বাড়িগুলো কলিচটা; বালি বেরিয়ে পান্ডুরবর্ণ। ওর মধ্যেই কালীবাবুর বাড়িটা সদ্য কলি ফেরানো, ফলে মনে হয় গলিটার শ্বেতি হয়েছে। তেইশ নম্বরের ভাঙা ট্যাঙ্কের পাশে অশ্বথ গাছটা বাড়তে চাইলেই লাঠি পিটিয়ে ডালগুলো ভেঙে দেয় ও-বাড়ির সত্যচরণ। ফলে গাছটা ছোট্ট রয়ে গিয়ে ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি-জলের পাইপগুলো শিরার মতো দেওয়াল বেয়ে রাস্তা পর্যন্ত নামাননা, কিন্তু এবারের বল খেলার ধকল সইতে না পেরে তলার অংশ অধিকাংশেরই ভাঙা। জানালাগুলো লটপটে বুকপকেটের থেকেও অর্থহীন, ঝড়বৃষ্টিতে কাজে আসে না। গলিতে দাঁড়িয়ে আকাশে তাকালে প্রথমেই মনে হবে, চিরকুট শাড়ি ফেঁসে গিয়ে বিব্রত কোনো গৌরাঙ্গীর দেহ। গলিতে ঢোকার সময় মানুষজন মুখ তুলে তাকায়, বেরোবার সময় আড়ে আর এক বার।
টিউবওয়েলটা বসানোর ব্যাপারে অনন্ত সিংগির সঙ্গে বাসুদেব নাগের প্রচন্ড একচোট হয়ে গেছল। কুমার চৌধুরি কাউন্সিলর হয়েছে তাঁরই কৃপায়, এরকম একটা ধারণা সিংগিমশাই বরাবরই পোযণ করে আসছেন। সুতরাং কর্পোরেশনের টিউবওয়েলটা তাঁর বাড়ির সামনে বসবে না কেন? বাসুদেবের যুক্তিগুলো অবশ্য পাবলিক বেনিফিটের কথা ভেবেই বলা। তা ছাড়া সিংগিমশাইয়ের বাড়ির দেওয়ালে রাস্তার ইলেকট্রিক আলো বসেছে, টিউবওয়েলটাকেও কি তিনি নিজের সম্পত্তি করতে চান? পাড়ার পাঁচজনের কাছেই বাসুদেব গলা ফুলিয়ে প্রশ্নটা তুলেছিল। ফলে দু-ভাগ হয়ে যায় পাড়াটা। সিংগিমশায়ের বাড়ির সামনেই টিউবওয়েল বসেছে, মধ্যস্থতা করেছেন কালীবাবু। টিউবওয়েলের খ্যাচাং খ্যাচাং শব্দটা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না। তা ছাড়া রাস্তাটাও দিনরাত কাদা হয়ে থাকবে। তাই যুক্তি দিলেন ধরো হঠাৎ কারুর রান্নার জল ফুরিয়ে গেল, বাড়িতেও তখন কোনো পুরুষ বা ছোটো ছেলেপিলে নেই যে এক বালতি জল এনে দেয়, তখন কি বউ-ঝিরা রাস্তার মোড়ে গিয়ে কল থেকে পাম্প করে জল আনবে? বরং পাড়ার ভেতর দিকেই কলটা বসানো ভালো, দেখতেও ডিসেন্ট হয়। বেপাড়ার লোকেরা এসে কলটা খারাপ করে দিতে পারবে না।
বাসু নাগ সেই থেকে কালীবাবুর উপর চটা। বাড়ি সারাবার সময় কালীবাবু দো-তলায় বেআইনি একটা পায়খানা করে। বাসুগিন্নি খবরটা জোগাড় করে আনে, বাসুদেব সেটা কর্পোরেশনে জানিয়ে কালীবাবুর কিছু খসিয়ে দেয়। রাগটা তাতে অনেকখানি কমে গেছে।
ধূসর অ্যাম্বাসাডারটা সিংগিমশায়ের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে। বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে তিনি আর পথ খুঁজে পেলেন না। সুতরাং চিৎকার করলেন, গাড়ি কার অ্যা, রাখবার কি জায়গা পেল না; এটা লোকের বেরোবার পথ, এ কী অন্যায়।
কী হল, চ্যাঁচাচ্ছেন কেন?
