খড়খড় শব্দ হল গাড়ির ওধারে। কেউ যেন কুচো পাথরের উপর হাঁটছে। সন্তোষ উবু হয়ে গাড়ির তলা দিয়ে তাকাল। অন্ধকার। হাত দিল চাকায় নিরেট, ঠাণ্ডা, এটার ওজন কত? আবার যদি নাড়কে ডাকি তাহলে ও ভয় পাবে। আবার পালাতে চাইবে। তার থেকে চুপিচুপি গিয়ে ধরে ফেলি।
সন্তোষ কুঁজো হয়ে এগোল দু-সারি ওয়াগনের মাঝে ফাঁকটুকুর দিকে। হঠাৎ ঝাঁকুনি খেল একদিকের সারিটা। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সন্তোষ। ইঞ্জিনে ধাক্কা দিয়েছে। সারিটা একটু পিছিয়ে গিয়ে থেমে পড়ল।
মাটি আঁকড়ে সন্তোষ শুয়ে আছে। ওর একদিকের সারিটা অনড়। অন্য দিকেরটা চলতে শুরু করেছে। মাটিতে মুখ চেপে শুয়ে থাকল সে, শব্দ হচ্ছে, লোহায় লোহা ঘষার শব্দ। ওধারে নাড়ু এখন কী করছে? পার হতে যদি দেরি হত? মুন্ডুকাটা লাশটা এতক্ষণে কাঁপতে শুরু করত। লাইনে শব্দ হচ্ছে। মালগাড়িগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। পায়ে পিঁপড়ে উঠেছে। মাটিতে সোঁদা গন্ধ। ঘাম জমেছে কপালে। মরে যাচ্ছিলুম। এমনিভাবে মাটি আঁকড়ে শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে।
বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তীক্ষ্ণ শীতল জলের ধারা। ইঞ্জিনটা মালগাড়ি টেনে নিয়ে গেছে। উঠে দাঁড়াল সন্তোষ। লাইনের ওধারে মাটির ওপরে একটা অন্ধকার জমাট হয়ে রয়েছে। কেউ কাটা পড়েছে কি? টলতে টলতে ছুটে এল সন্তোষ। ওকে দেখে কুকুরটা হাড়-চিবোননা বন্ধ করল। লেজ নাড়ছে। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার সে হাড় চিবোতে শুরু করল।
বৃষ্টি পড়ছে। সারা শরীরে বৃষ্টি পড়ছে। কাঁপতে কাঁপতে সন্তোষ লাইন ধরে হাঁটতে শুরু করল। নাড়ুর মা-র চিতাটা বোধ হয় নিভে গেল।
সন্তোষ নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল।
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
ধূসর অ্যাম্বাসাডারটা ফ্যালাকে লক্ষ করেই যোলো হাত চওড়া রাস্তাটায় থামল। ড্রাইভারের আসন থেকে প্রশ্ন হল, এটাই কি ঘোষপাড়া লেন?
বিমূঢ় হয়ে ফ্যালা উঠে দাঁড়াল। প্রশ্নকারী জানলা থেকে মুখটাকে একটুখানি বার করেছে। ফ্যালার আর কোনো সন্দেহ রইল না। অবশ্য কণ্ঠস্বরেই আধখানা চিনেছিল। ঘাড় নেড়ে পাশের গলিটাকে আঙুল তুলে দেখাল।
থ্যাঙ্ক ইউ।
মোটরটা আধখানা ফিরে তাক করতে লাগল গলির মুখটাকে। রিকশা বা ঠেলাগাড়িচালক হলে এত সময় নিত না। ঘোষপাড়া লেনের প্রবেশমুখ সাত হাত চওড়া। ফ্যালার ইচ্ছে করল, হারকিউলিস হয়ে দু-হাতের চাড়ে বাড়িগুলোকে ঠেলে জায়গাটাকে সতেরো হাত করে দিতে।
তা যখন সম্ভব নয়, ফ্যালা যোলো হাত চওড়া রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ব্যাকুলভাবে বন্ধুদের খুঁজল। কেউ নেই। দোকানে দোকানি, রাস্তায় পথিক। রাস্তাটায় যদিও মাঝে মাঝে প্রাইভেট মোটর আসে, কিন্তু কৌতূহলী হয়ে এখন এক বারও কেউ মুখ তুলে দেখছে না যে গাড়িটা কে চালাচ্ছে। কিংবা দেখেও চিনল না।
সুতরাং ফ্যালা কিছু বিরক্ত হল, কিছু লজ্জা পেল। সর্বসাধারণের এই উদাসীনতা-দোষ স্খলনের জন্য এগিয়ে গিয়ে বলল, ক-নম্বর বাড়ি খুঁজছেন?
