সত্যচরণকে ভোম্বল পছন্দ করে না। তাই স্বল্প কথায় উত্তর দিল, কী জানি।
সত্যচরণ ডিঙি মেরে কিছু-একটা অতিক্রম করে, টিউবওয়েলের চৌহদ্দিতে পৌঁছে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
যত রাজ্যের গু-মুত চাকায় চাকায় এবার পাড়ার মধ্যে ঢুকতে শুরু করল। চেঁচিয়ে বলেছিল যাতে ভোম্বল শুনতে পায়, মোড় থেকে ফ্যালা ছুটে এল। কেন, চাকায় আসে আর লোকের পায়ে পায়ে আসে না? রাস্তাটা কি আপনার ঠাকুরঘর?
সত্যচরণ গভীর মনোযোগে বালতি ধুতে শুরু করল। ভোম্বল কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসাটা করেই বসল, ফ্যালা গাড়িটা কার?
বউ, অ-বউ কোথায় গেলি? খোকাকে বলিস কিন্তু কচুর মুখী আনতে। অ-বউ বাজার যাবার সময় খোকাকে মনে করে বলিস কিন্তু। বড়ি দিয়ে ঝাল করিস।
থুথুড়ে শাশুড়ি, দালানের এক কোনায় সকাল-সন্ধে উবু হয়ে বসে থাকে। হামা দিয়ে নর্দমা পর্যন্তও যেতে পারে না। চোখে দেখে না, কানে কম শোনে।
অ-বউ খোকা ফিরেছে? এরপর বিরক্ত হয়ে—আঁটকুড়ির গেরায্যি নেই। মর তুই, খোকার আবার বিয়ে দোব, দেখি তোর দেমাক থাকে কোথায়।
বুড়ি এখন ঘণ্টা খানেক এইভাবে কথা বলবে। কিন্তু যাকে শোনাবার জন্য, সে তখন দোতলায় ভাড়াটে বাসন্তীর রান্নাঘরের দরজায়।
আচমকা ধাক্কাটা সামলে উঠে বাসন্তী বলল, বলিস কী পারুল, সত্যি? ওগো শুনছ? আমাদের পাড়ায়… বলতে বলতে বাসন্তী পাশের ঘরে ঢুকল।
শুনেছি। মেঝেয় চিত হয়ে গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তে পড়তে রবীন জবাব দিল। বাঁ হাতটা যন্ত্রের মতো ঘুমন্ত ছেলের মাথা চাপড়ে যাচ্ছে।
পারুল বলল, আমাকে ওবাড়ির শেফালি এসে বলল, ও দেখেছে। ঠিক ওদের বাড়ির সামনেই গাড়ি রেখে নামল। তারপর হেঁটে তিন নম্বর বাড়িতে গেল।
বাসন্তী বলল, আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে?
পারুল বলল, তা না তো আর যাবে কোদ্দিয়ে। রোজই তো বাপু এই সময় জানালার ধারে বসে এটা করি ওটা করি, কেউ গেলে চোখে পড়েই। আর আজকেই বরাত এমন–মাথার ঠিক কি আর আছে, বিকেল থেকে শাশুড়ি খালি খাব খাব করে যাচ্ছে।
অন্য সময় হলে পারুলের শাশুড়ির বিষয়ে শোনার মতো সময় হত বাসন্তীর। এখন হাঁসফাঁস করে বলল, ওগো দেখে এসো-না এক বার।
কেন?
যদি রাস্তা দিয়ে দেখা যায় তাহলে আমরাও গিয়ে দেখব।
রাস্তা থেকে? রবীন মুখ থেকে বই নামাল। বাড়ির বউয়েরা রাস্তায় নেমে আজেবাজে লোকদের ঘা ঘেঁষে অন্যের জানালায় উঁকি দেবে?