ফ্যালা ছুটে এল। সিংগিমশায়ের মেয়ে হাসি রেডিয়ো থেকে গান তুলছিল, সে নেমে এল। সামনের বাড়ির ভবদেব অর্থাৎ ভোম্বলও জানালা থেকে উঁকি দিল।
এদের দেখে ফ্যালা কিছুটা ভারিক্কি হয়ে বলল, অচেনা লোক, আমিই বললুম এখানে রাখুন। তা নয় একটু ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছি।
ফ্যালার নির্দেশে গাড়িটা রাখা হয়েছে, এবং ফ্যালা দিন কয়েক আগেই বেপাড়ার একটা ছেলেকে গলির মধ্যে টেনে এনে ঠেঙিয়ে লাট করেছে। সিংগিমশাই চুপ করে রইলেন। বেনেটোলায় তাঁর গন্ধেশ্বর ভান্ডার নামে একটা দোকান আছে। বাড়িওলাটা হজ্জত শুরু করেছে, সিংগিমশায়ের মনোগত বাসনা–ফ্যালাদের দিন কয়েক ঘুরিয়ে আনবেন। সুতরাং ফ্যালাকে চটালেন না, বরং হাত লাগিয়ে তিনিও সাহায্য করলেন।
গাড়িটা দু-হাত এগিয়ে রাখা হল। বাসুদেব অফিস থেকে ফিরছিল। সিংগিমশায়ের বাড়ির সামনে গাড়ি দেখে বিস্মিত হয়ে তাকাল। তাই দেখে সিংগিমশায় ডান পা-টা পিছনের বাম্পারে তুলে দিয়ে শ্লথ ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। গাড়িটা যেন কোনো আত্মীয়ের এবং এতই নিকট যে পা পর্যন্ত তুলতে পারেন। বাসুদেব ঈর্ষাচ্ছন্ন হলেন। ফ্যালা দাঁত কিড়মিড় করে ভাবল, শালার ঠ্যাংটা ভেঙে দোব নাকি।
ভবদেব অর্থাৎ ভোম্বল, ঘোষপাড়া লেনের অত্যন্ত মানী ছেলে। বর্তমান বয়স চব্বিশ। স্কুলের ম্যাগাজিনে ধর্ম সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখে পাড়ার মাতব্বরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কলেজের ম্যাগাজিনে প্রগতিশীল কবিতা লিখে বড়দা, মেজদা এবং সেজদার দুশ্চিন্তা, ক্রোধ এবং বিরক্তি উৎপাদন করে। বর্তমানে সে এই পাড়ার একমাত্র যুবক যে গ্র্যাজুয়েট, একটি লাইব্রেরির সদস্য, রকে আড্ডা দেয় না, বড়োদের সামনে সিগারেট ফোঁকে না, মেয়েদের দিকে মুখ তুলে তাকায় না, এবং তিনশো পঁচাত্তর টাকা মাইনের চাকুরিয়া। এ পাড়ার পিতারা সন্তানদের প্রতি হতাশা প্রকাশ করার সময় ভোম্বলকে পুত্ররূপে না পাওয়ায় আক্ষেপ করে থাকেন। ফলে ভোম্বলের সমবয়সিরা তাকে অপছন্দ করে।
ভোম্বল ছেলেটি বড়ো ভাবুক, তাই কম কথা বলে। সিংগিমশায়ের দোরগোড়ায় একটি মোটরগাড়ি দেখে সে ভাবল, কার হতে পারে। ফ্যালাকে জিজ্ঞাসা করলেই ল্যাঠা চোকে। কিন্তু দীর্ঘকাল যাবৎ কম কথা বলার জন্য তার স্বভাবে একপ্রকার জড়ত্ব এসে গেছে। বাসুদেবের জ্যেষ্ঠা কন্যা মনীষা অর্থাৎ মানু এইবার তিন বছর ডিগ্রি কলেজে ভরতি হয়েছে। বাড়িতে সে মেজোবউদির সখীস্থানীয়া। প্রায়ই আসে। ভোম্বলের সাধ হয় ওর সঙ্গে হাস্যপরিহাসের, কিছুক্ষণের সান্নিধ্য উপভোগের। কিন্তু গত দুই বছরে ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে এই যে বলা ছাড়া আর কিছুই বলা হয়ে ওঠেনি।
লুঙ্গির উপর গেঞ্জি চড়িয়ে ভোম্বল দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। সত্যচরণ গামছা পরে বালতি হাতে এল। ওর স্ত্রীর বাতিকের জন্য জল একটু বেশি দরকার হয়। ভোম্বলকে দেখে বলল, হ্যাঁ গো গাড়িটা কার?
