করে আলো নিভে গেল। লোডশেডিং। ঘোষপাড়া লেন এলাকায় আজ অন্ধকার নামল।
আঃ, আবার। এই এক জ্বালা হয়েছে রোজ রোজ। চারুশীলা ছুটে এল নীচ থেকে। কালীবাবুকে ঘরের বাইরে ডেকে বলল, মোমবাতি আনতে বলেছিলুম, এনেছ?
এই যা। বলেই দুড়দুড় করে নেমে তিনি রাস্তায় পড়লেন। গোটা অঞ্চলটাই মিশমিশে। এখন দশ চক্ষু হয়েও কেউ কাউকে চিনতে পারবে না।
কে বলেছে ওটা আমার ছেলের বল?
রবারের বলটা বাসু নাগের মুখের সামনে তুলে অনন্ত সিংগি বলল, বলটা তবে কার? কার তা আমি কী করে বলব। উইদাউট এনি প্রুফ বললেই হল? ওরকম বল হাজার হাজার থাউজেণ্ড অ্যাণ্ড থাউজেণ্ড ছেলের কাছে পাওয়া যাবে। আমি জানতে চাই, আই ডিমাণ্ড, আমার ছেলেকে কেন, কীসের ভিত্তিতে দায়ী করা হচ্ছে যে সে বলটা আপনার ঠাকুরঘরে ছুড়েছে?
বাসু নাগ গামছা পরে সদর দরজায় চিৎকার জুড়েছে। আশপাশের বাড়ি থেকে অনেকেই বেরিয়ে এসেছে। লোকজন দেখে তার চিৎকার বাড়ল। স্রেফ আহম্মকি। গায়ে পড়ে ঝগড়া। অবশ্য কারণটাও জানি।
কী কারণ? কী জান? সিংগিমশাই রুখে উঠলেন।
গরম, পয়সার গরম। ওরকম পয়সা ঢের ঢের দেখেছি বুঝলেন, গাড়ি একসময় আমাদেরও ছিল। গাড়ি দেখাতে আসবেন না। পয়সা আজ আছে কাল নেই কিন্তু বনেদি বংশের শিক্ষাদীক্ষা চিরকাল রক্তে থেকে যায় বুঝলেন।
সত্যচরণ এই সময় বলল, ব্যাপারটা কী? বাসুদা চটলে কেন গা?
আর বলিস কেন ভাই, ইনি এসে বলছেন এই বলটা নাকি আমার ছেলে ওঁর ছাদে ঠাকুরঘরে ছুড়েছে। কোনো প্রুফ নেই, কোনো উইটনেস নেই। একেবারে চড়াও হয়ে এসে হম্বিতম্বি।
আলবাত তোমার ছেলের বল এটা। এই যে ফুটো, টিপলে চুপসে যায়। বলটা বাসুর মুখের সামনে ধরে সিংগিমশাই টিপলেন। হাওয়াটা বাসুবাবুর মুখে লাগতেই তিনি আঁতকে পিছনে লাফ মারলেন।
