অনন্ত সিংগির বাড়ির দোরে মোটরটাকে দেখতে পেয়ে বাসু নাগ এগোলেন না। ভাবলেন, বেটা নিশ্চয় এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখান দিয়ে গেলেই দেখিয়ে গাড়িতে পা তুলে দাঁড়াবে। গাড়িটা কি কিনল? হারামজাদার পয়সা আছে বটে তবে কিপটে, তা ছাড়া মুখও।
বাসু নাগ বাড়ি ফিরে সটান ছাদে উঠলেন। বলটা প্রাণপণে ছুড়ে দেবেন যেদিকে খুশি। কিন্তু কোনদিকে ছোড়া যায়? নজর পড়ল অনন্ত সিংগির ছাদের ঘরটা। ওটা ঠাকুরঘর। দরজাটাও ভোলা রয়েছে। বাসু নাগ রাগ করে বলটা ছুড়ে দিলেন।
মনীষা অর্থাৎ মানু এসেছে। মেজোবউদি বাপের বাড়ি গেছে সকালে, এখনও ফেরেনি। বড়োবউদি ইনফ্লুয়েঞ্জায় শয্যাশায়ী। দাদারা বাড়ি নেই। ভোম্বল যে কী করবে ভেবে পেল না। তাই যথারীতি বলল, এই যে।
মনীষা হাসল।
পাড়ায় ওটা কার গাড়ি ভোম্বলদা? শুনলুম নাকি…
থেমে গেল। তারপর বুকের আঁচল ঠিক করে একটু আদুরে গলায় ওপরে আপনার ঘর থেকে তো দেখা যায়। রাস্তায় বেরোলে দেখব।
ভোম্বলের মুখে রা নেই। মানুর পিছু পিছু ঘরে এল।
সিনেমায় অনেক বার দেখেছি। এমনি চোখে তো দেখিনি, কেমন দেখায় তাই দেখতে এলুম। এত সুন্দর ন্যাচারাল পার্ট করে-না—জানেন ও কিন্তু মেয়েদের খুব ফেভারিট।
ভোম্বল হাসল। মানুকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু অস্বস্তি লাগছে, বাড়িতে কেউ নেই। মেজোবউদিও যদি থাকত। যদি এই নিয়ে কথা ওঠে? বড়োবউদি অল্পবিস্তর কুচুটে।
নীচের ঘর থেকে দেখলে হত না?
কেন, আপনার ঘরে অসুবিধে কী?
মানুর পালটা প্রশ্নে ভোম্বল দিশাহারা হল।
মানে, কেউ তো বাড়ি নেই, নীচের দরজাটা খোলা।
তাতে কী হয়েছে?
কেউ যদি কিছু বলে?
মানু যেন কুপিত হয়েছে এমন মুখভঙ্গি করে বলল, কেন আমি কি খুব খারাপ মেয়ে যে অপবাদ দেবে?
তা নয়, মানে…
রাগ করে মানু বেরিয়ে যাচ্ছে। হায় হায় করে উঠল ডোম্বলের অন্তরাত্মা। এ কী করে বসল সে, মানু যে চলে যাচ্ছে। প্রায় ছুটে গিয়ে সে মানুর হাত ধরল।
অপবাদে আমিও ভয় পাই না।
মানু হাসল। লাজুক সুরে বলল, কী যে করেন।
হাত ছেড়ে দিয়ে ভোম্বল টুলের উপর বসল। ঘাড় হেঁট করে মানু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু এভাবে চুপ করে থাকা বা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কেউই প্রস্তুত নয়। সুতরাং মানু ঘরের ভিতর এসে বলল, আপনার ঘরটা খুব টিপটপ, সাজানো, আপনি খুব গোছানো।
ভোম্বল হাসল এবং ভাবল মানুও খুব টিপ টিপ।
আচ্ছা আপনি যে অত বই কিনেছেন, এর সব পড়া হয়ে গেছে?