অপ্রস্তুতে পড়ল দুজনেই। পারুল তো রেগেও উঠল। নিজের বউকে ঠেস দিয়ে তাকেও তো শোনানো হল। শাসন করতে হয় নিজের বউকে করো, সভ্যতা শেখাতে হয় তো নিজের বউকে শেখাও। দু-চারটে কথা পারুলের ঠোঁটেও এসে গেছল কিন্তু কয়েকটা ব্যাপারের কথা ভেবে ঢোক গিলল। ব্যাপারগুলি হল : রবীনের অফিসে নব্বই টাকার একটা চাকরি খালি হয়েছে, ভাইয়ের জন্য পারুল কালকেই কথাটা পেড়েছে। এবাড়ির ছাদ ব্যবহারের একমাত্র অধিকারী দোতলার ভাড়াটে যেহেতু ভাড়া বেশি দেয়। যেকোনো মুহূর্তেই একতলার লোকদের ছাদে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়াও বাসন্তী মৃতবৎসা দোষ কাটানোর অব্যর্থ মাদুলির হদিস জানে।
আহা, আমরা কি আর ঠেলাঠেলি করতে যাচ্ছি। যদি চলতে চলতে দেখা যায় তাহলে নারুদের বাড়ি যাবার নাম করে এক বার ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নেব। ওতে তো দোষ নেই।
দরজার পাশ থেকে উঁচু গলায় পারুল বলল, সেদিন দক্ষিণেশ্বর যেতে কীরকম ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠতে হল।
সেদিন রবীন ওদের নিয়ে গেছল। এবং বাড়ি ফিরেই স্ত্রীর কাছে খোঁজ নেয়, যে-লোকটা বরাবর বাসে ওদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল তার স্বভাবটা কেমন? ফলে বাসন্তী ঝগড়া করে, না খেয়ে আলাদা শয্যা নেয়।
উঠে পড়ল রবীন। পাঞ্জাবিটা ঘাড়ে ফেলে হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরোল। সিঁড়িটা অন্ধকার। মুখস্থ থেকেও ভুল হয়ে গেল। দুটো সিঁড়ি একসঙ্গে টপকে তালগোল পাকিয়ে পড়ল। প্রথমে ছুটে নামল পারুল। হতভম্বের মতো রবীন তখনও বসে। পারুল বগলের নীচে হাত দিয়ে টেনে তুলতে গেল। পিছন থেকে শান্তগলায় বাসন্তী বলে উঠল, আমি দেখছি, তুমি সরো তো।
ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল রবীন। ওঠার সময় পারুলের বুকে কুনুইটা এত জোরে লাগল যে পারুলকে আঃ বলে উঠতে হল।
দালানের কোণ থেকে শাশুড়ি বলল, অ-বউ কী পড়ল রে।
ঠিক এইখানটায় আমি দাঁড়িয়ে আর গাড়িটা ওইখানে। হাত দুয়েক দূরে রাস্তার একটা জায়গা দেখিয়ে ফ্যালা বলল, মাত্র এইটুকু ডিস্টেন্স থেকে কথা হল।
জনা ছয়েক ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তারা সবাই চুপ করে থাকল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে গলিতে দাঁড়িয়ে-থাকা গাড়িটাকে দেখল।
ওর আর একটা গাড়ি আছে। সেটা আনলে গলিতে ঢুকত না। একজন বলল।
সকলে গলির মুখটাকে লক্ষ করল।
কে জানত বাবা গলির মধ্যে মোটর ঢুকবে, তাহলে চওড়া করেই তৈরি করত। আর একজন বলল।
শালার বাড়িগুলো ভেঙে না পড়লে আর গলি চওড়া হবে না। ফ্যালা বলল।
হ্যাঁ, সব বাড়িগুলো মাঠ হয়ে যাক শুধু উনিশের বি-টা বাদে।
এবার সবাই চাপা হাসল। উনিশের বি-তে বরুণ মিত্তির থাকে। সম্প্রতি ওর দূর সম্পর্কের এক বোন এসে রয়েছে। ফ্যালা তাকে ভালোবেসে ফেলেছে এবং ধারণা নমিতাও যে দরজার কাছে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়, একমাত্র তাকেই দেখার জন্য।
কথাটা শুনে ফ্যালা স্বভাবতই লাজুক হয়ে পড়ল। খুশিও হল। তাই মোড়ের ঠাকুরের পানের দোকানে গিয়ে হাঁকল, এক প্যাকেট ক্যাপস্টান।
ঠাকুর এক বার আড়ে তাকিয়ে পান সাজায় ব্যস্ত রইল। তাড়া দিল ফ্যালা। শুনেও শুনল না যেন। সাধারণত যা করে থাকে, ফ্যালা নিজেই সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিতে গেল। ঠাকুর ওর হাত চেপে ধরল। বিস্ময়ে ফ্যালা স্তম্ভিত।