তিন। সুনীতি ভটচায। কর্পোরেশন স্কুলের হেডমিস্ট্রেস।
অঃ, একটুখানি গিয়ে ডান দিকে রকওলা বাড়ি, তার পরেরটা।
গাড়িটা কষ্টেসৃষ্টে ঢুকে গেল। বেশিদূর যেতে পারবে না, কারণ মাস দুয়েক আগে কর্পোরেশন থেকে রাস্তায় একটি টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। ওখানে গাড়িটাকে রেখে হেঁটে যেতে হবে। ফ্যালা ঘাড় কাত করে থাকল যাবতীয় ব্যাপার লক্ষ করার জন্য।
টিউবওয়েলে স্নান করছিল গোবিন্দ দত্ত। গাড়িটা ওর পিছনেই থামল। জলটা ঠাণ্ডা, তাই মাথায় জল ঢেলে থাবড়ে থাবড়ে আমোদ করছিল গোবিন্দ। ভোর ছটায় বেরিয়ে সন্ধ্যা ছ টায় ফেরা। এসময় তিন নম্বর বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞাসা করল। ও যে জল ঢালা থামিয়ে কথার জবার দেবে না, প্রশ্নকারী তা কেমন করে জানবে? সুতরাং দ্বিতীয় বার জিজ্ঞাসা করে গোবিন্দর দাঁতখিচুনি দেখে আর কথা বাড়াল না।
ফ্যালা ছুটে এসে গোবিন্দকে চাপা স্বরে ধমকাল, ও কে জান, অমন করে যে কথা বললে?
গোবিন্দ হকচকাল। ঘাড়ের কাছেই গাড়িটা, ঘাড় ফিরিয়ে এক বার তাকিয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বলল, কে?
কী ভাবল বলোতো, আমাদের পাড়া সম্পর্কে! ফ্যালা তাকিয়ে রইল তিন নম্বর বাড়ি পর্যন্ত চোখ পেতে। বাড়ির দরজা অবধি পৌঁছে দিয়ে আসতে পারত, কিন্তু কীরকম লজ্জা করল। তবে তিন নম্বরের সদর দরজাটা রাস্তার ওপরেই, নম্বরটাও স্পষ্ট দেখা যায় রাস্তার আলোয়। তিনের এক কি তিনের দুই হলে নিশ্চয়ই সঙ্গে যেত।
শেফালিদের বাড়িটা এক-তলা, ছাদে পাঁচিল নেই। সন্ধ্যার পর সে ছাদের ধারে বসে থাকে, রক থেকে ওদের ছাদটা দেখা যায়। ফ্যালারা ওকে বলে শাঁকচুন্নি। বত্রিশে পড়লেও বিয়ে হচ্ছে না। শেফালি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদের কিনারে বসে থাকে। পাড়ার মেয়েরা রাস্তা দিয়ে গেলে জিজ্ঞাসা করে, কোথায় গেছলে গো, সিনেমা? ছোটো ছেলেরা খাবারের ঠোঙা নিয়ে ফিরলে বলে, কে এসেছে রে? পাশের বাড়ির বউ শোবার ঘরের জানালাটা ওর জন্যই সন্ধ্যা থেকে বন্ধ করে দেয়।
শেফালি আগাগোড়া সব দেখেছে। যদিও ফ্যালা পাড়ার ছেলে, বয়সে দু-বছরের ছোটো তবু কথাবার্তা বিশেষ বলে। এখন বলল, এই ফ্যালা, কাদের বাড়িতে রে?
সেই মাস্টারনি, কুকুরকে যে বিস্কুট কিনে খাওয়ায়।
শেফালি এইটুকু শুনেই ইলাবউদির বন্ধ জানালায় কিল বসাতে শুরু করল।
বরুণ মিত্র পাড়ার মাস ছয়েকের ভাড়াটে, কারোর সঙ্গেই মেশে না। ফিরছিল অফিস থেকে। ফ্যালা তাকেই বলল, কার গাড়ি বলতে পারেন?