ভোম্বলের বুক দুলে উঠল।
তা না হলে কি অমনি সাজিয়ে রেখেছি? সগর্বে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে, প্রত্যেকটা লাইন পড়া।
মুগ্ধ হয়ে মানুও বইগুলোর দিকে তাকাল।
বাবা বলছিল, এপাড়ায় আপনার মতো কোনো ছেলে নেই। সত্যি, পাড়ার ছেলেরা যা হয়েছে-না.. জানেন বরুণবাবুর এক বোন এসেছে-না, মেয়েটা ভারি বেহায়া চাল্লুশ। আর পাড়ার যত বখাটে ছেলে ওদের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করবে। ফ্যালার সঙ্গে নাকি এর মধ্যেই ভাব হয়ে গেছে।
তাই নাকি?
ওমা, পাড়ার সবাই তো জেনে গেছে।
মানু খাটের ওপর বসল। সানের দেয়ালে আয়না, মুখ দেখা যায়। আয়নার দিকে তাকিয়ে। বলল, আপনি তো নামেও ভোম্বল, কাজেও ভোম্বল।
বটে, তাই নাকি। আমিও অনেক খবর রাখি তা জান?
মানু সচকিত হল। চুলের একটা গুচ্ছ কপালের ওপর ঝুলিয়ে দিলে কেমন দেখাবে সেইটা পরীক্ষা করে দেখতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছেটা দমিয়ে ব্যগ্রস্বরে বলল, কী? কীসের খবর?
মানুর চোখে খানিকক্ষণ চোখ রেখে ভোম্বল বলল, মনীষা বলে একটা মেয়ে এ-পাড়ায় আছে সে খুব সুন্দরী, তা জান?
বুঝতে একটু সময় লাগল। তারপর দু-হাতে মুখ ঢেকে কুঁজো হয়ে মানু বলল, কী। অসভ্য।
মুখটা তোলার সময় মানু আঙুল দিয়ে চুলের গুচ্ছটা চট করে কপালের উপর টেনে ফেলল। ভোম্বল দেখতে পেল না। মুখোমুখি বসে থাকতে লজ্জা করল তার। উঠে জানলায় গেল। ফিরে এল। বসল। আয়না দেখল। ভোম্বলের দিকে তাকাল। বলল, মেজোবউদি কখন আসবে?
সময় তো হয়ে গেছে।
আবার চুপচাপ।
মেজোবউদি বলছিল একদিন প্ল্যানেটোরিয়াম দেখতে যাবে। কেউ না-নিয়ে গেলে বাবা যেতে দেবে না। ওসব দিকে যেতেও কেমন যেন লাগে। গড়ের মাঠটা এমন-না… কোথায় যে বাস থেকে নামতে হবে…
সামনের রোববার চলো-না, যাবে?
আমি কী জানি, মেজোবউদি যদি যেতে চায় তবেই তো।
তোমার বাড়িতে কিছু বলবে না?
ঘাড় নাড়ল মানু। আপনি তো সঙ্গে থাকবেন।
টুল থেকে উঠে খাটে বসল ভোম্বল।
শেফালি এসে বলল, অ বউদি দেখতে যাবে?
পারুল বিছানায় শুয়ে। কপালে হাত, চোখ বন্ধ। মাথা নেড়ে বলল, মাথা ছিঁড়ে পড়ছে। ভাই, ভীষণ ধরেছে।
বলেই মুখভঙ্গি করল যন্ত্রণায়, তাই দেখে শেফালি কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ির পথ দেখল।
বাসন্তী শাড়ি বদলে চুল আঁচড়াচ্ছে। শেফালি বলল, বউদি, তারকাদের গলির মধ্যে একতলা একটা বাড়ি আছে, তার নীচের ভাড়াটেদের ঘর থেকে কিন্তু মাস্টারনির ঘরের খানিকটা দেখা যায়, যাবে?
বাসন্তী থ। এত বড়ো একটা খবর পেয়ে কী যে করবে সে।
ঠিক জান? দেখা যায়? একটুখানি, একবার হলেই হবে।
ছোটোবেলায় ও-বাড়িতে যে খুব যেতুম। তখন যে ভাড়াটে ছিল তাদের একটা মেয়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল। আমি জানি, উঠোনের ডান দিকের ঘরটায় একটা ছোট্ট জানলা আছে।
পারুলকে ডেকে বলে নাও। আমি দরজায় তালা দিই।
নীচের বউদির মাথা ধরেছে, যাবে না।
সে কী?
বাসন্তী দরজায় তালা দিয়ে চাবি হাতে নামল।
