তিন মাস ধরে তো দেব দেব কচ্ছেন। আর ধারে হবে না।
আত্মসংবরণ করো। গম্ভীর স্বরে ফ্যালা বলল, ঠিক আছে সামনের হপ্তায় শোধ করে দোব। ঠাকুর নিজ হাতে প্যাকেট এগিয়ে দিল।
ইতস্তত করে ফ্যালা নিল। কানের ডগা দুটো ঝাঁঝাঁ করছে।
কত টাকা বাকি? স্বরটা কেঁপে উঠল।
ছ-টাকা বারো আনা।
ফ্যালা আসতেই ওরা ছোঁ দিয়ে প্যাকেটটা কেড়ে নিল।
ওরেব্বাস, ক্যাপস্টান!
কাল ছাতে উঠেছিল। মালা সিনহা একদম মাইরি, মাইরি।
কেন, মুখের আদলটাও ঠিক হুবহু।
ওর দাদার সঙ্গে ভাব করে নে-না, লোকটা কনজারভেটিভ নয়। অফিসের বন্ধুদের নিয়ে তাস খেলে, বউ তাদের সঙ্গে খেলে।
কোঁতপেড়ে গিয়ে ফুক ফুক করে ওরা ধোঁয়া ছাড়ল। ফ্যালা রেগে উঠল আপন মনে। কিন্তু রাগটা প্রকাশ করার কোনো মওকা আপাতত পাচ্ছে না। জোরে জোরে টান দিয়ে সিগারেটটাকে নিঃশেষ করে রাস্তায় আছড়ে ফেলল।
কিছু টাকা জোগাড় করতে হবে।
ওরা ফালার দিকে তাকাল। কেউ কিছু বলল না।
কালীবাবু পাঁচ বছর অন্তর বাড়ির কলি ফেরান। দুটি মেয়ের বিয়ে দিয়ে এখন ঝাড়া হাত-পা। চারুশীলা ওরফে শীলার সঙ্গে ঝগড়া করা ছাড়া বাহান্ন বছর বয়সে তাঁর আর কোনো শখ নেই। অবশ্য নিয়মিত রেডিয়োর থিয়েটার শশানেন আর সত্যচরণকে মাঝে মাঝে রাজনীতি বুঝিয়ে থাকেন। চারুশীলার জ্বালা ঝিয়েদের নিয়ে। ওরা আসে হতকুচ্ছিত চেহারা নিয়ে। তারপর কেমন যেন পরিপাটি হয়ে যায় চারুশীলার নজরে। চুলে তেল, গায়ে ব্লাউজ, মুখে পান, ঢলানি ঢলানি ভাব। কালীবাবুও সকাল সকাল অফিস থেকে ফিরে উঠোনের ধার ঘেঁষে জানালায় বসে রেডিয়োর কীর্তন শোনেন নয়তো খবরের কাগজ পড়তে শুরু করেন। তুলকালাম ঝগড়া বাঁধে। ঝি বরখাস্ত হয়ে যায়। রাত্রে পারুল-বাসন্তী ও-বাড়ির কর্তা-গিন্নির ঝগড়া শুনে মুখ টিপে হাসে আর ফিসফিস করে।
ওরা যে কী অত ফিসফিস করে চারুশীলা তাও জানে। অনিলের মা এখন আর অতটা আঁটসাট নেই, ওদের বাড়িতে কাজ করার সময় যতটা ছিল। অনিলের ছোটো দুই ভাই নাকি চারুশীলার দুই মেয়ে ভূতি আর টুনুর মতো হুবহু দেখতে। কেন হল? এ বিষয়ে পারুলের গবেষণার ফলাফল চারুশীলা শেফালি মারফত জেনেছে। এবং চারুশীলার মতামত পারুলকে সযত্নে জানিয়ে গেছে শেফালি।
কালীবাবু আজ বাড়ি ফিরলেন সন্দেশের বাক্স হাতে। স্ত্রীর পিসতুতো ভাইয়ের নতুন জামাইয়ের রাত্রে নেমন্তন্ন। ছেলেটি বিলেতফেরত, সাহেব কোম্পানিতে আটশো টাকায় ঢুকেছে। খুব বড়ো ঘরের ছেলে, বাপ রায়বাহাদুর।
বাড়ি ঢোকার মুখেই কালীবাবুর মনে পড়ল, ইসবগুলের ভুসি ফুরিয়েছে। এখনই না কিনে রাখলে রাতে কেনার কথা মনে নাও থাকতে পারে। অতিথিকে ফেলে মুদি-দোকানে ছোটা উচিত হবে না। এইসব ভেবে কালীবাবু নিজের বাড়ির দরজা থেকেই আবার ফিরলেন। বাসুদেববাবুর বাড়ির কাজ সেরে অনিলের মা-ও তখন ফিরছিল।
মুদির দোকানটা ষোলো হাত রাস্তার উপর বস্তির গলিটার মুখেই। সুতরাং দুজনের গন্তব্যই একমুখী। কালীবাবু যখন ইসবগুল কিনছেন তখন অনিলের মা-ও কাপড়কাচা সোডা কিনতে ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ফ্যালা সেইমাত্র বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। নজরে পড়ল কালীবাবু যেন ফিসফিস করে অনিলের মাকে কী বললেন। অতঃপর ভুসি কিনে কালীবাবু বাড়িমুখো হলেন।
চারুশীলা এটুকু লক্ষ করেছে, বাড়িতে পা দিয়েই কালীবাবু গেলেন। ফেরা মাত্রই সে কারণটা জানতে চাইল। এতে কালীবাবু হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, এত খোঁজে দরকার কী, কোথায় যাই বা না যাই?
চারুশীলা কথা বাড়াল। ব্যাপারটা পরে জেনে নেওয়া যাবে, এখন ময়দা মেখে বেলে রাখতে হবে। হাতের কাজ সেরে না রাখলে জামাইয়ের সঙ্গে গল্প করার সময় পাওয়া যাবে না।
আঙুর অর্থাৎ অনিলের মা দশটা টাকা চেয়েছে। আজকেই চাই। কালীবাবু বলেছেন, রাত্রে গিয়ে দিয়ে আসব। চারুশীলার দাদার জামাই আসবে একটু পরেই, তার সঙ্গে বসে ভ্যাজভ্যাজ করতে হবে। খেয়ে দেয়ে বিদেয় হতে রাত দশটা। অত রাতে বস্তিতে ঢুকলে যদি কেউ দেখে ফেলে। বখাটে ছোঁড়াগুলো তো ওখানেই গুলতানি করে, তাহলে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। কমপক্ষে চার মাস আঙুরকে স্পর্শ করা হয়নি। থলথলে, দলমলে মাংসের স্কুপে আঙুল ডুবিয়ে—ভাবতে ভাবতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলেন কালীবাবু। গোটা কতক ভারী নিশ্বাস পড়ল। নানা ধরনের যৌনছবি মাথার মধ্যে ফুটে উঠছে আর তখনই ঘরের আলো জ্বেলে চারুশীলা গনগনে স্বরে বলল, এইমাত্র চাদর ভেঙে পাতলুম, আর ময়লা কচ্ছ। নীচের ঘরে গিয়ে বসো-না। আসার সময় তো হল।
কালীবাবু উঠে বসে বললেন, শরিরটা কীরকম ম্যাজম্যাজ করছে। শীলু, এক কাপ চা করে দাও-না।
বাসু নাগ বাড়ি ফিরেই পায়খানা যান। এটা তাঁর বাইশ বছরের অভ্যাস। পালন করতে গিয়ে টের পেলেন প্যানের মধ্যে কিছু-একটা পড়ে বুজে রয়েছে। বলাই বাহল্য এতে তিনি চটলেন। ধকলটা গিয়ে পড়ল স্ত্রীর উপর। তিনি সাত চড়ে রা করেন না।
তোমরা জেনেশুনেও চুপ করে দেখছিলে। আগে বললে বাঁ-হাত দিয়ে তুলে নিতুম। এখন তুলি কী করে?
অতঃপর ছোটোছেলে নালুকে তিনি বেধড়ক কয়েক ঘা দিলেন। হতচ্ছাড়াটার পড়াশোনা নেই, দিনরাত শুধু বল খেলা আর বল খেলা। এখন এই বল তুলবে কে? স্ত্রী পরামর্শ দিলেন একটা ধাঙড় ডেকে আনলেই সমস্যাটা মিটে যায়।
সন্ধ্যার পর ধাঙড়রা পায়খানা থেকে বল তোলার জন্য নিশ্চয় বসে নেই। স্ত্রীকে এই কথাটা জানিয়ে বাসু নাগ কয়েক বালতি জল ঢেলে বলটিকে তুললেন এবং পাছে নালু সেটিকে হস্তগত করে তাই রাস্তায় বেরোলেন পরিত্যাগ করে আসতে। বল আর বেড়ালে কোনো তফাত নেই, যেখানেই ছেড়ে এসো-না কেন ঠিক বাড়ি ফিরে আসবে। তাই গলির বাইরে বড়ো ডাস্টবিনে ফেলার উদ্দেশ্যে বাসু নাগ রওনা হলেন।
